ঢাকা ০১:২০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর মরণখেলায় মেতেছে অসাধু চক্র

ওজন বাড়াতে চিংড়ি মাছে সিরিঞ্জ দিয়ে সিলিকা জেলিসহ বিভিন্ন অপদ্রব্য ঢোকানোর প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকহারে বেড়েছে। বাড়তি মুনাফার আশায় মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতেছে অসাধু চক্র। এসব চিংড়ি কিনে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তা, অন্যদিকে পাতে উঠছে ভয়ংকর বিষ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মানুষের পেটে হজম না হওয়া এ বিষাক্ত রাসায়নিক জেলি দীর্ঘদিন খেলে কিডনি বিকল এবং ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগ হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল রোধে দেশে কঠোর আইন থাকলেও যথাযথ নজরদারি ও প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্রের এই মরণখেলা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ত থেকে বৃহস্পতিবার বড় আকারের ৪ কেজি চিংড়ি কিনেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. শাহ আলম চৌধুরী। বাসায় নিয়ে দেখেন মাছের ভেতর সিলিকা জেলি গিজগিজ করছে।

প্রতারণার শিকার এই ক্রেতা বলেন, ছুটিতে পরিবার নিয়ে দেশে এসেছি। বাজারে গিয়ে দেখি বড় আকারের চিংড়ি। পছন্দ হওয়ায় ৪ কেজি কিনলাম। বাসায় নিয়ে পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি, মাছের চেয়ে জেলিই বেশি। ৪ কেজি চিংড়ির ৩ কেজিই জেলি! তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিক্রেতারা একটু বেশি লাভের আশায় মানুষের পাতে বিষ তুলে দিচ্ছেন। এসব যেন দেখার কেউ নেই।

এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিষমিশ্রিত এ চিংড়ি বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। শনিবার ফেনীতে চিংড়ির ভেতর ক্ষতিকর জেলি পুশ করে বিক্রির দায়ে পৌর মৎস্য আড়তের ‘বাংলাদেশ ফিশিং’ থেকে ৮০ কেজি গলদা চিংড়ি জব্দ করা হয়। ওই সময় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা।

গত সপ্তাহে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধলেশ্বরী টোলপ্লাজাসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালায় কেরানীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও হাসনাবাদ নৌপুলিশ ফাঁড়ি। সেখানে সিলিকা জেলি ঢোকানো বিপুল পরিমাণ চিংড়ি বিক্রির সময় কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরা হয়। এছাড়া সোমবার বরিশালের আগৈলঝাড়ায় নিষিদ্ধ জেলিমিশ্রিত গলদা চিংড়ি বিক্রি করায় এক মাছ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তার কাছে থাকা সাড়ে ১০ কেজি চিংড়ি মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রাবাড়ীর এক আড়তদার জানান, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সিলিকা পাউডার ও ভাতের মাড় মিশিয়ে ঘন আঠালো জেলি তৈরি করে। এরপর তা সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির মাথা ও শরীরের নরম অংশে পুশ করে। এসব মাছের মাথা ও শক্ত খোলসের সংযোগস্থলটি আলতো করে ভেঙে বা ফাঁক করে দেখলেই তা বোঝা যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, এই বিষাক্ত জেলি মানুষের পেটে গিয়ে হজম হয় না। পাকস্থলিতে জমা হয়ে গ্যাস্ট্রিক, হজমে সমস্যা এবং তীব্র অস্বস্তি বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। জেলি তৈরির কৃত্রিম উপাদান ও রাসায়নিকগুলো রক্তে মিশে কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। কিডনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন জেলিমিশ্রিত চিংড়ি খেলে জেলি বা তাতে থাকা ভেজাল কেমিক্যালের বিষক্রিয়ায় ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় জনগণ ভেজাল খাদ্য থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, আমরা বাজার থেকে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে টেস্ট করি। ভেজাল পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজারে অভিযানে জেলিমিশ্রিত চিংড়ির অস্তিত্ব পেয়ে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। এই অভিযান চলমান। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর মরণখেলায় মেতেছে অসাধু চক্র

আপডেট সময় ০৩:২২:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

ওজন বাড়াতে চিংড়ি মাছে সিরিঞ্জ দিয়ে সিলিকা জেলিসহ বিভিন্ন অপদ্রব্য ঢোকানোর প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকহারে বেড়েছে। বাড়তি মুনাফার আশায় মানুষের জীবন নিয়ে ভয়ংকর খেলায় মেতেছে অসাধু চক্র। এসব চিংড়ি কিনে একদিকে প্রতারিত হচ্ছেন ভোক্তা, অন্যদিকে পাতে উঠছে ভয়ংকর বিষ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মানুষের পেটে হজম না হওয়া এ বিষাক্ত রাসায়নিক জেলি দীর্ঘদিন খেলে কিডনি বিকল এবং ক্যানসারের মতো ভয়াবহ রোগ হতে পারে। খাদ্যে ভেজাল রোধে দেশে কঠোর আইন থাকলেও যথাযথ নজরদারি ও প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্রের এই মরণখেলা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মাছের আড়ত থেকে বৃহস্পতিবার বড় আকারের ৪ কেজি চিংড়ি কিনেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. শাহ আলম চৌধুরী। বাসায় নিয়ে দেখেন মাছের ভেতর সিলিকা জেলি গিজগিজ করছে।

প্রতারণার শিকার এই ক্রেতা বলেন, ছুটিতে পরিবার নিয়ে দেশে এসেছি। বাজারে গিয়ে দেখি বড় আকারের চিংড়ি। পছন্দ হওয়ায় ৪ কেজি কিনলাম। বাসায় নিয়ে পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখি, মাছের চেয়ে জেলিই বেশি। ৪ কেজি চিংড়ির ৩ কেজিই জেলি! তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিক্রেতারা একটু বেশি লাভের আশায় মানুষের পাতে বিষ তুলে দিচ্ছেন। এসব যেন দেখার কেউ নেই।

এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিষমিশ্রিত এ চিংড়ি বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে প্রশাসন। শনিবার ফেনীতে চিংড়ির ভেতর ক্ষতিকর জেলি পুশ করে বিক্রির দায়ে পৌর মৎস্য আড়তের ‘বাংলাদেশ ফিশিং’ থেকে ৮০ কেজি গলদা চিংড়ি জব্দ করা হয়। ওই সময় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা নাসরিন কান্তা।

গত সপ্তাহে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধলেশ্বরী টোলপ্লাজাসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালায় কেরানীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও হাসনাবাদ নৌপুলিশ ফাঁড়ি। সেখানে সিলিকা জেলি ঢোকানো বিপুল পরিমাণ চিংড়ি বিক্রির সময় কয়েকজনকে হাতেনাতে ধরা হয়। এছাড়া সোমবার বরিশালের আগৈলঝাড়ায় নিষিদ্ধ জেলিমিশ্রিত গলদা চিংড়ি বিক্রি করায় এক মাছ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তার কাছে থাকা সাড়ে ১০ কেজি চিংড়ি মাটিতে পুঁতে ধ্বংস করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রাবাড়ীর এক আড়তদার জানান, মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা সিলিকা পাউডার ও ভাতের মাড় মিশিয়ে ঘন আঠালো জেলি তৈরি করে। এরপর তা সিরিঞ্জের মাধ্যমে চিংড়ির মাথা ও শরীরের নরম অংশে পুশ করে। এসব মাছের মাথা ও শক্ত খোলসের সংযোগস্থলটি আলতো করে ভেঙে বা ফাঁক করে দেখলেই তা বোঝা যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, এই বিষাক্ত জেলি মানুষের পেটে গিয়ে হজম হয় না। পাকস্থলিতে জমা হয়ে গ্যাস্ট্রিক, হজমে সমস্যা এবং তীব্র অস্বস্তি বা প্রদাহ সৃষ্টি করে। জেলি তৈরির কৃত্রিম উপাদান ও রাসায়নিকগুলো রক্তে মিশে কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়। কিডনি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন জেলিমিশ্রিত চিংড়ি খেলে জেলি বা তাতে থাকা ভেজাল কেমিক্যালের বিষক্রিয়ায় ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় জনগণ ভেজাল খাদ্য থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে না।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, আমরা বাজার থেকে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে টেস্ট করি। ভেজাল পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাজারে অভিযানে জেলিমিশ্রিত চিংড়ির অস্তিত্ব পেয়ে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিয়েছি। এই অভিযান চলমান। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।