হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার কালিশিরি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী পরিবারের কয়েকজন নারী সদস্যের মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে মাদকবিরোধী অভিযানে ১১০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর তিনজনকে আটক করা হলেও স্থানীয় রাজনীতি, প্রভাব ও আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) মো. মাসুম আল মামুন ও কনস্টেবল রুহুল আমিনের ভূমিকা নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে।
পুলিশের দেওয়া লিখিত বর্ণনা অনুযায়ী, এসআই (নিঃ) মো. মাসুম আল মামুন, বিপি-৮৭১৪১৮১৩৭৭, সাবেক চুনারুঘাট থানা, বর্তমানে হবিগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত এবং সঙ্গীয় কনস্টেবল রুহুল আমিন গত ২৪ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানতে পারেন, কালিশিরির রাস্তা দিয়ে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী ইয়াবা ট্যাবলেট নিয়ে হবিগঞ্জের দিকে যাবেন। এ বিষয়ে জিডি নং-১৪০০-এর মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে তারা অভিযানে যান।
তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তারা কালিশিরি বাজারের কাছে সাবেক সন্তু চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে পাকা রাস্তায় অবস্থান নেন। এবং স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে একটি অটোরিকশার গতিরোধ করে তাদের দেহ তল্লাশি করে । এসআই মাসুম আল মামুন তাঁর সিএনজির কাছে অবস্থান করছিলেন। অটোরিকশায় থাকা ব্যক্তিদের দেহ তল্লাশি করার সময় একজনের কাছে ইয়াবা থাকার কথা জানালে তিনি সেখানে যান। পরে ছায়েদ মিয়ার কাছ থেকে একটি কালো রঙের জিপারসহ প্যাকেট তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়।
ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক কোনো সাক্ষী না থাকায় আটক ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে চুনারুঘাট থানার ডিউটি অফিসার এএসআই মো. ইলিয়াছ হোসেনের উপস্থিতিতে জিপারে থাকা ইয়াবা ট্যাবলেট গণনা করা হয়। সেখানে ১১০ পিস কমলা রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ওসি সাইফুল ইসলামকে জানানো হলে তিনি এসআই নারায়ণকে মামলা নিতে বলেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর একদল জনতা থানায় এসে উত্তেজিত হয়ে আটক ব্যক্তিদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি ওসি সাইফুল ইসলামকে জানানো হয়। ওই সময় ওসি হবিগঞ্জে ক্রাইম কনফারেন্সে ছিলেন। পরে তিনি থানায় এসে জনতার চাপের মুখে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রের দাবি, কালিশিরি গ্রামের মো. ইউনুস আলী (৫০), মো. ছায়েদ আলী/ছায়েদ মিয়া (৪৫), ইউনুস আলীর মেয়ে জেসমিন আক্তার (২৭/৩২) এবং ছায়েদ মিয়ার স্ত্রী রোকেয়া আক্তার (৪০) দীর্ঘদিন ধরে কৌশলে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় অভিযোগ রয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজিরার কথা বলে তারা স্বাভাবিক পথ—রেললাইনের রাস্তা হয়ে আমতলী দিয়ে চুনারুঘাট—ব্যবহার না করে হঠাৎ রাজার বাজার হয়ে চুনারুঘাটের দিকে রওনা হন বলেও স্থানীয়দের দাবি। পুলিশের উপস্থিতির খবর পেয়ে তারা পথ পরিবর্তন করেছিলেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে অটোরিকশা থেকে রোকেয়া আক্তার কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অপরদিকে, ১১০ পিস ইয়াবাসহ মো. ছায়েদ আলী, মো. ইউনুস আলী ও জেসমিন আক্তারকে আটক করা হয়েছিল।
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কয়েকজন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটের সমীকরণ বিবেচনায় কিছু লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে থানায় অবস্থান নেন এবং আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগের তদন্ত ও শাস্তির দাবি না তুলে উল্টো আটক ব্যক্তিদের নির্দোষ দাবি করে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জনপ্রতিনিধি হতে আগ্রহী ব্যক্তিরা মাদকবিরোধী অবস্থান নেবেন, নাকি অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে অবস্থান নেবেন।
এদিকে, ঘটনার পর এসআই মাসুম আল মামুন ও কনস্টেবল রুহুল আমিনকে ক্লোজ করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে মনোবল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন।
এ ঘটনার সঙ্গে কালিশিরি গ্রামের ইয়াকুত মিয়ার পরিবারের পুরোনো বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তা নিয়ে ইয়াকুত মিয়ার পরিবারের সঙ্গে ছায়েদ-ইউনুস পরিবারের পূর্ব থেকেই বিরোধ রয়েছে। ওই বিরোধকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
থানা থেকে বিতর্কিতভাবে ছাড়া পাওয়ার পর ছায়েদ-ইউনুস পক্ষ ইয়াকুত মিয়ার পরিবারের ওপর আরও বেশি চাপ, অত্যাচার ও জুলুম শুরু করেছে বলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়াকুত মিয়ার রাস্তা দখলের পাঁয়তারা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি 




















