ঢাকা ০৩:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

লোভনীয় পদায়ন ঘিরে ডেপুটি রেঞ্জার নাজমুলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

সুন্দরবন থেকে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, বগুড়া হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশন প্রায় দুই দশকের চাকরি জীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসান। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে বনজ সম্পদ পাচার, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন, সরকারি সম্পত্তি দখলে সহযোগিতা এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ। তবে অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতি কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই একটি গাড়ি ছাড়িয়ে দিতে ঘুষের দর-কষাকষির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বন বিভাগের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও কেন নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলোও কি কখনো কার্যকরভাবে তদন্ত করা হয়েছিল?

বন বিভাগের সরকারি বদলি আদেশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, নাজমুল হাসানের চাকরিজীবনের বড় একটি সময় কেটেছে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন কর্মস্থলে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একাধিক পদায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

নথি অনুযায়ী, বগুড়া সার্কেলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে আবার চট্টগ্রাম সার্কেলে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলেও নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের অধীন সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়ন দেওয়া হয়। বদলি নীতিমালায় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময়ের বিষয়ে বিধান থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর একটি সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাঁদের দাবি, নাজমুল হাসানের সর্বশেষ সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়নের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন নাজমুল হাসান। ওই সময় বনজ সম্পদ পাচার নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলের দক্ষিণ চট্টগ্রামের পদুয়া ফরেস্ট চেক স্টেশনে দায়িত্ব পান তিনি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই সময় দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে বনজ সম্পদ পাচারের ঘটনা বেড়ে যায়।

এরপর বান্দরবান পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগ এবং বান্দরবান বন বিভাগে তাঁর পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রচলিত বদলি নীতিমালার বাইরে প্রভাব খাটিয়ে এসব পদায়ন নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে সাংগু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের দিকে তাঁকে বগুড়া সার্কেলে বদলির আদেশ দেওয়া হলে তিনি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। পরে মামলা খারিজ হওয়ার পর সেখানে যোগ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বগুড়ায়ও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে দায়িত্ব পান। তবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে আবার চট্টগ্রাম সার্কেলে ফিরিয়ে আনা হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কর্মরত অবস্থায়ও তাঁর বিরুদ্ধে বনজ সম্পদ পাচার এবং সরকারি জমি দখলে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে। পরে আবার বান্দরবান হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়ন পান তিনি।

এখন সোয়াগাজী চেক স্টেশনের ঘুষের দর-কষাকষির অডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন ও সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে ফিফা প্রধান ইনফান্তিনোকে চান ট্রাম্প

লোভনীয় পদায়ন ঘিরে ডেপুটি রেঞ্জার নাজমুলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:০৮:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

সুন্দরবন থেকে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, বগুড়া হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশন প্রায় দুই দশকের চাকরি জীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসান। চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে বনজ সম্পদ পাচার, ঘুষ বাণিজ্য, বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন, সরকারি সম্পত্তি দখলে সহযোগিতা এবং প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ। তবে অভিযোগের পর অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতি কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই একটি গাড়ি ছাড়িয়ে দিতে ঘুষের দর-কষাকষির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বন বিভাগের অভ্যন্তরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এত গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও কেন নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা পুরোনো অভিযোগগুলোও কি কখনো কার্যকরভাবে তদন্ত করা হয়েছিল?

বন বিভাগের সরকারি বদলি আদেশ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তার বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, নাজমুল হাসানের চাকরিজীবনের বড় একটি সময় কেটেছে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন কর্মস্থলে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, একাধিক পদায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত বদলি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

নথি অনুযায়ী, বগুড়া সার্কেলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে আবার চট্টগ্রাম সার্কেলে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলেও নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের অধীন সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়ন দেওয়া হয়। বদলি নীতিমালায় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময়ের বিষয়ে বিধান থাকলেও তাঁর ক্ষেত্রে তা কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর একটি সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাঁদের দাবি, নাজমুল হাসানের সর্বশেষ সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়নের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, চাকরিজীবনের শুরুতে সুন্দরবনে কর্মরত থাকাকালে তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন নাজমুল হাসান। ওই সময় বনজ সম্পদ পাচার নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। পরে চট্টগ্রাম সার্কেলের দক্ষিণ চট্টগ্রামের পদুয়া ফরেস্ট চেক স্টেশনে দায়িত্ব পান তিনি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওই সময় দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে বনজ সম্পদ পাচারের ঘটনা বেড়ে যায়।

এরপর বান্দরবান পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বিভাগ এবং বান্দরবান বন বিভাগে তাঁর পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রচলিত বদলি নীতিমালার বাইরে প্রভাব খাটিয়ে এসব পদায়ন নেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে সাংগু ও মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগও সামনে আসে। তবে এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের দিকে তাঁকে বগুড়া সার্কেলে বদলির আদেশ দেওয়া হলে তিনি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। পরে মামলা খারিজ হওয়ার পর সেখানে যোগ দেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বগুড়ায়ও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে দায়িত্ব পান। তবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে আবার চট্টগ্রাম সার্কেলে ফিরিয়ে আনা হয়।

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে কর্মরত অবস্থায়ও তাঁর বিরুদ্ধে বনজ সম্পদ পাচার এবং সরকারি জমি দখলে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে। পরে আবার বান্দরবান হয়ে সর্বশেষ কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে পদায়ন পান তিনি।

এখন সোয়াগাজী চেক স্টেশনের ঘুষের দর-কষাকষির অডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগের বিষয়ে কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন ও সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনের কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।