সংবাদ শিরোনাম ::
কেপ ভার্দে ও আর্জেন্টিনার মধ্যে কে জিতবে জানালেন ঘানার সেই তান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজেট-পরবর্তী নৈশভোজ বাতিল, সাশ্রয় ৫০ লাখ টাকা শত্রুতার জেরে পেট্রোল ঢেলে আগুন, পুড়লো বসতবাড়ি ৫ আগস্টের পর ভাগ্য বদলে গেছে জামায়াত নেতার ছেলের রোহিঙ্গা প্রকল্পের অর্থে প্রতিমন্ত্রীর পিএস-এপিএসের ইউরোপ সফর, উঠছে নানা প্রশ্ন ঢাকার গুলিস্তানে সিলগালা ভেঙে পার্কিংয়ে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের ১২ কোটি টাকা নিয়ে গেল ঠিকাদার বিপিসির আহম্মদুল্লাহর ঢাকায় বহুতল ভবন, গ্রামে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি রাষ্ট্রের টাকায় ব্যক্তিগত ‘ভবিষ্যৎ’ গড়লেন সামি! নেইমারকে না নামানোর কারণ জানালেন আনচেলত্তি

কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের ১২ কোটি টাকা নিয়ে গেল ঠিকাদার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রকৌশলীদের যোগসাজশে কাজ ছাড়াই সরকারি প্রকল্পের প্রায় ১২ কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলায় এ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

২০২৫ সালের অক্টোবরে এলজিইডির আর্থিক প্রতিবেদনে এই প্রকল্পে দুর্নীতির বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে। গত ২৮ মে মো. জুয়েল হোসেন নামের সরাইলের এক ব্যক্তি এ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শরণাপন্ন হন।

কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। এতে এলজিইডির দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুই ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। অভিযুক্ত দুজন হলেন এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (আইআরআইডিপি-৩) প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় সরাইলে দুটি এবং নাসিরনগরে একটি প্যাকেজে কাজের চুক্তি হয়। তিন প্যাকেজের মোট চুক্তিমূল্য ছিল ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

চুক্তির বিপরীতে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয় ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এলজিইডির নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিশোধিত অর্থের মধ্যে ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই।

পরমানন্দপুর-ভুইশর সড়কে ৭ কোটির বিল

সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর-ভুইশর বাজার সড়ক উন্নয়ন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ কাজে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিমূল্য ছিল ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার ২৮১ টাকা। এর বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এলজিইডির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু প্যালাসাইডিং ওয়ালেই ২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকার বরাদ্দের পুরো বিল পরিশোধ করা হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৮২ লাখ টাকার। অর্থাৎ এই একটি খাতেই কাজ না করে তুলে নেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

একইভাবে সিসি ব্লকের কাজে ২ কোটি ৭১ লাখ ৮২ হাজার টাকার বিলের বিপরীতে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়া।

এ ছাড়া মাটির কাজ না করেই নেওয়া হয়েছে ৩৪ লাখ টাকা। ব্রিক অন অ্যান্ড এজিং বা খাড়া ইটের বর্ডার নির্মাণে ৭ লাখ ৯৬ হাজার, ব্রিক ফ্ল্যাট সোলিংয়ে ৩৩ লাখ ১৮ হাজার এবং এইচবিবি কাজে ৫৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই।

বক্স কাটিংয়ে ৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা তোলা হয়েছে একই কায়দায়। বালু ভরাটে ২৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা পরিশোধ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৮৭ হাজার টাকার। শ্রমিক মজুরি বাবদ কাজ ছাড়াই বিল দেওয়া হয়েছে ২৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নদী তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণকাজে ২৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকার বিলের বিপরীতে কাজ হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সড়কের অনুমোদিত ডিজাইন বা প্রাক্কলন মোতাবেক দুপাশের টো ওয়ালের টপ হতে সড়কের পার্শ্ব ঢালে (স্লোপ) ১১টি সিসি ব্লক থাকার কথা থাকলেও ৬/৭টি সিসি ব্লক পাওয়া যায় এবং রাস্তার ফরমেশন লেভেল সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে যে পরিমাণ ব্লক, মাটি বা বালি ভরাটের হিসাব ধরা হয়েছিল, তা পাওয়া যাবে না।

একই চিত্র ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়কে

সরাইলের ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়ক উন্নয়নেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্যাকেজে চুক্তিমূল্য ছিল ৬ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৭২২ টাকা। পরিশোধ করা হয়েছে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৫ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাটির কাজে ৪১ লাখ ৪২ হাজার টাকা বিল পরিশোধ হলেও কাজ হয়েছে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকার। প্যালিসাইডিং খাতে ২ কোটি ৫৩ হাজার টাকা বিলের বিপরীতে কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ লাখ ২ হাজার টাকার।

ব্রিক অন অ্যান্ড এজিং-এ ৪ লাখ ৫৪ হাজার, ব্রিক ফ্ল্যাট সোলিংয়ে ১৮ লাখ ৯১ হাজার, এইচবিবি কাজে ৩৬ লাখ ৫১ হাজার, সিসি ব্লকে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার এবং বক্স কাটিংয়ে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকার বিল তোলা হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই। একইভাবে বালু ভরাটে ২১ লাখ ৪১ হাজার, শ্রমিক মজুরিতে ৯ লাখ ৬০ হাজার এবং নদী তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণে ৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বিল তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই সড়কের অনুমোদিত ডিজাইন বা প্রাক্কলন মোতাবেক দুপাশের টো ওয়ালের টপ হতে সড়কের পার্শ্ব ঢালে (স্লোপ) ১১টি সিসি ব্লক থাকার কথা থাকলেও ৬/৭টি সিসি ব্লক পাওয়া যায় এবং রাস্তার ফরমেশন লেভেল সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ডিজাইন বা এস্টিমেটে যে পরিমাণ ব্লক, মাটি বা বালি ভরাট ধরা ছিল তা পাওয়া যাবে না।’

দুই প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইবিআরজেভিসরকারের মালিক কিশোরগঞ্জের নুরুল ইসলাম। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়েন নুরুল ইসলাম। আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডের মালিক ব্যবসায়ী খাইরুল হাসান।

নাসিরনগরের চিত্র

নাসিরনগর উপজেলার ভোলাকুট ইউপি থেকে রামপুর বাজার সড়ক উন্নয়নেও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। মেসার্স মোহাম্মদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডকে এই প্যাকেজে তিন দফায় মোট ২ কোটি ৪২ লাখ ১৩ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই এলাকায় পানি থাকায় কাজের বিস্তারিত অগ্রগতি যাচাই করতে পারেনি জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়।

কাজ শেষের আগেই ফেরত জামানতের টাকা

শুধু ভুয়া বিলেই থামেনি অনিয়ম। কাজ শেষ হওয়ার আগেই তিনটি প্যাকেজের ঠিকাদারদের জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাবদ জমা রাখা এই জামানত ফেরত পাওয়ার কথা কাজ শেষ হওয়ার এক বছর পর।

তিনটি প্যাকেজে ঠিকাদারের জামানত ছিল মোট ২ কোটি ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৮ টাকা। কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়। আগেই বিল পেয়ে যাওয়ায় ঠিকাদাররা আর কাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। বারবার তাগিদ দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

তিনটির মধ্যে দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার পলাতক থাকায় সেগুলোর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন অন্য মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা

অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম। আব্দুল মান্নান বর্তমানে গাজীপুরে কর্মরত। শফিকুল ইসলাম এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন)।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আংশিক যেসব কাজ হয়েছে সেখানেও প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সড়কগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অথচ কাগজে-কলমে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

কাজ না করেই বিল পরিশোধের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ওই বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। বর্তমানে কাজ চলছে।’

কাজ শেষ হওয়ার আগেই দুই কোটি ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়েছে কার নির্দেশে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনার কোনো আর্থিক সম্পর্ক আছে কি? এমন প্রশ্নে একটি সভায় আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন এবং তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকে ফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, ‘এই কাজের অনিয়ম তদন্তে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা পুরো অনিয়মের তদন্ত করে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যার দায় যতটুকু সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। সেখানে অসম্পূর্ণ কাজ অন্য মাধ্যমে কীভাবে শেষ করা হবে, সেই পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর পরবর্তী সময় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং কাজ শেষ করার বিষয়ে পরামর্শ দেবে।’

তদন্ত চলাকালে ফের কাজ চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমিও ফের কাজ শুরু করার বিষয়ে আনঅফিসিয়ালি শুনেছি। হয়তো যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছিল তারাই কাজ করছে; কিন্তু অফিসিয়ালি বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, ‘এই অনিয়মের তদন্ত কয়েক স্তরে হবে। এখন যদি ঠিকাদার কাজ করে থাকে, তবে সেটি পরবর্তী তদন্তে উঠে আসবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কেপ ভার্দে ও আর্জেন্টিনার মধ্যে কে জিতবে জানালেন ঘানার সেই তান্ত্রিক

কাজ না করেই সরকারি প্রকল্পের ১২ কোটি টাকা নিয়ে গেল ঠিকাদার

আপডেট সময় ০৮:৩৩:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে প্রকৌশলীদের যোগসাজশে কাজ ছাড়াই সরকারি প্রকল্পের প্রায় ১২ কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সরাইল ও নাসিরনগর উপজেলায় এ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

২০২৫ সালের অক্টোবরে এলজিইডির আর্থিক প্রতিবেদনে এই প্রকল্পে দুর্নীতির বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে। গত ২৮ মে মো. জুয়েল হোসেন নামের সরাইলের এক ব্যক্তি এ নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শরণাপন্ন হন।

কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে লিখিত অভিযোগ দেন তিনি। এতে এলজিইডির দুই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুই ঠিকাদারের মাধ্যমে ওই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়। অভিযুক্ত দুজন হলেন এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (আইআরআইডিপি-৩) প্রথম সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় সরাইলে দুটি এবং নাসিরনগরে একটি প্যাকেজে কাজের চুক্তি হয়। তিন প্যাকেজের মোট চুক্তিমূল্য ছিল ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।

চুক্তির বিপরীতে ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হয় ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এলজিইডির নিজস্ব আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পরিশোধিত অর্থের মধ্যে ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই।

পরমানন্দপুর-ভুইশর সড়কে ৭ কোটির বিল

সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর-ভুইশর বাজার সড়ক উন্নয়ন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ কাজে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিমূল্য ছিল ৮ কোটি ৬৯ লাখ ৫০ হাজার ২৮১ টাকা। এর বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৭ কোটি ৭৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এলজিইডির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু প্যালাসাইডিং ওয়ালেই ২ কোটি ৭৫ লাখ ৬৯ হাজার টাকার বরাদ্দের পুরো বিল পরিশোধ করা হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৮২ লাখ টাকার। অর্থাৎ এই একটি খাতেই কাজ না করে তুলে নেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

একইভাবে সিসি ব্লকের কাজে ২ কোটি ৭১ লাখ ৮২ হাজার টাকার বিলের বিপরীতে ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়া।

এ ছাড়া মাটির কাজ না করেই নেওয়া হয়েছে ৩৪ লাখ টাকা। ব্রিক অন অ্যান্ড এজিং বা খাড়া ইটের বর্ডার নির্মাণে ৭ লাখ ৯৬ হাজার, ব্রিক ফ্ল্যাট সোলিংয়ে ৩৩ লাখ ১৮ হাজার এবং এইচবিবি কাজে ৫৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই।

বক্স কাটিংয়ে ৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা তোলা হয়েছে একই কায়দায়। বালু ভরাটে ২৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা পরিশোধ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ৮৭ হাজার টাকার। শ্রমিক মজুরি বাবদ কাজ ছাড়াই বিল দেওয়া হয়েছে ২৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নদী তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণকাজে ২৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকার বিলের বিপরীতে কাজ হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সড়কের অনুমোদিত ডিজাইন বা প্রাক্কলন মোতাবেক দুপাশের টো ওয়ালের টপ হতে সড়কের পার্শ্ব ঢালে (স্লোপ) ১১টি সিসি ব্লক থাকার কথা থাকলেও ৬/৭টি সিসি ব্লক পাওয়া যায় এবং রাস্তার ফরমেশন লেভেল সম্পন্ন করা হয়েছে। ফলে যে পরিমাণ ব্লক, মাটি বা বালি ভরাটের হিসাব ধরা হয়েছিল, তা পাওয়া যাবে না।

একই চিত্র ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়কে

সরাইলের ফাতাপুর-বাড়ীচেরা সড়ক উন্নয়নেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই প্যাকেজে চুক্তিমূল্য ছিল ৬ কোটি ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৭২২ টাকা। পরিশোধ করা হয়েছে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৫ টাকা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাটির কাজে ৪১ লাখ ৪২ হাজার টাকা বিল পরিশোধ হলেও কাজ হয়েছে ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকার। প্যালিসাইডিং খাতে ২ কোটি ৫৩ হাজার টাকা বিলের বিপরীতে কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ লাখ ২ হাজার টাকার।

ব্রিক অন অ্যান্ড এজিং-এ ৪ লাখ ৫৪ হাজার, ব্রিক ফ্ল্যাট সোলিংয়ে ১৮ লাখ ৯১ হাজার, এইচবিবি কাজে ৩৬ লাখ ৫১ হাজার, সিসি ব্লকে ১ কোটি ৪ লাখ ৭৬ হাজার এবং বক্স কাটিংয়ে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকার বিল তোলা হয়েছে কোনো কাজ ছাড়াই। একইভাবে বালু ভরাটে ২১ লাখ ৪১ হাজার, শ্রমিক মজুরিতে ৯ লাখ ৬০ হাজার এবং নদী তীর সংরক্ষণ ও বাঁধ নির্মাণে ৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বিল তোলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এই সড়কের অনুমোদিত ডিজাইন বা প্রাক্কলন মোতাবেক দুপাশের টো ওয়ালের টপ হতে সড়কের পার্শ্ব ঢালে (স্লোপ) ১১টি সিসি ব্লক থাকার কথা থাকলেও ৬/৭টি সিসি ব্লক পাওয়া যায় এবং রাস্তার ফরমেশন লেভেল সম্পন্ন হয়েছে। ফলে ডিজাইন বা এস্টিমেটে যে পরিমাণ ব্লক, মাটি বা বালি ভরাট ধরা ছিল তা পাওয়া যাবে না।’

দুই প্যাকেজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইবিআরজেভিসরকারের মালিক কিশোরগঞ্জের নুরুল ইসলাম। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ছেলের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশ ছাড়েন নুরুল ইসলাম। আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডের মালিক ব্যবসায়ী খাইরুল হাসান।

নাসিরনগরের চিত্র

নাসিরনগর উপজেলার ভোলাকুট ইউপি থেকে রামপুর বাজার সড়ক উন্নয়নেও সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। মেসার্স মোহাম্মদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডকে এই প্যাকেজে তিন দফায় মোট ২ কোটি ৪২ লাখ ১৩ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদন তৈরির সময় ওই এলাকায় পানি থাকায় কাজের বিস্তারিত অগ্রগতি যাচাই করতে পারেনি জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়।

কাজ শেষের আগেই ফেরত জামানতের টাকা

শুধু ভুয়া বিলেই থামেনি অনিয়ম। কাজ শেষ হওয়ার আগেই তিনটি প্যাকেজের ঠিকাদারদের জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাবদ জমা রাখা এই জামানত ফেরত পাওয়ার কথা কাজ শেষ হওয়ার এক বছর পর।

তিনটি প্যাকেজে ঠিকাদারের জামানত ছিল মোট ২ কোটি ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৮ টাকা। কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়। আগেই বিল পেয়ে যাওয়ায় ঠিকাদাররা আর কাজে আগ্রহী হচ্ছেন না। বারবার তাগিদ দিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।

তিনটির মধ্যে দুটি প্যাকেজের ঠিকাদার পলাতক থাকায় সেগুলোর কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন অন্য মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

বহাল তবিয়তে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা

অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন এলজিইডির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান এবং সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম। আব্দুল মান্নান বর্তমানে গাজীপুরে কর্মরত। শফিকুল ইসলাম এলজিইডি সদর দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রশাসন)।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আংশিক যেসব কাজ হয়েছে সেখানেও প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় সড়কগুলো সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। অথচ কাগজে-কলমে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

কাজ না করেই বিল পরিশোধের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ওই বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে। বর্তমানে কাজ চলছে।’

কাজ শেষ হওয়ার আগেই দুই কোটি ৫৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকার জামানত ফেরত দেওয়া হয়েছে কার নির্দেশে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনার কোনো আর্থিক সম্পর্ক আছে কি? এমন প্রশ্নে একটি সভায় আছেন, পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন।

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. বেলাল হোসেন এবং তৎকালীন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকে ফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, ‘এই কাজের অনিয়ম তদন্তে চট্টগ্রাম বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা পুরো অনিয়মের তদন্ত করে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে যার দায় যতটুকু সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। সেখানে অসম্পূর্ণ কাজ অন্য মাধ্যমে কীভাবে শেষ করা হবে, সেই পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর পরবর্তী সময় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এবং কাজ শেষ করার বিষয়ে পরামর্শ দেবে।’

তদন্ত চলাকালে ফের কাজ চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমিও ফের কাজ শুরু করার বিষয়ে আনঅফিসিয়ালি শুনেছি। হয়তো যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছিল তারাই কাজ করছে; কিন্তু অফিসিয়ালি বিষয়টি আমাদের জানা নেই।’
মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলীল বলেন, ‘এই অনিয়মের তদন্ত কয়েক স্তরে হবে। এখন যদি ঠিকাদার কাজ করে থাকে, তবে সেটি পরবর্তী তদন্তে উঠে আসবে।