রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে (রাজউক) যোগদানের পর থেকে সংস্থাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও জোনে দায়িত্ব পালন করে আসছেন প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ এহসানুল ইমাম। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং বড় বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় আইন লঙ্ঘনের মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি রাজউকের জোন-১-এর অথরাইজড অফিসার হিসেবে কর্মরত।
অভিযোগ রয়েছে, রাজউকে যোগদানের পর থেকে এহসানুল ইমাম সংস্থাটির বিভিন্ন লোভনীয় চেয়ার দখলে রেখেছেন। ১১ বছরের চাকরিজীবনে তিনি রাজউকের জোন-১, ২, ৩, ৫ ও ৭-এ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অধীনে স্থাপনা নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকির ক্ষেত্রে অনিয়মের সঙ্গে আপস করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বড় বড় বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে আইন ও বিধিবিধানের ব্যত্যয় ঘটানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এহসানুল ইমামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে দুটি বিশেষভাবে গুরুতর বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর একটি ২০১৭ সালে রাজউকের জোন-২-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ের ঘটনা। অন্যটি রাজধানীর বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে।
রূপায়ণ হাউজিংয়ের বিরুদ্ধে দুদকের মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি
২০১৭ সালে রাজউকের জোন-২-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের একটি প্রকল্পসংক্রান্ত কাজে এহসানুল ইমামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে সরকারি খাসজমি, ভাওয়াল এস্টেটের সম্পত্তি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি তদন্তের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দায়ের করা ওই মামলায় এহসানুল ইমামকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রূপায়ণ হাউজিং লিমিটেডের আবেদনের সঙ্গে ব্যবহৃত রেকর্ডপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ভূমি সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, পরস্পর যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, জাল-জালিয়াতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র অনুমোদন দেওয়া হয়।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ভূমি সংস্কার বোর্ডের নামে খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি এবং অভিযোগকারীদের মালিকানাধীন সম্পত্তি যথাযথভাবে যাচাই না করেই রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটের নামে ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।
দুদকের মামলায় এহসানুল ইমামকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হলেও তার বিরুদ্ধে রাজউক কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং তাকে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ জোন-১-এর অথরাইজড অফিসার পদে বহাল রাখা হয়েছে। রূপায়ণ হাউজিংয়ের কাজে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের মামলার আসামি হওয়ার পরও তাকে আবার উত্তরা এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
এহসানুল ইমামের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ রাজধানীর বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তালিকায় অবৈধ ভবন হিসেবে উল্লেখ থাকা প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে এ অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এহসানুল ইমামকে ম্যানেজ করে প্রিয়াঙ্কা সিটি গড়ে তোলা হয়েছে। ভবন অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা অবৈধ প্রিয়াঙ্কা রানওয়ে সিটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এহসানুল ইমামের ভূমিকার কারণে আবাসন প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত উচ্চতাসীমা না মেনে ভবন নির্মাণ করেছে। পরে এসব ভবন বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও তদারকির ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিয়ে এমন আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন এহসানুল ইমাম
এহসানুল ইমামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি রূপায়ণ হাউজিং-সংক্রান্ত অভিযোগে নিজের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “আমি ছিলাম জোন-২-এ, গাজীপুর অঞ্চলে। রূপায়ণের কিছু গাজীপুর অঞ্চলে ছিল না। আমি তো আপনাকে বললাম, আপনি যাচাই-বাছাই করেন—এখানে কারা কারা জড়িত।”
একটি নকশা অনুমোদনের সঙ্গে ৪৩ জনের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এহসানুল ইমাম বলেন, “একটা নকশা অনুমোদনের সাথে কি ৪৩ জন কখনো জড়িত থাকে? এই নামগুলো কোন সোর্স থেকে দিয়েছে? কোথা থেকে পাইছে? কারা ছিল? এগুলো কেন দুদককে প্রশ্ন করেন না আপনারা?”
এরপর তিনি দুদকের মামলার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এহসানুল ইমাম বলেন, “আমার কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ নাই। আমার একটাই অভিযোগ, দুদক যে মামলাটা করছে, এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করছে।”
তবে প্রিয়াঙ্কা সিটি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা যায়নি। একইভাবে, এহসানুল ইমামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে রাজউকের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 











