ঢাকা ০১:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কৃষি ভিসায় জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিক নেবে অস্ট্রেলিয়া সরকারি ফির বাইরে ৮ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ ঢাকা কাস্টম হাউজের শুল্ক গুদামে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা গাড়িচাপায় শ্রমিক হ’ত্যা’র পর আপস, দাফনে ১ লাখ–মা-বাবার জন্য ৮ লাখ চেয়ারম্যানের অনুমোদিত তালিকা বদলে যুক্তরাষ্ট্র সফর, বেবিচকে জিও জালিয়াতির অভিযোগ রেটিনার এক খোঁচায় ৫০ কোটি টাকার গেজেটভুক্ত সরকারি জমি হাতছাড়ার অভিযোগ সৈয়দপুরে প্রকৌশলী-ঠিকাদারের সমঝোতায় নিম্নমানের খোয়ায় টয়লেটের রিং-স্ল্যাব তৈরির অভিযোগ বিএডিসির প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও দায়িত্ব হস্তান্তরে গড়িমসির অভিযোগ কোরিয়ান মার্টের ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি ধরল এনবিআর হাম-ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সৈয়দপুরে প্রকৌশলী-ঠিকাদারের সমঝোতায় নিম্নমানের খোয়ায় টয়লেটের রিং-স্ল্যাব তৈরির অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ১১:৫৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫১৪ বার পড়া হয়েছে

প্রকাশ্যে জনসম্মুখে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সরকারি টয়লেট প্রকল্পের স্যানিটারি ট্যাংকের রিং ও স্ল্যাব। তারপরও নির্বিকার ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সমঝোতার মাধ্যমে এই দুর্নীতি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শেষ মুহূর্তে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সংবাদকর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে নিম্নমানের ইটের খোয়া রিজেক্ট করে নতুনভাবে ভালো মানের খোয়া দিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে।

জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ৮৫টি করে পাকা টয়লেট (পায়খানা) নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দে মোট ৪২৫টি টয়লেটের স্যানিটারি ট্যাংকের রিং ও স্ল্যাব তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। লালমনিরহাটের নুর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়ে এই কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ রিং ও স্ল্যাব তৈরি সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম থেকেই অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে রিং ও স্ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা প্রতিবাদ জানান। তখন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফর ও ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম তাঁকে ডেকে নিয়ে হোটেলে বসে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। যা তিনি তাঁর ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এভাবেই নাকি সবাইকে ম্যানেজ করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

একইভাবে ইবনে আলী নামে আরেক ব্যক্তিও রিং ও স্ল্যাব তৈরিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে ভিডিও ফুটেজসহ লিখিত পোস্ট দিয়েছেন। সেখানেও ওই বিএনপি নেতাকে ম্যানেজ করে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি উঠে আসে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপরও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নির্বিকার থাকেন এবং ঠিকাদারের পক্ষেই সাফাই গেয়ে শতভাগ ভালো কাজ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।

এমতাবস্থায় গত রোববার রাতে স্থানীয় লোকজন সংবাদকর্মীদের বিষয়টি জানান। সে অনুযায়ী সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, রিং ও স্ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে। আর এতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া। এক নম্বর ইটের নামে স্থানীয় ভাষায় গুড়িয়া বা শাল্টি (৩ নম্বরেরও নিচে) ইটের খোয়া এগুলো। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশের উপস্থিতিতে রাজমিস্ত্রি ও হেলপারসহ খোয়া সরবরাহকারীও খোয়ার মান সঠিক নয় বলে স্বীকার করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে বিষয়টি মুঠোফোনে জানানো হয়। কিন্তু তিনি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘কোনো খারাপ খোয়া সেখানে নেই। কাজ শতভাগ ভালো করা হচ্ছে। অহেতুক ভুয়া অভিযোগ করে লাভ নেই। আপনাদের কথামতো তো আর আমরা চলব না। সমস্যা মনে হলে নিউজ করেন বা উপরে জানান। তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।’ এতে বাধ্য হয়ে খোয়ার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়।

এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিল দ্রুত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এতে তিনি খোয়ার মান নিয়ে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা পান। ফলে সঙ্গে সঙ্গে স্তূপ করে রাখা খোয়াগুলো রিজেক্ট করে এগুলো দিয়ে যেন আর কোনো কাজ করা না হয়, সেজন্য সরিয়ে ফেলতে বলেন। একই সঙ্গে সঠিক মানসম্পন্ন ইটের খোয়া দিয়ে বাকি কাজ করারও নির্দেশ দেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই রিজেক্ট করা খোয়া দিয়েই প্রায় ৫০-৬০ ভাগ কাজ করা হয়েছে। মাঝে কিছু পিকইট এনে ভেঙে খোয়া তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো মূলত স্যাম্পল হিসেবে দেখানো হয়েছে মাত্র। এ নিয়ে কথা বললেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী একপ্রকার ধমক দিয়ে সবাইকে থামিয়েছেন। সর্বশেষ সাংবাদিকদের কাছে এসে বিষয়টি ধরা পড়েছে। কিন্তু কাজ তো প্রায় শেষ। এখন ধরলেও দুর্নীতির তো পগারপার। খারাপ কাজের তো কোনো বিচার হবে না।

খোয়া সরবরাহকারী কৃষ্ণ কুমার রায় বলেন, আমরা মূলত টুকরো ইট দিয়ে খোয়া তৈরি করি। আর ভাটায় টুকরোর মধ্যে এক নম্বর, দুই নম্বরসহ সব ইটের মিশ্রণ থাকে। এগুলোই আমাদের কাছে এক নম্বর খোয়া। যা ১০০-১২০ টাকা সিএফটি হিসেবে বিক্রি করি। এখানে মাত্র ৭০ সিএফটি খোয়া দিয়েছি। আর আপনারা যে এক নম্বর ইটের কথা বলছেন, তা গোটা পিকইট কিনে ভেঙে করতে হবে। এতে দাম পড়বে প্রতি সিএফটি ১৪০-১৫০ টাকা। আর আমার খোয়া না চললে ফেরত দিলেই হতো। কিন্তু তাঁরা তো কাজ করেছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরকার জুন ও সচিব (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ফেরেজুল শাহ বলেন, ইউপি চত্বরে কাজ করা হলেও এ নিয়ে আমাদের কোনো এখতিয়ার রাখা হয়নি। সব দায়িত্ব পালন করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী। ভালো-মন্দ বিষয়ে তিনিই সর্বেসর্বা। মাঝে স্থানীয় বিএনপি নেতারা এসেছিলেন। কিন্তু পরে কী হয়েছে তা জানি না। কাজ তো যথারীতি চলছে এবং শেষ পর্যায়ে। তবে আজ যে খোয়াগুলো দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, তা নিম্নমানেরই মনে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিকেল ৫টায় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরের সঙ্গে তাঁর অফিসে কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, শতভাগ ভালো ইটের খোয়া দিয়েই পুরো কাজ করা হচ্ছে। গতকাল খোয়া শেষ হওয়ায় মাত্র ৭০ সিএফটি খোয়া বাইরে থেকে কেনা হয়েছে, যা ঠিকাদার তাঁকে জানাননি। তবে এই খোয়াও এক নম্বর, শুধু রংটা একটু সমস্যা। এগুলো ল্যাব টেস্ট না করেই কীভাবে নিশ্চিত হলেন মান ভালো—এমন প্রশ্নে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, আমরা বুঝি। আপনারা তো বুঝবেন না।

‘তা আপনার সেই ভালো খোয়া রিজেক্ট করা হলো কেন?’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউএনও স্যার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই। তিনিও তো এ বিষয়ে জানেন না। আপনারাও না জেনে, না বুঝে অভিযোগ করছেন। অথচ এই কাজ নিয়ে পজিটিভ লিখতে পারতেন, তা না করে আমার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমাদের ভালো কাজও ভালো মনে হবে না। এই খোয়া ল্যাব টেস্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। আপনারা চাইলে করে দেখেন।

খোয়ার মান খারাপ হওয়ায় স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলে আপনি ও ঠিকাদার তাঁদের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওগুলো কোনো বিষয় নয়। ফেসবুকে লিখে কী হবে। আমার কর্তৃপক্ষ ঠিক থাকলে কারও কিছুই করার নেই। সাংবাদিকরা টাকার ধান্দায় দোষ ধরছেন বলে মন্তব্য করেছেন। এটা কতটা সঠিক—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, এমন কথা বলিনি। আপনারা নিজেদের কাজ করছেন।

এদিকে এ বিষয়ে ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে গত কয়েক দিন ধরে একাধিক সংবাদকর্মী বারবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। প্রকল্প সাইটেও তাঁর কোনো প্রতিনিধি নেই। ফলে তাঁর কোনো মন্তব্যই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ আছে, ঠিকাদারের নামে মূলত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নিজেই এই কাজ করছেন। এজন্যই ঠিকাদারকে আড়ালে রাখা হয়েছে।

সূত্রমতে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সঙ্গে সমঝোতার কারণেই নিম্নমানের ইটের খোয়ায় কাজ করা হয়েছে। আর এ কারণে অভিযোগ ওঠার পরও প্রকৌশলী ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গাইছেন। সেই সঙ্গে দুজন মিলে ঘুষ দিয়ে প্রতিবাদকারীসহ সংশ্লিষ্ট অনেককে ম্যানেজ করেছেন। রিং ও স্ল্যাব তৈরিতেই এমন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সামনে টয়লেট স্থাপন ও ঘর বানানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি করা হবে। তাই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখনই অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কৃষি ভিসায় জরুরি ভিত্তিতে শ্রমিক নেবে অস্ট্রেলিয়া

সৈয়দপুরে প্রকৌশলী-ঠিকাদারের সমঝোতায় নিম্নমানের খোয়ায় টয়লেটের রিং-স্ল্যাব তৈরির অভিযোগ

আপডেট সময় ১১:৫৩:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকাশ্যে জনসম্মুখে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে সরকারি টয়লেট প্রকল্পের স্যানিটারি ট্যাংকের রিং ও স্ল্যাব। তারপরও নির্বিকার ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ম্যানেজ করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সমঝোতার মাধ্যমে এই দুর্নীতি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

শেষ মুহূর্তে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সংবাদকর্মীদের তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অভিযোগের সত্যতা পেয়ে নিম্নমানের ইটের খোয়া রিজেক্ট করে নতুনভাবে ভালো মানের খোয়া দিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ঘটনাটি ঘটেছে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে।

জানা যায়, সৈয়দপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ৮৫টি করে পাকা টয়লেট (পায়খানা) নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দে মোট ৪২৫টি টয়লেটের স্যানিটারি ট্যাংকের রিং ও স্ল্যাব তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। লালমনিরহাটের নুর ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়ে এই কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ রিং ও স্ল্যাব তৈরি সম্পন্ন হয়েছে।

প্রথম থেকেই অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া দিয়ে রিং ও স্ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা প্রতিবাদ জানান। তখন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফর ও ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম তাঁকে ডেকে নিয়ে হোটেলে বসে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। যা তিনি তাঁর ফেসবুক আইডিতে দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এভাবেই নাকি সবাইকে ম্যানেজ করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

একইভাবে ইবনে আলী নামে আরেক ব্যক্তিও রিং ও স্ল্যাব তৈরিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে ভিডিও ফুটেজসহ লিখিত পোস্ট দিয়েছেন। সেখানেও ওই বিএনপি নেতাকে ম্যানেজ করে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি উঠে আসে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপরও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নির্বিকার থাকেন এবং ঠিকাদারের পক্ষেই সাফাই গেয়ে শতভাগ ভালো কাজ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।

এমতাবস্থায় গত রোববার রাতে স্থানীয় লোকজন সংবাদকর্মীদের বিষয়টি জানান। সে অনুযায়ী সোমবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোতলাগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, রিং ও স্ল্যাব তৈরি করা হচ্ছে। আর এতে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের ইটের খোয়া। এক নম্বর ইটের নামে স্থানীয় ভাষায় গুড়িয়া বা শাল্টি (৩ নম্বরেরও নিচে) ইটের খোয়া এগুলো। এ সময় ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব, মেম্বার ও গ্রাম পুলিশের উপস্থিতিতে রাজমিস্ত্রি ও হেলপারসহ খোয়া সরবরাহকারীও খোয়ার মান সঠিক নয় বলে স্বীকার করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে বিষয়টি মুঠোফোনে জানানো হয়। কিন্তু তিনি গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘কোনো খারাপ খোয়া সেখানে নেই। কাজ শতভাগ ভালো করা হচ্ছে। অহেতুক ভুয়া অভিযোগ করে লাভ নেই। আপনাদের কথামতো তো আর আমরা চলব না। সমস্যা মনে হলে নিউজ করেন বা উপরে জানান। তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।’ এতে বাধ্য হয়ে খোয়ার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়।

এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাহ ফাতেহা তাকমিল দ্রুত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এতে তিনি খোয়ার মান নিয়ে উল্লেখিত অভিযোগের সত্যতা পান। ফলে সঙ্গে সঙ্গে স্তূপ করে রাখা খোয়াগুলো রিজেক্ট করে এগুলো দিয়ে যেন আর কোনো কাজ করা না হয়, সেজন্য সরিয়ে ফেলতে বলেন। একই সঙ্গে সঠিক মানসম্পন্ন ইটের খোয়া দিয়ে বাকি কাজ করারও নির্দেশ দেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই রিজেক্ট করা খোয়া দিয়েই প্রায় ৫০-৬০ ভাগ কাজ করা হয়েছে। মাঝে কিছু পিকইট এনে ভেঙে খোয়া তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো মূলত স্যাম্পল হিসেবে দেখানো হয়েছে মাত্র। এ নিয়ে কথা বললেই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী একপ্রকার ধমক দিয়ে সবাইকে থামিয়েছেন। সর্বশেষ সাংবাদিকদের কাছে এসে বিষয়টি ধরা পড়েছে। কিন্তু কাজ তো প্রায় শেষ। এখন ধরলেও দুর্নীতির তো পগারপার। খারাপ কাজের তো কোনো বিচার হবে না।

খোয়া সরবরাহকারী কৃষ্ণ কুমার রায় বলেন, আমরা মূলত টুকরো ইট দিয়ে খোয়া তৈরি করি। আর ভাটায় টুকরোর মধ্যে এক নম্বর, দুই নম্বরসহ সব ইটের মিশ্রণ থাকে। এগুলোই আমাদের কাছে এক নম্বর খোয়া। যা ১০০-১২০ টাকা সিএফটি হিসেবে বিক্রি করি। এখানে মাত্র ৭০ সিএফটি খোয়া দিয়েছি। আর আপনারা যে এক নম্বর ইটের কথা বলছেন, তা গোটা পিকইট কিনে ভেঙে করতে হবে। এতে দাম পড়বে প্রতি সিএফটি ১৪০-১৫০ টাকা। আর আমার খোয়া না চললে ফেরত দিলেই হতো। কিন্তু তাঁরা তো কাজ করেছেন।

ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরকার জুন ও সচিব (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ফেরেজুল শাহ বলেন, ইউপি চত্বরে কাজ করা হলেও এ নিয়ে আমাদের কোনো এখতিয়ার রাখা হয়নি। সব দায়িত্ব পালন করছেন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী। ভালো-মন্দ বিষয়ে তিনিই সর্বেসর্বা। মাঝে স্থানীয় বিএনপি নেতারা এসেছিলেন। কিন্তু পরে কী হয়েছে তা জানি না। কাজ তো যথারীতি চলছে এবং শেষ পর্যায়ে। তবে আজ যে খোয়াগুলো দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, তা নিম্নমানেরই মনে হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বিকেল ৫টায় উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আবু জাফরের সঙ্গে তাঁর অফিসে কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, শতভাগ ভালো ইটের খোয়া দিয়েই পুরো কাজ করা হচ্ছে। গতকাল খোয়া শেষ হওয়ায় মাত্র ৭০ সিএফটি খোয়া বাইরে থেকে কেনা হয়েছে, যা ঠিকাদার তাঁকে জানাননি। তবে এই খোয়াও এক নম্বর, শুধু রংটা একটু সমস্যা। এগুলো ল্যাব টেস্ট না করেই কীভাবে নিশ্চিত হলেন মান ভালো—এমন প্রশ্নে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, আমরা বুঝি। আপনারা তো বুঝবেন না।

‘তা আপনার সেই ভালো খোয়া রিজেক্ট করা হলো কেন?’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইউএনও স্যার নির্দেশ দিয়েছেন, তাই। তিনিও তো এ বিষয়ে জানেন না। আপনারাও না জেনে, না বুঝে অভিযোগ করছেন। অথচ এই কাজ নিয়ে পজিটিভ লিখতে পারতেন, তা না করে আমার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমাদের ভালো কাজও ভালো মনে হবে না। এই খোয়া ল্যাব টেস্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। আপনারা চাইলে করে দেখেন।

খোয়ার মান খারাপ হওয়ায় স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করলে আপনি ও ঠিকাদার তাঁদের ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করেছেন। কিন্তু কেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ওগুলো কোনো বিষয় নয়। ফেসবুকে লিখে কী হবে। আমার কর্তৃপক্ষ ঠিক থাকলে কারও কিছুই করার নেই। সাংবাদিকরা টাকার ধান্দায় দোষ ধরছেন বলে মন্তব্য করেছেন। এটা কতটা সঠিক—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, এমন কথা বলিনি। আপনারা নিজেদের কাজ করছেন।

এদিকে এ বিষয়ে ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে গত কয়েক দিন ধরে একাধিক সংবাদকর্মী বারবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। প্রকল্প সাইটেও তাঁর কোনো প্রতিনিধি নেই। ফলে তাঁর কোনো মন্তব্যই পাওয়া যায়নি। অভিযোগ আছে, ঠিকাদারের নামে মূলত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী নিজেই এই কাজ করছেন। এজন্যই ঠিকাদারকে আড়ালে রাখা হয়েছে।

সূত্রমতে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর সঙ্গে সমঝোতার কারণেই নিম্নমানের ইটের খোয়ায় কাজ করা হয়েছে। আর এ কারণে অভিযোগ ওঠার পরও প্রকৌশলী ঠিকাদারের পক্ষে সাফাই গাইছেন। সেই সঙ্গে দুজন মিলে ঘুষ দিয়ে প্রতিবাদকারীসহ সংশ্লিষ্ট অনেককে ম্যানেজ করেছেন। রিং ও স্ল্যাব তৈরিতেই এমন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সামনে টয়লেট স্থাপন ও ঘর বানানোর ক্ষেত্রে আরও বেশি করা হবে। তাই প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখনই অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।