ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার নামে চলছে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের মহোৎসব। সরকারি কোটি কোটি টাকা অপচয় আর লোপাট হলেও সাধারণ রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যূনতম সেবা থেকে। হাসপাতালটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যার নেপথ্যে রয়েছেন স্বয়ং হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোহাঃ ফিরোজ জামান। রোগীকে জিম্মি করে কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল ভাউচার এবং বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যে হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
অনুসন্ধানে হাসপাতালটির সুনির্দিষ্ট ৬টি বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে:

১. সচল অক্সিজেন প্ল্যান্ট ‘অচল’, ইসপেক্টা কোম্পানির সাথে কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য
সরকারি প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালে একটি আধুনিক অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, এই প্ল্যান্ট থেকে হাসপাতালের মোট অক্সিজেনের ৮০ শতাংশ চাহিদা পূরণ হওয়ার কথা এবং বাকি ২০ শতাংশ সরবরাহ করার কথা ‘ইসপেক্টা’ নামক একটি বেসরকারি কোম্পানির। কিন্তু স্থাপনের মাত্র ৬ মাসের মাথায় রহস্যজনকভাবে প্ল্যান্টটি অচল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ দিন পার হলেও এটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।ফলে বর্তমানে হাসপাতালের শতভাগ অক্সিজেনই চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে ইসপেক্টা কোম্পানির কাছ থেকে। এতে সরকারের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই কোম্পানিকে একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন পকেটে পুরছেন তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ ফিরোজ জামান।
২. ল্যাবরেটরি বিকল রেখে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠানো
হাসপাতালের প্যাথলজি ও ল্যাবরেটরি বিভাগের অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরকারি যন্ত্রপাতি ইচ্ছা করেই ‘অচল’ করে রাখা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়কের নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডাক্তার ও কর্মচারীরা রোগীদের সরকারিভাবে পরীক্ষা না করে বাইরের নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাচ্ছেন। এতে গরিব রোগীরা চড়া মূল্যে পরীক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন, আর সেই লভ্যাংশের বড় একটা অংশ চলে যাচ্ছে তত্ত্বাবধায়কের পকেটে।
৩. এসির শুধু বাইরের কভার আছে, ভেতরে ফাঁকা!
হাসপাতালের প্রায় ৮০ শতাংশ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ভেতরে কোনো যন্ত্রাংশ নেই, রয়েছে শুধু বাইরের প্লাস্টিক বা লোহার কভার। অথচ কাগজ-কলমে প্রতি বছর এই এসি ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকার ভুয়া বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
৪. জেনারেটর বন্ধ, তবুও বছরে ৫০ লাখ টাকার জ্বালানি বিল গায়েব
হাসপাতালে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার মতো একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর রয়েছে। সেটিও দীর্ঘদিন ধরে অচল ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ জেনারেটর না চালিয়েই প্রতি মাসে ভুয়া জ্বালানি তেলের বিল তোলা হচ্ছে। গত এক বছরে জেনারেটরের ভুয়া তেলের বিল বাবদ প্রায় ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করে সিন্ডিকেটটি সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া আরও দুটি নতুন জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে থাকলেও তা চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
৫. রোগীদের খাবারে থাবা: ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশ ?হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যেও চলছে ভয়াবহ চুরি। খাদ্য সরবরাহকারী ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশ করে নামমাত্র নিম্নমানের খাদ্যসামগ্রী হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ ও মানসম্মত খাবার সরবরাহের ভুয়া হিসাব দেখিয়ে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক ও সংশ্লিষ্ট চক্র।
৬. জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডে বহিরাগত ‘দালাল সিন্ডিকেট’
হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে সরকারি স্টাফদের পরিবর্তে ১৫-২০ জনের একটি বহিরাগত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই বহিরাগত ব্যক্তিরা ট্রলি আনা, বেড দেওয়া কিংবা সামান্য ড্রেসিংয়ের মতো কাজের জন্যও রোগীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায় করছে। টাকা না দিলে রোগীদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। হাসপাতালের প্রশাসনের নাকের ডগায় এই দালাল চক্র নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ভোক্তভোগীদের আর্তনাদ ও বক্তব্য:
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা জানান, “এখানে ফ্রিতে শুধু ডাক্তার দেখানো যায়, কিন্তু ওষুধ, পরীক্ষা কিংবা একটু অক্সিজেনের জন্য বাইরের দোকানে দৌড়াতে হয়। পদে পদে টাকা না দিলে কোনো সেবা মেলে না।”
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোহাঃ ফিরোজ জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়গুলো এড়িয়ে যান অথবা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন।
ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ এই সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঠাকুরগাঁও 























