ঢাকা ০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিএনপির নারী এমপিকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ র‍্যাবের নাম বদলে আসছে এসআরবি অফিস টাইমে ক্লিনিকে রোগী দেখছিলেন সরকারি চিকিৎসক, লাইসেন্স বাতিল ও বরখাস্তের নির্দেশ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ১২ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া সংস্কৃতির মাধ্যমে বিদায় করতে হবে : শফিকুর রহমান আ.লীগের কার্যক্রম নিয়ে ভারতকে কড়া বার্তা শামা ওবায়েদের  কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৪ গ্রেপ্তার, উদ্ধার এক ভিকটিম ব্রাহ্মণপাড়ায় নবাগত ইউএনওর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময় কালিহাতীতে ২১৯ বোতল ফেন্সিডিলসহ রাজশাহীর শীর্ষ মাদককারবারি গ্রেপ্তার বড়লেখায় গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

বিআইডব্লিউটিসিতে আশিকুজ্জামানের নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে। অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, জাহাজ মেরামত, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেশনের আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন স্তরে তার প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিসির সম্পত্তি ও জমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংস্থার মূল্যবান জমি ও সম্পদ বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দখলে যাওয়ার পেছনে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সংস্থার স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে তিনি প্রভাবশালী মহলের সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করে।

আশিকুজ্জামানের কর্মজীবনের পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি এজিএম ফিডার পদে প্রয়োজনীয় সময় পূর্ণ না করেই ২০১৫ সালে ডিজিএম (সাময়িক) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। অভিযোগকারীদের মতে, বিআইডব্লিউটিসির বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধানমালায় এমন ধরনের ‘সাময়িক পদোন্নতি’র বিধান নেই। পরবর্তীতে ডিজিএম পদে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা নিয়েও আপত্তি ওঠে। এসব ঘটনাকে অনেকেই প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয়ের ফল হিসেবে দেখছেন।

২০১৮ সালে পরিচালক (বাণিজ্য) পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার ক্ষমতা ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময় থেকে করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আশিকুজ্জামান। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো নিয়োগ বাণিজ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬০০ অস্থায়ী জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বয়সসীমা ও যোগ্যতার বিধান উপেক্ষা করে কয়েকজন ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দুদক ২০১৮ সালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত ছাড়পত্র, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সভার কার্যবিবরণী, নোটশিট এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করে।

করপোরেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জাহাজ মেরামত ও সংস্কারকাজ নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের হাতিয়া থেকে ভাসানচর পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত এসটি জব্বার জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে আইভি রহমান নামের আরেকটি জাহাজের মেরামত নিয়েও। অভিযোগকারীদের মতে, এসব কাজে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয়ের সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং বিশেষ সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লুজ যাত্রী পারাপারের টিকিটিং ও ইজারা কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম মূল্যে ইজারা প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও দুদক সংগ্রহ করেছে এবং ইজারা প্রক্রিয়া বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করছে।

আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো জাহাজ নির্মাণ প্রকল্প। অভিযোগে বলা হয়েছে, এমভি বঙ্গমাতা ও এমভি বঙ্গতরী নামের দুটি জাহাজ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, তবুও বিষয়টি অনুসন্ধানকারী সংস্থার নজরে রয়েছে বলে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সম্পদের অনুসন্ধান। অভিযোগের ভিত্তিতে আশিকুজ্জামান এবং তার স্ত্রী ফারজানার নামে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক যাচাইয়ে কিছু অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আশিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জাহাজ মেরামত, ক্রয়-বিক্রয় বা সংশ্লিষ্ট কাজ তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে না এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দুদকের। তিনি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে অভিযোগ অস্বীকারের পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা প্রকাশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে বিআইডব্লিউটিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অসন্তোষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ, নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং দুদকের সক্রিয় তদন্ত—সব মিলিয়ে আশিকুজ্জামানকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জবাবদিহি, সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসবে। অন্যদিকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও অবসান ঘটবে। ফলে দুদকের চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিএনপির নারী এমপিকে আসিফ মাহমুদের আইনি নোটিশ

বিআইডব্লিউটিসিতে আশিকুজ্জামানের নিয়োগ-টেন্ডার বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদ

আপডেট সময় ০১:৫০:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে। অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিয়োগ প্রক্রিয়া, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, জাহাজ মেরামত, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং করপোরেশনের আর্থিক কার্যক্রমের বিভিন্ন স্তরে তার প্রভাব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিসির সম্পত্তি ও জমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংস্থার মূল্যবান জমি ও সম্পদ বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দখলে যাওয়ার পেছনে তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, সংস্থার স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে তিনি প্রভাবশালী মহলের সুবিধা নিশ্চিত করেছেন। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং বিভিন্ন সময় মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করে।

আশিকুজ্জামানের কর্মজীবনের পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি এজিএম ফিডার পদে প্রয়োজনীয় সময় পূর্ণ না করেই ২০১৫ সালে ডিজিএম (সাময়িক) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। অভিযোগকারীদের মতে, বিআইডব্লিউটিসির বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধানমালায় এমন ধরনের ‘সাময়িক পদোন্নতি’র বিধান নেই। পরবর্তীতে ডিজিএম পদে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা নিয়েও আপত্তি ওঠে। এসব ঘটনাকে অনেকেই প্রশাসনিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয়ের ফল হিসেবে দেখছেন।

২০১৮ সালে পরিচালক (বাণিজ্য) পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর তার ক্ষমতা ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ওই সময় থেকে করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আশিকুজ্জামান। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রমে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো নিয়োগ বাণিজ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৬০০ অস্থায়ী জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন হয়েছে এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বয়সসীমা ও যোগ্যতার বিধান উপেক্ষা করে কয়েকজন ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দুদক ২০১৮ সালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগসংক্রান্ত ছাড়পত্র, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সভার কার্যবিবরণী, নোটশিট এবং নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করে।

করপোরেশনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন জাহাজ মেরামত ও সংস্কারকাজ নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই সম্পন্ন করা হয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের হাতিয়া থেকে ভাসানচর পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত এসটি জব্বার জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে টেন্ডার ও ওয়ার্ক অর্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে আইভি রহমান নামের আরেকটি জাহাজের মেরামত নিয়েও। অভিযোগকারীদের মতে, এসব কাজে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয়ের সুযোগ নষ্ট হয়েছে এবং বিশেষ সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লাভ নিশ্চিত করা হয়েছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে লুজ যাত্রী পারাপারের টিকিটিং ও ইজারা কার্যক্রম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম মূল্যে ইজারা প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও দুদক সংগ্রহ করেছে এবং ইজারা প্রক্রিয়া বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা যাচাই করছে।

আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো জাহাজ নির্মাণ প্রকল্প। অভিযোগে বলা হয়েছে, এমভি বঙ্গমাতা ও এমভি বঙ্গতরী নামের দুটি জাহাজ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। এ প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি, তবুও বিষয়টি অনুসন্ধানকারী সংস্থার নজরে রয়েছে বলে জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সম্পদের অনুসন্ধান। অভিযোগের ভিত্তিতে আশিকুজ্জামান এবং তার স্ত্রী ফারজানার নামে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, প্লট, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ভূমি অফিস ও রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে সম্পদসংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রাথমিক যাচাইয়ে কিছু অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আশিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জাহাজ মেরামত, ক্রয়-বিক্রয় বা সংশ্লিষ্ট কাজ তার দায়িত্বের আওতায় পড়ে না এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দুদকের। তিনি তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে অভিযোগ অস্বীকারের পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা প্রকাশের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে বিআইডব্লিউটিসির অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অসন্তোষ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবাদ, নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং দুদকের সক্রিয় তদন্ত—সব মিলিয়ে আশিকুজ্জামানকে ঘিরে বিতর্ক থামেনি। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জবাবদিহি, সুশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসবে। অন্যদিকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে দীর্ঘদিনের বিতর্কেরও অবসান ঘটবে। ফলে দুদকের চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।