ব্যাংক আইনের তোয়াক্কা না করে পুত্রবধূ ও দুই ভাতিজাকে ব্যাংকের বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান। এ ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনো বয়স ও অভিজ্ঞতা-সংক্রান্ত ব্যাংকিং নীতিমালা। চেয়ারম্যান নিজের প্রভাব খাটিয়ে এক ভাতিজাকে ব্যাংকটির সিকিউরিটিজের সিইও পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই তার পুত্রবধূ ও আরেক ভাতিজাকে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। যেখানে তাদের অভিজ্ঞতা ও বয়সের বিষয়টি মানা হয়নি। জানা গেছে, চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কথা বলায় ইতোমধ্যে কমার্স ব্যাংক থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এসভিপিসহ চার কর্মকর্তাকে।
ব্যাংকটিতে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমে তাদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে অবসরের পর বর্তমানে কমার্স ব্যাংকে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে যোগাদান করে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান আতাউর রহমান। এরপর নিজের পুত্রবধূ তানজিনা সুলতানাকে (রিমা) অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, ভাতিজা সাইফুল ইসলামকে সিনিয়র অফিসার ও আরেক ভাতিজ মো. আরিফুল ইসলামকে ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, এ নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি।
কমার্স ব্যাংক সূত্র আরও জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুর্নীতির অভিযোগ থাকা ব্যাংকটির সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ ফজলে রাব্বিকে ব্যাংকটিতে পুনঃনিয়োগ দিয়েছেন চেয়ারম্যান। এ ছাড়া ব্যাংকটিতে তার একক আধিপত্য বজায় রাখতে আরও ১০ জনকে নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছেন।
এ বিষয়ে কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওবায়দুল হক বলেন, ‘চেয়ারম্যানের ছেলের স্ত্রী ও ভাতিজাদের নিয়োগ আমার নিয়োগের আগে হয়েছে। যে কারণে আমি বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত নই।
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর তানজিনা সুলতানাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয় ৪০ হাজার ৯৫০ টাকা। পরে রাজধানীর দিলকুশা শাখায় তাকে পদায়ন করা হয়। ব্যাংকে জমা দেওয়া সিভি অনুযায়ী তানজিনার বর্তমান বয়স ৩৮ বছর।
ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দিলকুশা শাখায় কর্মরত থাকলেও তানজিনা সুলতানা বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদোন্নতি, বদলি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাদের ভাষ্য, এসব বিষয়ে তার মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে চেয়ারম্যান প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। ফলে ব্যাংকের অভ্যন্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্র আরও দাবি করেছে, গত দেড় মাসে প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তার বদলি এবং বিভিন্ন পদে পদায়নের ক্ষেত্রে তানজিনা সুলতানার প্রভাব ছিল। এসব সিদ্ধান্ত ঘিরে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
কমার্স ব্যাংকে থেকে সাময়িক চাকরিচ্যুত একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘তানজিনা ব্যাংকের স্বঘোষিত এমডি। তার ইচ্ছায় ব্যাংকের সবকিছু হয়। তার কথার বিরুদ্ধে গেলেই প্রমোশন বন্ধ, সাময়িক চাকরিচ্যুতি, বদলির ঘটনা ঘটে।
ইতোমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন এসএভিপি জহিরুল ইসলাম মণ্ডল, এভিপি সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেন, এফএভিপি জাহেদা সিদ্দিকা এবং এসপিও সুখরঞ্জন বারই।
ব্যাংক সূত্র জানায়, সম্প্রতি একযোগে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনাও ব্যাংকের ভেতরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন প্রভিশন ঘাটতিসহ নানা চাপে রয়েছি। এই মুহূর্তে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তার অপছন্দের কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে চাপের মুখে ফেলা, বদলি করা কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটেছে।
ব্যাংকের সাবেক এমডি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন এর আগে বলেছিলেন, ব্যাংকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ ছিল না এবং প্রায় সব সিদ্ধান্তেই চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের হস্তক্ষেপ ছিল। সে কারণে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
এদিকে, ব্যাংকের একজন পরিচালক বলেন, ‘চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পরিচালনা পর্ষদে তার একক প্রভাব তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে অন্য পরিচালকরাও কার্যকরভাবে মতামত দিতে পারছেন না।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















