কাজ করলে বেতন, কাজ না করলে বেতন নেই-আউটসোর্সিং কর্মীদের ক্ষেত্রে সাধারণত এ নীতিই অনুসরণ করা হয়। তবে এবার খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই এ নীতির ব্যত্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীদের একটি অংশকে পেছনের তারিখে নিয়োগ দেখিয়ে কাজ না করেও দুই মাসের বেতন দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগ। অন্যদিকে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেও পুরোনো ১৩ কর্মীকে বেতন থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনবল সরবরাহকারী আউটসোর্সিং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী সরবরাহের টেন্ডার পায়। টেন্ডার অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত। পরে ছয় মাসের জন্য চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। ওই সময় পর্যন্ত কর্মীরা বেতনও পান।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করে। ৩০ এপ্রিল কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন)-এর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি কর্মরত সবাইকে নিজ নিজ কর্মস্থলের কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে আসতে বলেন এবং প্রত্যয়নপত্র পাওয়া গেলে চাকরি অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। সে অনুযায়ী কর্মীরা প্রত্যয়নপত্র জমা দেন। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি। এরপর তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
এদিকে, গত এপ্রিল মাসে ই-জিপি প্যাকেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড। টেন্ডার সাবমিশনের সময় যাদের বায়োডাটা আপলোড করা হয়েছিল, তাদের সবাইকে নিয়োগের তালিকায় রাখা হয়নি। টেন্ডারের মাধ্যমে মোট ৩৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও পুরোনো কর্মীদের মধ্য থেকে নিয়োগ পান ২২ জন। দীর্ঘ ৮ থেকে ১৬ বছর ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সুইপার, ঝাড়ুদার, ক্লিনার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করা অভিজ্ঞ ১৪ জনকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বাদ পড়া কর্মীদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী তারাও নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের দেওয়া ৩৬ জনের নিয়োগপত্রে যোগদানের তারিখ হিসেবে ১ মে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় জুলাই মাসে। এমনকি পিমার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা গত ১২ জুলাই থেকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করা শুরু করেন।
এদিকে মে, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস পর্যন্ত পুরোনো কর্মীরা দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বেতন দেওয়া হচ্ছে না। অথচ জুলাই মাসে কাজে যোগ দেওয়া নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মে ও জুন মাসের বেতন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা।
বেতন থেকে বঞ্চিত কর্মীদের মধ্যে রয়েছেন জয় ডোম (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), মো. সুমন মিয়া (লিফটম্যান), এনায়েত হোসেন (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), তারেক আলী (ম্যাসেঞ্জার), রিনা বেগম (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), রিনা (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), ইমন (নিরাপত্তাপ্রহরী), সফুরা (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), সাত্তার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), মো. ওবায়দুর রহমান বাবু (নিরাপত্তাপ্রহরী), মো. মোবারক হোসেন, রাফিজা ও রাজেশ।
বেতনবঞ্চিত কর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কাজ করার পরও কোনো কারণ ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এরপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পরামর্শে তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু গত ২০ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) তাদের মৌখিকভাবে কাজে না আসতে বলেন।
তাদের প্রশ্ন, তারা যখন মে ও জুন মাসে নিয়মিত কাজ করেছেন, তখন ওই সময়ের বেতন থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে কেন? অথচ নতুন টেন্ডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা জুলাই মাসে কাজে যোগ দেওয়ার পরও তাদের মে ও জুন মাসের বেতন দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিমা অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলাল বলেন, ‘সবাইকে মে মাসের ১ তারিখ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইনগতভাবে এতে কোনো জটিলতা নেই। তারা মে মাস থেকেই বেতন পাবেন।’
জুলাই মাসে কাজে যোগ দেওয়ার পরও কীভাবে মে মাস থেকে নিয়োগ দেখানো হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জুলাই মাসে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই সেখানে আগে থেকেই কাজ করতেন। তাই তাদেরও মে মাসের ১ তারিখ থেকেই নিয়োগ দেখানো হয়েছে। আমার কাজ আমি নিয়ম মেনেই করেছি। বাকি বিষয় এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বুঝবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাজেট শাখার উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ রোবায়েত বিন করিম বলেন, ‘প্রশাসন থেকে আমাদের কাছে ৩৬ জনের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, শুধু তারাই বেতন পাবেন।’
পুরোনো কর্মীরা কাজ করার পরও বেতন না পেয়ে জুলাই মাসে কাজে যোগ দেওয়া নতুন কর্মীরা কীভাবে মে ও জুন মাসের বেতন পাবেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যে নির্দেশনা আসবে, সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। এ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না। আপনি প্রশাসন বিভাগে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন রুমির সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং নিয়ে যে সমস্যা রয়েছে, এ জন্য একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যরা মিলে নিয়ম মাফিক এর সমাধান করবেন।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কাজ না করেও দুই মাসের বেতন’ দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। সরকারি অর্থে কোনো কর্মীর নামে বিল প্রস্তুত ও অর্থ পরিশোধের আগে তার নিয়োগ, উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















