ফুটবল মাঠের দুই জীবন্ত কিংবদন্তি, দুই দেশের আবেগের প্রতীক। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও মিসর। তবে এই ম্যাচ কেবল দুই দেশের লড়াই নয়, এটি আসলে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই মহাতারকা; লিওনেল মেসি ও মোহাম্মদ সালাহর শ্রেষ্ঠত্বের এক চরম পরীক্ষা।
৩৯ বছর বয়সী মেসি এবং ৩৪ বছর বয়সী সালাহ, দুজনেই ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছেন। মেসি ইতিমধ্যেই আভাস দিয়েছেন এটাই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ যদিও সালাহ ২০৩০ সালের বিশ্বকাপেও খেলার আশা বাঁচিয়ে রেখেছেন। তবে বিশ্বমঞ্চে দুজনের গল্পটা একেবারে ভিন্ন। মেসি একজন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডের মালিক। এমনকি এবারের আসরেও তিনি যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে আছেন।
অন্যদিকে, সালাহর গল্পটা অন্যরকম সংগ্রামের। মিসরের হয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে এসে এই প্রথম নকআউট পর্বের স্বাদ পেয়েছেন তিনি, যেখানে তার হাত ধরে প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোতে পা রাখল মিসর। এর আগে ২০১৭ ও ২০২১ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে উঠেও স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল সালাহর। এমনকি ইমেজ রাইটস, যাতায়াত ব্যবস্থা ও দলের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মিসরীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাথে বেশ কয়েকবার প্রকাশ্য দ্বন্দ্বেও জড়াতে হয়েছিল তাকে। তবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে তার নেওয়া সেই দর্শনীয় পানেনকা পেনাল্টি শট মিশরকে এক ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়। মঙ্গলবার তিনি চাইবেন বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি তৈরি করতে।
এদিকে আর্জেন্টিনায় এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘বাইক্যাম্পিওনাতো’ অর্থাৎ টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু যে প্রশ্নটা সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে অথচ মুখে কেউ বলতে সাহস পাচ্ছেন না, তা হলো মেসি অবসর নেওয়ার পর কী হবে? বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ আর্জেন্টিনাকে যেমন গৌরবের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে, তেমনি তা মেসিকে বিদায়ের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। এবারের টুর্নামেন্টে মেসির সাতটি গোল এবং টানা আটটি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার মতো অবিস্মরণীয় রেকর্ড দেশকে বর্তমানের উন্মাদনায় ভাসিয়ে রাখলেও সবাই মনে মনে জানেন যে আলবিসেলেস্তে জার্সিতে নিজের শেষ তাঙ্গো নাচছেন এই ফুটবল জাদুকর।
মজার বিষয় হলো, অনেক আর্জেন্টাইন ক্রীড়া সাংবাদিক সমালোচনা করে বলছেন যে দল আবারও অতিরিক্ত ‘মেসি-নির্ভর’ হয়ে পড়েছে। কোচ লিওনেল স্কালোনির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তিনি মেসিকে ছাড়াই খেলার মতো একটি দল গড়েছিলেন, যা তাদের ২০২২ বিশ্বকাপ এবং দুটি কোপা আমেরিকা জিততে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এবার আর্জেন্টিনার ১১টি গোলের মধ্যে মাত্র চারটি গোল মেসির পা থেকে আসেনি। লাউতারো মার্তিনেজ বা হুলিয়ান আলভারেজের মতো স্ট্রাইকাররা যেন কেবল অধিনায়কের সহায়ক হিসেবে খেলছেন। প্রিয় মানুষটি বিদায় নেওয়ার যত কাছাকাছি আসে, তাকে হারানোর ভয় যেন মানুষকে তত বেশি গ্রাস করে।
মিসরের সমর্থকদের কাছে আবার সালাহ কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি এক পরম আনন্দ আর অনুপ্রেরণার নাম। নাগরিগের এক ছোট গ্রাম থেকে বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র হয়ে ওঠার যে গল্প তিনি লিখেছেন, তা প্রতিটা মিসরীয়কে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর পুরো মিসর আজ সালাহর পেছনে একতাবদ্ধ।
একদিকে মেসির মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করার অন্তিম চেষ্টা, অন্যদিকে সালাহর হাত ধরে মিসরের নতুন ইতিহাস লেখার স্বপ্ন। আটলান্টার এই মহারণে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো ফুটবল বিশ্ব।
ক্রীড়া ডেস্ক 























