ঢাকা ০১:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিপিসির কর্মকর্তা এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বিএমইটি ঘিরে একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ডলার কারসাজিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুমন ডিএই’তে প্রধান সহকারী নাসির উদ্দীনের বদলি ঘিরে উত্তেজনা, নানা অনিয়মের অভিযোগ দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির সব আন্দোলনের অনুপ্রেরণা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম : রিজভী নীলকুঞ্জ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও একজন সংবাদকর্মীর জাতীয় সম্মান প্রাপ্তি পিপিআর বিধিমালা ভেঙে সমাজসেবা অধিদপ্তরের কামরুল- ফিরাদুলের পৌনে ৭ কোটি টাকা দুর্নীতি দুখু মিয়ার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশ ভূমিহীন আন্দোলনের শ্রদ্ধাঞ্জলি সৌদি থেকে আত্রাইয়ের সাতজনের মরদেহ দেশে আসছে আজ

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির

দুর্নীতি, জালিয়াতি ও তহবিল তসরুপের গুরুতর অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর স্বপদে ফিরতে নানা মহলে তদবির চালাচ্ছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হিসেবে আরিফুর রহমান তার পুরনো প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্বপদে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া এবং বর্তমান প্রশাসকের কঠোর অবস্থানের কারণে তার পুনর্বহালের পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের ৮ মার্চ ডিএনসিসি সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের স্বাক্ষরে জারি করা অফিস আদেশে মোহাম্মদ আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে বলা হয়, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ লঙ্ঘন করে তিনি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এর ফলে ডিএনসিসি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০১৯-এর বিধি ৪৯-এর (ক), (খ), (ঘ), (ঙ) ও (চ) উপবিধিতে বর্ণিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ, অদক্ষতা, দুর্নীতিপরায়ণতা এবং তহবিল তসরুপ বা প্রতারণার দায়ে একই বিধিমালার ৫৫(১) উপবিধি অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে আরও বলা হয়, তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।

এর মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানকেও সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছে। আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুই প্রকৌশলীর বরখাস্তের ঘটনায় ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এর কারণ, আরিফুর রহমান ছিলেন এই সংগঠনের সভাপতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত এক বছরে তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আমলে প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের একটি সিন্ডিকেট ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা লোপাটের উদ্যোগ নিয়েছিল। নগরীর রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাত উন্নয়ন এবং সংস্কারের নামে অর্ধশতাধিক নথি তারা নিজেরাই অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অঞ্চল-৫-এ মিজানুর রহমান একাই ৫৯টি কাজের টেন্ডার আহ্বান করেছিলেন। এসব টেন্ডারের অনেকগুলোতেই প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল না। পরবর্তী সময়ে অনেক টেন্ডার বাতিলও করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেকুর রহমান, যিনি প্রশাসক এজাজের অলিখিত উপদেষ্টা ও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিও এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তবে তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মো. শফিকুল ইসলাম খান বর্তমান প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএনসিসি তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। সাধারণ তহবিলে নগদ অর্থের স্থিতি মাত্র ২৫ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন তহবিলে ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে ৮২৫ কোটি টাকা থাকলেও এসব অর্থ আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাবেক প্রশাসক এজাজের সময়ে উচ্চাভিলাষী বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের নামে সাধারণ তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চিত্রও সামনে আসে।

জানা গেছে, বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেছেন। নগর ভবনে এখন ‘এজাজ-আরিফ-মিজান সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে নতুন প্রশাসকের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডিএনসিসির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর আরিফুর রহমান নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তিনি জানান, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় ১৩ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভাগের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ করতে হয় তাকে। এ কাজের অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ল্যাপটপে প্রধান প্রকৌশলীর আইডি ব্যবহার করে কাজ করেছিলেন বলে দাবি করেন।

আরিফুর রহমানের দাবি, যে ১৫টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুপারিশ তার অতিরিক্ত দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি বিকেল ৫টার পর থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও ই-জিপি সিস্টেমে তার নাম কীভাবে থেকে গেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, ওই ১৫টি দরপত্রের একটিরও সুপারিশ তিনি করেননি। তার অভিযোগ, অঞ্চল-৫-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বিভিন্ন দরপত্রের প্রক্রিয়ায় নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী এবং নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে ‘ওয়ার্ক ফ্লো’ তৈরি করেছিলেন। মূল্যায়নের ধাপে মিজানুর তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে মূল্যায়ন-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো করেন বলেও দাবি করেন আরিফুর রহমান।

আরিফুর রহমানের আরও অভিযোগ, মিজানুর রহমানের এমন প্রতারণা শুধু তার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সময়েই হয়নি। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিনের দায়িত্ব পালনকালে মিজানুর রহমান একই ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে আরও ৩৩টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ কারণে পুরো বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সাময়িক বরখাস্তের পর পাওয়া অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তথ্য-প্রমাণ এবং কথিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। অনুসন্ধানে আরিফুর রহমানের ব্যক্তিগত সম্পদ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা, সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দুদকের নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের মামলা ও অভিযোগে নতুন গতি এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কমিশন এরই মধ্যে অনেক পুরনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের টাকা লোপাটের সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ পেছনের দরজা দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নগর উন্নয়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। ‘কথা কম, কাজ বেশি’—এই নীতিতেই ডিএনসিসি পরিচালিত হবে।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিভাগীয় মামলা ও দুদকের অনুসন্ধানের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও জালিয়াতির এ ধরনের ঘটনা জনগণের আস্থা নষ্ট করে। ডিএনসিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উদ্বেগজনক। দুদকের অনুসন্ধান দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করে দায়ীদের বিচার এবং লোপাট হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদারিত্বপূর্ণ করে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিপিসির কর্মকর্তা এটিএম সেলিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

দুর্নীতির অভিযোগে বরখাস্ত আরিফুরের পুনর্বহালের তদবির

আপডেট সময় ১২:১৫:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

দুর্নীতি, জালিয়াতি ও তহবিল তসরুপের গুরুতর অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর স্বপদে ফিরতে নানা মহলে তদবির চালাচ্ছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি ডিএনসিসি প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে।

ডিএনসিসির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হিসেবে আরিফুর রহমান তার পুরনো প্রভাব কাজে লাগিয়ে স্বপদে ফেরার চেষ্টা করছেন। তবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া এবং বর্তমান প্রশাসকের কঠোর অবস্থানের কারণে তার পুনর্বহালের পথ কঠিন হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের ৮ মার্চ ডিএনসিসি সচিব মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের স্বাক্ষরে জারি করা অফিস আদেশে মোহাম্মদ আরিফুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে বলা হয়, আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ ২০২৫, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫ লঙ্ঘন করে তিনি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এর ফলে ডিএনসিসি কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০১৯-এর বিধি ৪৯-এর (ক), (খ), (ঘ), (ঙ) ও (চ) উপবিধিতে বর্ণিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ, অদক্ষতা, দুর্নীতিপরায়ণতা এবং তহবিল তসরুপ বা প্রতারণার দায়ে একই বিধিমালার ৫৫(১) উপবিধি অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আদেশে আরও বলা হয়, তিনি বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এ আদেশ জারি করা হয়েছে।

এর মাত্র কয়েকদিন আগে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানকেও সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে ভয়াবহ অনিয়ম, জালিয়াতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছে। আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দুই প্রকৌশলীর বরখাস্তের ঘটনায় ডিএনসিসির প্রকৌশল বিভাগে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। এর কারণ, আরিফুর রহমান ছিলেন এই সংগঠনের সভাপতি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত এক বছরে তৎকালীন প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের আমলে প্রকৌশলী আরিফুর রহমান ও নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের একটি সিন্ডিকেট ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা লোপাটের উদ্যোগ নিয়েছিল। নগরীর রাস্তা, ড্রেন ও ফুটপাত উন্নয়ন এবং সংস্কারের নামে অর্ধশতাধিক নথি তারা নিজেরাই অনুমোদন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, অঞ্চল-৫-এ মিজানুর রহমান একাই ৫৯টি কাজের টেন্ডার আহ্বান করেছিলেন। এসব টেন্ডারের অনেকগুলোতেই প্রয়োজনীয় আর্থিক, প্রশাসনিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল না। পরবর্তী সময়ে অনেক টেন্ডার বাতিলও করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তৎকালীন আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছাদেকুর রহমান, যিনি প্রশাসক এজাজের অলিখিত উপদেষ্টা ও মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিও এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তবে তিনি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি মো. শফিকুল ইসলাম খান বর্তমান প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএনসিসি তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে। সাধারণ তহবিলে নগদ অর্থের স্থিতি মাত্র ২৫ কোটি টাকায় নেমে আসে, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন বলে জানা গেছে। বিভিন্ন তহবিলে ফিক্সড ডিপোজিট হিসেবে ৮২৫ কোটি টাকা থাকলেও এসব অর্থ আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য সংরক্ষিত ছিল। সাবেক প্রশাসক এজাজের সময়ে উচ্চাভিলাষী বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের নামে সাধারণ তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চিত্রও সামনে আসে।

জানা গেছে, বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করেছেন। নগর ভবনে এখন ‘এজাজ-আরিফ-মিজান সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে নতুন প্রশাসকের সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকে বলছেন, নতুন প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডিএনসিসির ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত অনিয়ম খুঁজে বের করে ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর আরিফুর রহমান নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আবেদনে তিনি জানান, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিন দেশের বাইরে থাকায় ১৩ থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল ও বিভাগের দরপত্র মূল্যায়নের কাজ করতে হয় তাকে। এ কাজের অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলীদের ল্যাপটপে প্রধান প্রকৌশলীর আইডি ব্যবহার করে কাজ করেছিলেন বলে দাবি করেন।

আরিফুর রহমানের দাবি, যে ১৫টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুপারিশ তার অতিরিক্ত দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ ২৮ জানুয়ারি বিকেল ৫টার পর থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করা হয়েছে। দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও ই-জিপি সিস্টেমে তার নাম কীভাবে থেকে গেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে আবেদনে উল্লেখ করেন।

তিনি আরও দাবি করেন, ওই ১৫টি দরপত্রের একটিরও সুপারিশ তিনি করেননি। তার অভিযোগ, অঞ্চল-৫-এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বিভিন্ন দরপত্রের প্রক্রিয়ায় নিজেই দরপত্র আহ্বানকারী এবং নিজেই অনুমোদনকারী হিসেবে ‘ওয়ার্ক ফ্লো’ তৈরি করেছিলেন। মূল্যায়নের ধাপে মিজানুর তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হ্যাক করে মূল্যায়ন-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো করেন বলেও দাবি করেন আরিফুর রহমান।

আরিফুর রহমানের আরও অভিযোগ, মিজানুর রহমানের এমন প্রতারণা শুধু তার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সময়েই হয়নি। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মঈন উদ্দিনের দায়িত্ব পালনকালে মিজানুর রহমান একই ধরনের জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে আরও ৩৩টি দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ কারণে পুরো বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সাময়িক বরখাস্তের পর পাওয়া অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ তথ্য-প্রমাণ এবং কথিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রের ভিত্তিতে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। অনুসন্ধানে আরিফুর রহমানের ব্যক্তিগত সম্পদ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা, সিন্ডিকেটের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

দুদকের নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর এ ধরনের মামলা ও অভিযোগে নতুন গতি এসেছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। কমিশন এরই মধ্যে অনেক পুরনো অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতির বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের টাকা লোপাটের সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ পেছনের দরজা দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও তা সফল হবে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নগর উন্নয়নের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। ‘কথা কম, কাজ বেশি’—এই নীতিতেই ডিএনসিসি পরিচালিত হবে।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিভাগীয় মামলা ও দুদকের অনুসন্ধানের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও জালিয়াতির এ ধরনের ঘটনা জনগণের আস্থা নষ্ট করে। ডিএনসিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উদ্বেগজনক। দুদকের অনুসন্ধান দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গভাবে সম্পন্ন করে দায়ীদের বিচার এবং লোপাট হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, কাঠামোগত সংস্কার, স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে এ ধরনের সিন্ডিকেট বারবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদারিত্বপূর্ণ করে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।