অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর মায়ের স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে দারিদ্র্যকে হার মানিয়েছেন টাঙ্গাইলের তরুণ মোহাম্মদ সাগর খান। ৪৬ তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডার এবং ৪৭ তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেয়ে এখন তিনি সবার প্রশংসায় ভাসছেন। তবে এই সাফল্যের পথ ছিল সংগ্রাম আর ত্যাগে ভরা।
পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামের মো. আকবর খানের ছেলে মোহাম্মদ সাগর খান। অটোরিকশা চালক বাবার স্বল্প আয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা সাগর ছোটবেলা থেকেই ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী। কহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে রাজাপুর কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। সংসারের অভাব-অনটন কখনোই থামাতে পারেনি তার স্বপ্ন। এসএসসি পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছাড়াই কুপি ও হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করেছেন। অনেক সময় কেরোসিন না থাকায় দিনের আলোতেই পড়া শেষ করতে হয়েছে। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন তিনি।
এরপর ২০২৫ সালের ২ জুলাই ওয়ান ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পান সাগর। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের মাত্র ৯ দিনের মাথায় মারা যান তার মমতাময়ী মা সেলিনা বেগম। শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তথ্য ক্যাডারে সুপারিশ পান। তবে মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের সেবা করবে। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রস্ততি চালিয়ে যান সাগর। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন সাগর।
সাগর খানের বন্ধু কল্লোল বলেন, সাগরের অধ্যবসায় ও সততা তাকে আরও অনেক দূর নিয়ে যাবে। তার এই সাফল্যে গর্বিত পুরো এলাকা।
সাগরের এই অর্জনে গর্বিত তার পরিবার। বাবা আকবর খান বলেন, সাগর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করে একজন আদর্শ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক।
মোহাম্মদ সাগর খান বলেন, ছোটবেলা থেকেই দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিলো না। একটা জিনিসকে বেছে নিয়েছি, সেটি হচ্ছে শিক্ষা। মানুষকে যদি বড় হতে হয় কিংবা সমাজের জন্য করতে হয় শিক্ষা অর্জনের বিকল্প নেই। সব সময় একটা বিষয় বিশ্বাস করতাম দারিদ্র কখনো মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না। কারো যদি প্রবল ইচ্ছা থাকে সে দারিদ্রকে জয় করতে পারবে। আমারও সেই ইচ্ছা-শক্তি থেকেই ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়শোনা করতে পেরেছি। যদিও আমি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি তবে আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হওয়ার। কারণ আমি দেখতাম মানুষ তাদের যে সাধ্যমতো যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার দরকার সেটি তারা পাচ্ছে না। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে সেদিকে আমি যেতে পারেনি। এসময় তিনি তার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।
রাজাপুর কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ আব্দুল খালেক বলেন, সাগর শুধু আমাদের বিদ্যালয়ের নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। দারিদ্র্যকে হারিয়ে তার এই সাফল্য নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখাবে।
সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর মায়ের স্বপ্নকে শক্তি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন মোহাম্মদ সাগর খান। তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, পরিস্থিতি নয়, ইচ্ছাশক্তিই মানুষকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়।
স্টাফ রিপোর্টার: সাইদ আল মামুন 

























