রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন শীর্ষক ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং প্রকল্পের সাবেক পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুর। তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, অতিমূল্যে ফার্নিচার ক্রয়, টিএ/ডিএ খাতে দ্বৈত বিল উত্তোলন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ, সরকারি টাকায় ব্যক্তিগত বাসার আসবাব কেনাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় একটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন এবং ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি তিনতলা আবাসিক হল নির্মাণ করা হচ্ছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল গফুর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফার্নিচার ক্রয়ে কয়েকগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে অন্তত ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ৮০ হাজার টাকার একটি টেবিলের দাম ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেখানো হয়। এছাড়া টিএ/ডিএ বিল নেওয়ার পরও বিভিন্ন যাতায়াত ও প্রশিক্ষণের নামে দ্বিতীয়বার অর্থ উত্তোলন করেন আবদুল গফুর। এভাবে তিনি প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা তুলে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া চারটি ভবনের টেন্ডার অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক শতাংশ হারে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কয়েকজন ঠিকাদার এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগও করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট নির্মাণের নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলন এবং পরিকল্পিত বনায়নের নামে ছবি প্রদর্শন করে আরও ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা তোলার তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকারি প্রকল্পের অর্থে নিজের বাসার জন্য আসবাবপত্র কেনার অভিযোগও রয়েছে আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, জয়নাল নামে এক ঠিকাদার তার বাসার জন্য আলমিরা, ফাইল কেবিনেট, চেয়ার-টেবিল ও খাটসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র কিনে দেন।
প্রকল্পে কর্মচারীদের নামে অগ্রিম টাকা উত্তোলনেরও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ ধরনের অগ্রিম নেওয়ার বিধান নেই। জানা গেছে, মার্শাল চাকমার নামে ১৪ লাখ ৭ হাজার ৩২৮ টাকা, নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেকশন অফিসার আবদুল হকের নামে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৫৫০ টাকা এবং মঞ্জুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৮ টাকা অগ্রিম উত্তোলন করা হয়। আবদুল গফুর নিজের নামেও ১৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫২২ টাকা নেন। কয়েকটি ফাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন খাতের ব্যয় দেখিয়ে পরে এসব অর্থ সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
২০১৭ সালে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগ দেন আবদুল গফুর। অভিযোগ রয়েছে, ৩৫ বছরের বেশি বয়স এবং নন-টেকনিক্যাল ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ওই পদে নিয়োগ পান। এছাড়া তার শিক্ষাজীবনে দুটি তৃতীয় বিভাগ ছিল এবং পূর্বে কোনো সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতাও ছিল না। নিয়োগ পরীক্ষায় মাত্র দুজন অংশগ্রহণ করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন রেজিস্ট্রার অঞ্জন কুমার চাকমার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি সব বাধা অতিক্রম করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকা এক যুগ্ম সচিবকে নগদ অর্থ, লেকের মাছ ও ফল উপহার দিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও বাগিয়ে নেন তিনি।
এছাড়া এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (ইআইএ) রিপোর্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পাহাড় কাটার অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণকাজ শুরু করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার আসামিও হন আবদুল গফুর।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের দশম জরুরি সভায় সদস্যদের সম্মতিক্রমে আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত আদেশে তার বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়।
বরখাস্তের পরদিন ৮ জানুয়ারি তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমানের বিরুদ্ধে নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। ওই চিঠিতে তিনি নিজেকে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। বরখাস্ত আদেশ স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত আদালত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এদিকে বহিষ্কারের পর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুনর্বহালের চেষ্টা করছেন আবদুল গফুর—এমন অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা তৈরিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর আগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমানের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করে এবং তার অপসারণ দাবি জানায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আতিয়ার রহমান বলেন, “রাবিপ্রবি স্থাপন প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবদুল গফুরকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি সতর্ক না হয়ে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে রিজেন্ট বোর্ড তাকে বহিষ্কার করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বহিষ্কারের পরও আবদুল গফুর ব্যাংক থেকে প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেছিলেন। এ কারণে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত রেজুলেশনের মাধ্যমে তিনজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত করে তুলেছে।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আবদুল গফুরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংবাদ শিরোনাম ::
রাবিপ্রবির ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
আবদুল গফুরকে ঘিরে দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও অশান্ত ক্যাম্পাস
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০১:৪০:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
- ৬৩২ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























