স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগকে ঘিরে ঘুষ, অনিয়ম ও চাকরি বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ৮ থেকে ১৬ বছর কর্মরত বহু অভিজ্ঞ কর্মীকে বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে নতুনদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। আর এর মূল হোতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেনের (দুলাল) বিরুদ্ধে। পাশাপাশি তার সহযোগি হিসেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. নাছির উদ্দিনের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিয়োগ বঞ্চিত আউটসোর্সিং কর্মচারীরা বলছেন, দীর্ঘ ৮ থেকে ১৬ বছর কাজ করার পরও নতুন করে নিয়োগে আমাদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে জড়িতরা সাফ জানিয়ে দিয়েছে টাকা ব্যতিত কোন পুরাতন কর্মী চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না। কেবল টাকা দিলেই চাকরিতে পুনঃবহাল ও তালিকায় নাম উঠানো হবে। তাদের চাহিদা মতো আমরা টাকা দিতে পারিনি বলে তালিকায় নাম উঠানো হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এপ্রিল মাসে ই-জিপি প্যাকেজের মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের নিয়োগ সংক্রান্ত কাজ পায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন দুলালের সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. নাছির উদ্দিন এবং পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান মিলে যাবতীয় টেন্ডারের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। টেন্ডারের সাবমিশন করার সময় যাদের বায়োডাটা আপলোড করা হয়েছে তাদের নাম নিয়োগ তলিকায় উঠানো হয়নি।
দৈনন্দিন কাজে গতিশীলতা আনায়ন, স্বল্পতম সময়ে সেবাগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানসম্মত সেবা ক্রয়ের লক্ষ্যে ২০২৫ সালে নীতিমালা প্রণয়ন করে অর্থমন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে নির্ধারিত আউটসোর্সিং সেবাসমূহের তালিকা, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুসরণক্রমে সেবা ক্রয়ের বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
জানা গেছে, টেন্ডারের মাধ্যমে ৩৬ জনের নিয়োগ হলেও পুরাতন কর্মচারীদের মধ্যে প্রথমে ১৬ জন এবং পরবর্তীতে আরও চারজনকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারায় দীর্ঘ ৮ থেকে ১৬ বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং এ সুইপার, ঝাড়ুদার, ক্লিনার, পরিছন্ন কাজে কর্মরত এমন অভিজ্ঞ ১৬ জনকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৩৬ জন পুরানো অভিজ্ঞ আউটসোসিং কর্মচারীদের মধ্য থেকে পরিচ্ছন্ন কর্মী (বন্যা রানী ও জয় ডোম-১) এর কাছ থেকে পরিবহন কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন প্রধান এক লাখ টাকা নিয়ে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেড পরিচ্ছন্ন কর্মী মঞ্জু রানীর কাছ থেকে নগদ এক লাখ টকা এবং লিফটম্যান মো. সুমন মিয়ার কাছ থেকে ৬০ হাজার নেওয়া হয়েছে। হাফিজ উদ্দিন প্রধান চাকরি বঞ্চিত সকল কর্মীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে পুনর্বহাল এবং লিস্টে নাম উঠিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দেন। পাশাপাশি টাকা ব্যতিত কোন পুরাতন কর্মী চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন এ কর্মকর্তা।
নিয়োগ বঞ্চিত লিফটম্যান সুমন মিয়া জানান, চাকরির জন্য পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে (বিকাশ) পিমার ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের নাম্বারে দেয়া হয়েছে। বাকি ৪০ হাজার টাকা দুলালের ভাইগ্না রায়হান রিসিভ করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও টাকা দাবি করেন। চাহিদা অনুযায়ী টাকা প্রদান করতে না পারায় নতুন নিয়োগ পাওয়াদের তালিকায় তার নাম ওঠানো হয়নি।
আউটসোর্সিং কর্মচারি এনায়েত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন প্রধান চাকরি বঞ্চিত সকল কর্মীদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে লিস্টে নাম উঠিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। পাশাপাশি হাফিজ উদ্দিন বলেছেন টাকা ব্যতিত কোন পুরাতন কর্মী চাকরিতে প্রবেশ করতে পারবে না। আমার কাছেও এক লাখ টাকা চেয়েছে। দিতে পারিনি তাই তালিকায় আমার নাম দেয়নি।
অপর এক আউটসোর্সিং কর্মচারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এনামুল হোসেন ও এনায়েত হোসেন আপন দুই ভাই মিলে চাকরির জন্য প্রথমে এক লাখ টাকা নেন। পরবর্তীতে আরও এক লাখ টাকা দাবি করেন। এনায়েত হোসেকে এই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তার ভাই এনামুলকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে নাম বহাল রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা প্রহরী মো.ওবায়দুর রহমান বাবু জানান, এখানে টাকা ছাড়া কোন নিয়োগ হয়নি। যারা টাকা দিতে পেরেছে তাদেরই চাকরি হয়েছে। কেউ কেউ প্রথমে ৫০ হাজার করে দিয়েছে। পরবর্তীতে আবারও কারো কাছে ৫০ হাজার, কারো কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। যারা দিতে পারেনি তাদের নাম তালিকায় ওঠেনি। তিনি বলেন, আমরা এখানে সবাই অনেক বছর ধরে কাজ করছি। আমাদের সাথে যা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অমানবিক।
এদিকে কর্মরত কয়েকজন আউটসোর্সিং কর্মী অভিযোগ করেন, পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন (দুলাল) সাফ বলে দিয়েছে যে, তিনি ১২ লাখ টাকা দিয়ে টেন্ডার নিয়েছেন। এই ১২ লাখ টাকা নিয়োগ কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দিনকে দিয়েছেন। এছাড়া ডা. নাছির উদ্দিন এর কাছে কর্মরত সবাই বার বার যাওয়ার পরও সে কারো অনুরোধ শোনেননি। এক পর্যায়ে সে বলে দেন কিছুই করার নেই। তোমরা চাকরি নিতে হলে টাকা দিতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে নিরুপায় হয়ে অবশেষে গত ৭ জুলাই বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানের সাথে দেখা করে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরেন কর্মরত আউটসোর্সিং কর্মীরা। অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান তাদের কাছ থেকে স্টেটমেন্ট নেন এবং তাদের কথপোকথনের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করেন। এসময় উপ-পরিচালক ডিডি (প্রশাসন) নাছির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন এবং পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধান টাকা নিয়েছেন বলে স্বীকার করেন। এডিজি ডা. মো. জাহিদ রায়হান তখন ডিডি (প্রশাসন) নাছির ও পরিবহন কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিনকে সতর্ক করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন কর্মকর্তা মো. হাফিজ উদ্দিন প্রধানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কারও কাছ থেকে চাকরি দেওয়ার নাম করে কোন টাকা নেইনি। যারা অভিযোগ করছে তারা মিথ্যা বলছে। এডিজির কাছে আপনার স্বীকারোক্তি রয়েছে সেটা কি মিথ্যা? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দুইজন টাকা নিয়ে আমাকে দেয়ার চেষ্টা করেছে কিন্তু আমি সেই টাকা ধরিনি। পরবর্তীতে তারা আমার টেবিলে টাকা রেখে গেছে। এজন্য তো আমি দায়ি না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাসির উদ্দিন বলেন, আমি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব। আমার জানা মতে সম্পূর্ণ নিয়ম নীতি মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে কোন ব্যত্যয় আমার চোখে পড়েনি। তবে কেউ যদি অনিয়ম বা দুর্নীতি করে থাকে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। আপনার কাছে পিমা এসোসিয়েট কোন টাকা জমা দিয়েছে কি না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি কোন টাকা নেননি।
এদিকে পিমা এসোসিয়েট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন দুলালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর বেশ কয়েকদিন ফোনে তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ লেনদেন ও পুরাতন অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে লিখিত আবেদন জানান নিয়োগ বঞ্চিত আউটসোর্সিং ১৬ জন কর্মচারিরা। এতে কাজে অভিজ্ঞতা বিবেচনা পূর্বক সঠিক আইন অনুযায়ী চাকরি বঞ্চিত কর্মীদের বহাল রাখার জন্য অনুরোধ জানান তারা। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সাথে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
পরবর্তীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভিযোগ আমার কানেও আসছে। প্রাথমিকভাবে এক দফা তদন্ত হয়েছে। আরো গভীরভাবে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আউটসোর্সিং নিয়ে অনেক ঝামেলা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় কর্মচারি পান ২০ হাজার টাকা। আমরা আউটসোর্সিং নিয়োগ থেকে বের হয়ে কিভাবে রাজস্ব খাতে নেওয়া যায় সেটা ভাবছি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















