ঢাকা কাস্টম হাউজের শুল্ক গুদাম। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের কাছ থেকে আটক এবং চোরাচালানের মাধ্যমে জব্দ করা স্বর্ণ, রূপা, হীরা, মুদ্রাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র রাখা হয় এই গুদামে। নিরাপত্তা ও তদারকির অভাবে গুদামটি থেকে প্রায় ৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরি হয়ে যায়। ২০২৩ সালে চুরির বিষয়টি সামনে এলে শুরু হয় তোলপাড়, সিদ্ধান্ত হয় নিরাপত্তা জোরদারের। এর মধ্যে তিন বছর পার হয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা দুর্বলতায় এখনও অরক্ষিতই রয়ে গেছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শুল্ক গুদাম।
স্বর্ণ চুরির ঘটনা প্রকাশের পর শত শত কোটি টাকার মূল্যবান পণ্য সংরক্ষণের এই গুদামে নিরাপত্তার জন্য চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসির দেয়াল নির্মাণের কথা ওঠে। ইস্পাত বেষ্টনী নির্মাণসহ সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা লাগানোর কথাও ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। এখনও রয়েছে লোহার কেচি গেট ও সাধারণ কাঠের দরজা। সিসিটিভি থাকলেও তাতে ফুটেজ এক মাসের বেশি সংরক্ষিত থাকে না। ফলে আগের মতোই ধীরে ধীরে স্বর্ণ ও মূল্যবান জিনিস চুরি করে নিয়ে গেলেও তা বোঝার উপায় থাকবে না বা শনাক্ত করা সম্ভব হবে না। আবার ক্যামেরা থাকলেও তা নাইটভিশন নয়।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বিষয় হলো, গুদামের সিসিটিভি ক্যামেরা কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে সদর দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মূল্যবান এই গুদামে অগ্নিনিরাপত্তা ও সিকিউরিটি অ্যালার্ম ব্যবস্থাও নেই। ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে স্বর্ণ, মুদ্রাসহ সব মূল্যবান জিনিস সহজে পুড়ে যেতে পারে। মূল্যবান গুদামে একদিকে জায়গা সংকট, তার ওপর পুরোনো সব জিনিসপত্রে ভরা। এতে গুদামের ভেতর ইঁদুরের উৎপাত রয়েছে, যাতে মূল্যবান মুদ্রা ও কাগজপত্র নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া গুদামে সংরক্ষণযোগ্য নয়, এমন অনেক জিনিস রয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। ঢাকা কাস্টম হাউজের মূল্যবান শুল্ক গুদাম তদারকি নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব অসঙ্গতি উঠে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এনবিআরকে সুপারিশ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে এই মূল্যবান গুদাম নিয়ে ব্যবস্থা না নেওয়ায় হতাশা জানিয়েছে এনবিআর।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই মূল্যবান গুদাম থেকে প্রায় ৫৫ কেজি ৫০১ গ্রাম স্বর্ণ চুরির ঘটনা সামনে আসে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা। যাত্রীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা স্বর্ণের বার ও অলঙ্কার এই গুদামে জমা রাখা হয়েছিল। সে সময় গুদামের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা ওঠে। পরে কাস্টম হাউজ থেকে মামলাও করা হয়। একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়। মামলার পর গুদামে দায়িত্ব পালন করা একাধিক কর্মকর্তা আটক ও জেলে যান। কয়েকজন বরখাস্ত ও চাকরিও হারিয়েছেন। আলোচিত এই মামলা দুদক তদন্ত করছে। ওই সময় কমিটি গুদামের সিসিটিভির দুর্বলতা, দেয়াল ও অন্যান্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং সুপারিশ করে। ওই ঘটনার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন হয়। কিন্তু এনবিআরের স্থায়ী আদেশ অনুযায়ী, মূল্যবান শুল্ক গুদামের যে ধরনের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকার কথা, তা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই শুল্ক গুদামে নেই। ঢাকা কাস্টম হাউজের গঠিত একটি কমিটি চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন দেয়, যাতে মূল্যবান গুদামের নিরাপত্তা দুর্বলতার চিত্র উঠে আসে।
মূল্যবান শুল্ক গুদামে যেসব নিরাপত্তা দুর্বলতা রয়েছে
মূল্যবান শুল্ক গুদামে পণ্য রক্ষণাবেক্ষণ ও গুদাম ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২১ অনুযায়ী যেসব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, ঢাকা কাস্টম হাউজের গুদামে তা আছে কি না, সেটি মূল্যায়ন করেছে এ-সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটি। এতে দেখা গেছে, যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা উচিত, তার ছিটেফোঁটাও নেই। আদেশে মূল্যবান শুল্ক গুদাম অধিকতর নিরাপত্তা বলয়ে চাপ ডোরবিশিষ্ট ১৮ আরসিসি দেয়ালে প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাস্টম হাউজের এই মূল্যবান গুদাম সাধারণ দেয়ালে তৈরি, যাতে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। এতে আরও বলা হয়, মূল্যবান গুদাম বিশেষভাবে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে ইস্পাত বেষ্টনী নির্মাণসহ সিকিউরিটি টেস্টেড দরজা স্থাপন করতে হবে। মেঝে ও ছাদসহ মূল্যবান গুদামের চারপাশে নির্মিত দেয়ালের নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি পুর-প্রকৌশলী কর্তৃক প্রত্যায়িত হতে হবে। কমিটির সদস্যরা দেখতে পান, মূল্যবান গুদামের মূল প্রবেশপথে একটি লোহার কেচি গেট এবং দুটি পৃথক কক্ষে সাধারণ কাঠের দরজা রয়েছে। এতে যেকোনো সময় আগের মতো স্বর্ণসহ মূল্যবান জিনিস চুরির ঝুঁকি রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সিসিটিভির বিষয়ে বলা হয়েছে, মূল্যবান গুদামে সিসিটিভি থাকলেও তা খুব বেশি কার্যকর নয়। গুদামের ভেতরে ও বাইরে কয়েকটি সাধারণ সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। তবে এসব ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ এক মাসের বেশি সংরক্ষিত থাকে না। ফলে এই গুদামে এক মাস আগে কোনো কর্মকর্তা বা অন্য কেউ যাতায়াত করলে বা স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা চুরি করে গেলেও তা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া গুদামের সিসিটিভি কাস্টম হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত নয়। ফলে হাউজ থেকে এই গুদাম ডিজিটালি মনিটরিং করা যায় না। আবার যেসব সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে, সেগুলো নাইটভিশন নয়। দামি নাইটভিশন সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও তা হাউজের সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সিস্টেমের সঙ্গে সংযোগ, সিসিটিভি অপারেশনের জন্য এক্সেস কন্ট্রোল সিস্টেম এবং ফুটেজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যবান শুল্ক গুদামে অটোমেটেড ফায়ার এক্সটিংগুইশার নেই। সিকিউরিটি অ্যালার্ম বা অ্যান্টি-থেফট অ্যালার্মও স্থাপন করা হয়নি। ফলে মূল্যবান গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেজন্য অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
জনবল ও জায়গা সংকটের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গুদামে বিভিন্ন শিফটে চারজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন, যারা যাত্রীদের কাছ থেকে আটক করা মূল্যবান স্বর্ণ ও বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের কাজ করেন। কাস্টমস কর্মকর্তা ও নথি সংরক্ষণের জন্য একটি ছোট কক্ষ, একটি ডেস্ক ও একটি কম্পিউটার রয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়। জনবলের তুলনায় এত ছোট কক্ষ, ডেস্ক ও কম্পিউটারের অপ্রতুলতা রয়েছে। কক্ষটি আরও বড় করা ছাড়াও ডেস্ক ও কম্পিউটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে কাজের গতি ও মূল্যবান পণ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়বে। মূল্যবান এই গুদামের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের এই ধরনের ঘাটতির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছেন কমিটির সদস্যরা।
মূল্যবান গুদামে বাইরের পণ্য, রয়েছে ইঁদুরের উৎপাত, দুর্গন্ধ
আদেশ অনুযায়ী, মূল্যবান পণ্য বলতে স্বর্ণবার, স্বর্ণপিণ্ড, স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্যবার, রৌপ্যপিণ্ড, রৌপ্য অলঙ্কার, মুদ্রা (দেশি-বিদেশি), হীরা এবং স্বর্ণ, রুপা বা হীরার তৈরি অন্য যেকোনো পণ্য। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কাস্টম হাউজে আটক করা এসব মূল্যবান পণ্য ও মুদ্রা এই গুদামে জমা ও সংরক্ষণ করার কথা।
কিন্তু কমিটির সদস্যরা গুদাম পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, সেখানে বিভিন্ন মামলার আলামত, মোবাইল, টেলিভিশনজাতীয় পণ্য রয়েছে, যা মূল্যবান পণ্য নয়। মূল্যবান এই গুদাম থেকে দ্রুত এসব পণ্য অপসারণ করা প্রয়োজন বলে কমিটি সুপারিশ করেছে। এছাড়া এই গুদামে বিভিন্ন ধাতুর তৈরি বিভিন্ন ধরনের মূর্তি রয়েছে, যা জাদুঘর বা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে প্রেরণ করা প্রয়োজন।
গুদামটি দীর্ঘদিনের পুরোনো মালামালে পরিপূর্ণ, ফলে একেবারেই জায়গা নেই। পুরোনো পণ্য থাকায় ভেতরে গন্ধময় পরিবেশ রয়েছে। গুদামের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে। ফলে গুদামে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ একেবারেই ঝুঁকিপূর্ণ। ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন। এছাড়া গুদামের ভেতরে বৈদ্যুতিক তারগুলো মেরামত করা প্রয়োজন, না হলে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিছু বাল্ব স্থাপনসহ বেশ কিছু সিভিল ওয়ার্কের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিটির সদস্যরা সুপারিশ করেছেন।
এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মূল্যবান গুদামের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। কিন্তু প্রতিবেদনে যা দেখলাম, তা হতাশাজনক। এনবিআর আলোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















