ঢাকা ০৯:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
‘মেয়ের সমালোচনা আমার কনফিডেন্স শেষ করে দিয়েছে’ পাম্পে সিরিয়ালে মোটরসাইকেল এগিয়ে দিয়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ, আটক ৩ সন্ত্রাসীদের হুমকিতে সাংবাদিক রাসেলের পরিবার, বাড়ি দখলের চেষ্টা ও হামলার অভিযোগ। বোরহানউদ্দিনে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে প্রশাসনের সচেতনতামূলক সভা ও র‍্যালি শেয়ারবাজারে অনলাইনে প্রতারণার ফাঁদ, বিএসইসির সতর্কবার্তা অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, দুই প্রতিষ্ঠানকে লাখ টাকা জরিমানা বৈভবের সঙ্গে ছবি তুলতে গুনতে হবে ১০০ রুপি! ‘জুলাই সনদ’র আলোচনাকে কেন্দ্র করে সংসদে হট্টগোল ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তামাক খাতে ৮৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে’ ধান ঝাড়া মেশিনে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে গিয়ে কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যু

সরকারি প্রভাবে জমি দখল ও জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদের পাহাড় গড়েছেন রফিকুল ইসলাম শফি ও শওকত আলী

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বামনবাড়িয়া গ্রামে দুই সহোদর সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জমি দখল, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ এখন ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই দুই ভাই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে এলাকায় এমন এক প্রভাববলয় তৈরি করেন, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল প্রায় অসম্ভব। বহু বছর ধরে চেপে থাকা অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের প্রকাশ্য বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এবং সরকারি তদন্তের উদ্যোগের পর এখন বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে।

অভিযুক্তদের একজন রফিকুল ইসলাম শফি বর্তমানে বগুড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অন্যজন তার ছোট ভাই মো. শওকত আলী, যিনি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর নির্বাহী পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রামবাসীর ভাষ্য, দুই ভাইয়ের সরকারি পরিচয় ও প্রভাবই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কেন্দ্র করেই বছরের পর বছর জমি সংক্রান্ত বিরোধ, দরিদ্র কৃষকের জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং অস্বাভাবিক সম্পদ গড়ার অভিযোগ জমতে থাকে।

স্থানীয় প্রবীণদের অনেকে বলেন, চাকরিতে যোগদানের আগে পরিবারটি এলাকার আর দশটি পরিবারের মতোই ছিল। কৃষিজমি ও স্বাভাবিক বসতভিটা ছাড়া তেমন বড় কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন চোখে পড়ে সবার। গ্রামের বাড়িতে দৃষ্টিনন্দন ভবন, কৃষিজমি ক্রয়ের বিস্তার, ঢাকায় প্লট ও ফ্ল্যাটের খবর, এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী আচরণ—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, কীভাবে এত দ্রুত এই সম্পদ গড়ে উঠল।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জমি দখলের ঘটনা। আফতাব হোসেন ও আমিরুল ইসলাম নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রফিকুল ইসলাম শফির নামে বামনবাড়িয়া, বিলশা, রুহাইসহ আশপাশের বিভিন্ন বিলে ৩৩১ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকশ’ শতাংশ কৃষিজমি বন্ধকী সূত্রে ভোগদখলে রয়েছে। তাদের ভাষ্য, জমি কেনাবেচার অনেক ঘটনায় দরিদ্র মানুষের আর্থিক সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক ভোলা, ফজলার সরকার ও মোজাম্মেল হক দাবি করেন, তারা ১৯৮৭ সাল থেকে বিলশা মৌজার একটি খতিয়ানভুক্ত জমিতে বৈধভাবে চাষাবাদ করে আসছিলেন। নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালের দিকে রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীর প্রভাবে সেই জমি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতার কারণে তখন কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। প্রতিবাদ করলে উল্টো বিপদে পড়তে হবে—এই ভয়ে তারা নীরব থাকতে বাধ্য হন। এখন তারা জমি ফেরত ও বিচার দাবি করছেন।

হায়দার আলী নামের আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তাদের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া হরদমা মৌজার প্রায় এক একর জমিও প্রভাব খাটিয়ে দখল করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় দুই ভাইয়ের পাশাপাশি তাদের আরেক ভাই রবিউল ইসলামেরও ভূমিকা ছিল। হায়দার আলীর দাবি, পরিবারটি বহুবার স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রভাবশালী পক্ষের কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখনও জমিটি তারা ফিরে পাননি।

শুধু কৃষিজমি নয়, স্থানীয় অবকাঠামো নির্মাণেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। নাজমুল হাসান নামের এক বাসিন্দা বলেন, গ্রামের একটি সড়ক পাকাকরণের সময় তাদের পারিবারিক জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি প্রতিবাদ জানালে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়। তার ভাষ্য, “সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কথা বললেই সমস্যায় পড়তাম।”

গ্রামবাসীর একটি বড় অংশের অভিযোগ, রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলী নিজেদের সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে কেউ প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে চাইতেন না। কেউ জমি নিয়ে আপত্তি তুললে তাকে থানাপুলিশ, মামলার ভয়, অথবা সামাজিকভাবে হেয় করার হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বহু পরিবার নীরবে ক্ষতি মেনে নেয়।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদ অর্জন। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, একাধিক দোতলা ভবন, কৃষিজমির বিস্তার, ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট—এসব সম্পদের সঙ্গে তাদের ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য নেই। অভিযোগকারীরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তাদের বেতনের বাইরে সম্পদের উৎস কী, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই ভাইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গ্রামের মানুষ বলছেন, সে সময় প্রশাসনের অনেকেই তাদের বিষয়ে নীরব থাকতেন। ফলে জমি দখল বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে কেউ সামনে এলেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলত না। এই দীর্ঘ নীরবতা ভাঙতে বড় ভূমিকা রাখে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো।

দুই ভাইকে ঘিরে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে “কোটিপতি দুই ভাইয়ের ভয়ে তটস্থ গ্রামের মানুষ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। স্থানীয়রা জানান, বহুদিনের ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে তখন অনেকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান। সংবাদ সম্মেলন করে কয়েকজন ভুক্তভোগী নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরেন।

পরবর্তীতে রফিকুল ইসলাম শফির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয় বলে জানা যায়। গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা ভবনে সাক্ষাৎকার গ্রহণের আয়োজন করা হলে সেখানে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়। অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম শফি বিপুল সংখ্যক লোকজন নিয়ে উপস্থিত হন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এতে তদন্ত পরিবেশ ভীতিকর হয়ে ওঠে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল তদন্তকে প্রভাবিত করার কৌশল। পরে সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এদিকে মো. শওকত আলীর বিরুদ্ধেও সরকারি পর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক নোটিশে অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, সংবাদে প্রকাশিত অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণসহ সহযোগিতা করতে হবে। এই নোটিশ প্রকাশ্যে আসার পর গ্রামজুড়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বলেন, এতদিন পর হলেও অন্তত বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় এসেছে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের তদন্তে জমির দলিল, খতিয়ান, কর পরিশোধের নথি, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর বিবরণী, সম্পদ অর্জনের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে বিভাগীয় ব্যবস্থা ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কিংবা ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তদের জন্য তা স্বস্তির বিষয় হবে।

অভিযুক্ত মো. শওকত আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোনো জ্ঞাতবহির্ভূত আয় করেননি। তার এবং তার স্ত্রীর সঞ্চয়ের অর্থ থেকে কিছু জমি কেনা হয়েছে মাত্র। তিনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন। অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম শফির পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একটি অংশ বলছে, কেবল বক্তব্য নয়, প্রকৃত সত্য বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তই সবচেয়ে জরুরি।

গ্রামবাসীরা বলছেন, জমি তাদের কাছে শুধু সম্পত্তি নয়, জীবিকার ভিত্তি। কয়েক বিঘা জমি হারানো মানে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। তাই জমি দখলের অভিযোগ তাদের কাছে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিষয় নয়, বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তারা চান, যে-ই হোক—সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী বা ধনী ব্যক্তি—আইনের চোখে সবাই সমান হোক।

অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা শুধু দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গ্রামীণ ন্যায়বিচার ব্যবস্থারও একটি প্রতিচ্ছবি। যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন তারা কথা বলতে পারবেন না, তখন সমস্যা আরও গভীরে যায়। আর যখন তারা একসঙ্গে মুখ খোলেন, তখন বহু বছরের নীরবতা ভেঙে যায়।

সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভয়মুক্তভাবে সাক্ষ্য দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, জমি সংক্রান্ত নথিপত্র ডিজিটাল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। তৃতীয়ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর, ব্যাংক হিসাব ও বৈধ আয় বিশ্লেষণ জরুরি। চতুর্থত, তদন্ত প্রতিবেদন যেন শুধু দাপ্তরিক ফাইলে আটকে না থাকে, সে দিকেও নজর দিতে হবে।

এলাকার তরুণদের অনেকে বলছেন, তারা এমন একটি সমাজ চান যেখানে সরকারি চাকরি মানে সেবা, ভয় দেখানোর লাইসেন্স নয়। একজন কর্মকর্তা গ্রামের গর্ব হতে পারেন, যদি তিনি ন্যায়পরায়ণ থাকেন। কিন্তু যদি পদমর্যাদা ব্যবহার করে মানুষকে চাপে রাখা হয়, তবে তা পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে দেয়।

গুরুদাসপুরে এখন চায়ের দোকান থেকে হাটবাজার—সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলী। কেউ বলছেন, এবার বড় কিছু হবে। কেউ বলছেন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। আবার অনেকে আশা করছেন, নতুন বাস্তবতায় অন্তত তদন্ত সুষ্ঠু হবে এবং সত্য প্রকাশ পাবে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তারা প্রতিশোধ চান না; তারা ন্যায়বিচার চান। কেউ যদি অবৈধভাবে জমি নিয়ে থাকে, তা ফেরত দেওয়া হোক। কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকে, তার জবাবদিহি হোক। কেউ যদি অবৈধ সম্পদ গড়ে থাকে, তার উৎস তদন্ত হোক। তাদের মতে, বিচার হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, পুরো সমাজ উপকৃত হবে।

এই ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকাও নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, বহুদিন তারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও সাড়া পাননি। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এটি দেখিয়েছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখনো জনস্বার্থ রক্ষার বড় হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার চাপা পড়ে থাকা অভিযোগ সামনে আনতে সংবাদমাধ্যমের বিকল্প নেই।

সব মিলিয়ে রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন কেবল একটি গ্রামের সীমাবদ্ধ ইস্যু নয়; এটি ক্ষমতা, সম্পদ, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের জাতীয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অন্যদিকে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থন। এই দুই অবস্থানের মাঝে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। গুরুদাসপুরের মানুষ তাকিয়ে আছেন—বহু বছরের অভিযোগ কি এবার বিচার পাবে, নাকি আবারও সবকিছু সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যা

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘মেয়ের সমালোচনা আমার কনফিডেন্স শেষ করে দিয়েছে’

সরকারি প্রভাবে জমি দখল ও জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদের পাহাড় গড়েছেন রফিকুল ইসলাম শফি ও শওকত আলী

আপডেট সময় ০৭:০১:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বামনবাড়িয়া গ্রামে দুই সহোদর সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জমি দখল, প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ এখন ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একসময় সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা এই দুই ভাই সরকারি চাকরিতে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে এলাকায় এমন এক প্রভাববলয় তৈরি করেন, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল প্রায় অসম্ভব। বহু বছর ধরে চেপে থাকা অভিযোগ, ভুক্তভোগীদের প্রকাশ্য বক্তব্য, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন এবং সরকারি তদন্তের উদ্যোগের পর এখন বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে।

অভিযুক্তদের একজন রফিকুল ইসলাম শফি বর্তমানে বগুড়া পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অন্যজন তার ছোট ভাই মো. শওকত আলী, যিনি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর নির্বাহী পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রামবাসীর ভাষ্য, দুই ভাইয়ের সরকারি পরিচয় ও প্রভাবই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কেন্দ্র করেই বছরের পর বছর জমি সংক্রান্ত বিরোধ, দরিদ্র কৃষকের জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং অস্বাভাবিক সম্পদ গড়ার অভিযোগ জমতে থাকে।

স্থানীয় প্রবীণদের অনেকে বলেন, চাকরিতে যোগদানের আগে পরিবারটি এলাকার আর দশটি পরিবারের মতোই ছিল। কৃষিজমি ও স্বাভাবিক বসতভিটা ছাড়া তেমন বড় কোনো সম্পদ ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই ভাইয়ের আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন চোখে পড়ে সবার। গ্রামের বাড়িতে দৃষ্টিনন্দন ভবন, কৃষিজমি ক্রয়ের বিস্তার, ঢাকায় প্লট ও ফ্ল্যাটের খবর, এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী আচরণ—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন, কীভাবে এত দ্রুত এই সম্পদ গড়ে উঠল।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জমি দখলের ঘটনা। আফতাব হোসেন ও আমিরুল ইসলাম নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে রফিকুল ইসলাম শফির নামে বামনবাড়িয়া, বিলশা, রুহাইসহ আশপাশের বিভিন্ন বিলে ৩৩১ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকশ’ শতাংশ কৃষিজমি বন্ধকী সূত্রে ভোগদখলে রয়েছে। তাদের ভাষ্য, জমি কেনাবেচার অনেক ঘটনায় দরিদ্র মানুষের আর্থিক সংকটকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক ভোলা, ফজলার সরকার ও মোজাম্মেল হক দাবি করেন, তারা ১৯৮৭ সাল থেকে বিলশা মৌজার একটি খতিয়ানভুক্ত জমিতে বৈধভাবে চাষাবাদ করে আসছিলেন। নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১০ সালের দিকে রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীর প্রভাবে সেই জমি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তারা অভিযোগ করেন, ক্ষমতার কারণে তখন কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। প্রতিবাদ করলে উল্টো বিপদে পড়তে হবে—এই ভয়ে তারা নীরব থাকতে বাধ্য হন। এখন তারা জমি ফেরত ও বিচার দাবি করছেন।

হায়দার আলী নামের আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তাদের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া হরদমা মৌজার প্রায় এক একর জমিও প্রভাব খাটিয়ে দখল করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এ ঘটনায় দুই ভাইয়ের পাশাপাশি তাদের আরেক ভাই রবিউল ইসলামেরও ভূমিকা ছিল। হায়দার আলীর দাবি, পরিবারটি বহুবার স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রভাবশালী পক্ষের কারণে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখনও জমিটি তারা ফিরে পাননি।

শুধু কৃষিজমি নয়, স্থানীয় অবকাঠামো নির্মাণেও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে। নাজমুল হাসান নামের এক বাসিন্দা বলেন, গ্রামের একটি সড়ক পাকাকরণের সময় তাদের পারিবারিক জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, প্রশাসনকে প্রভাবিত করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি প্রতিবাদ জানালে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়। তার ভাষ্য, “সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কথা বললেই সমস্যায় পড়তাম।”

গ্রামবাসীর একটি বড় অংশের অভিযোগ, রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলী নিজেদের সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে এমন এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে কেউ প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে চাইতেন না। কেউ জমি নিয়ে আপত্তি তুললে তাকে থানাপুলিশ, মামলার ভয়, অথবা সামাজিকভাবে হেয় করার হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বহু পরিবার নীরবে ক্ষতি মেনে নেয়।

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জ্ঞাতবহির্ভূত সম্পদ অর্জন। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল স্থাপনা, একাধিক দোতলা ভবন, কৃষিজমির বিস্তার, ঢাকায় একাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট—এসব সম্পদের সঙ্গে তাদের ঘোষিত আয়ের সামঞ্জস্য নেই। অভিযোগকারীরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে তাদের বেতনের বাইরে সম্পদের উৎস কী, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই ভাইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল। রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। গ্রামের মানুষ বলছেন, সে সময় প্রশাসনের অনেকেই তাদের বিষয়ে নীরব থাকতেন। ফলে জমি দখল বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে কেউ সামনে এলেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার মিলত না। এই দীর্ঘ নীরবতা ভাঙতে বড় ভূমিকা রাখে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো।

দুই ভাইকে ঘিরে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে “কোটিপতি দুই ভাইয়ের ভয়ে তটস্থ গ্রামের মানুষ” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় আসে। স্থানীয়রা জানান, বহুদিনের ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে তখন অনেকে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান। সংবাদ সম্মেলন করে কয়েকজন ভুক্তভোগী নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরেন।

পরবর্তীতে রফিকুল ইসলাম শফির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয় বলে জানা যায়। গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা ভবনে সাক্ষাৎকার গ্রহণের আয়োজন করা হলে সেখানে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়। অভিযোগ ওঠে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম শফি বিপুল সংখ্যক লোকজন নিয়ে উপস্থিত হন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এতে তদন্ত পরিবেশ ভীতিকর হয়ে ওঠে। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল তদন্তকে প্রভাবিত করার কৌশল। পরে সংশ্লিষ্টরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

এদিকে মো. শওকত আলীর বিরুদ্ধেও সরকারি পর্যায়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক নোটিশে অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, সংবাদে প্রকাশিত অভিযোগ তদন্তের স্বার্থে নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণসহ সহযোগিতা করতে হবে। এই নোটিশ প্রকাশ্যে আসার পর গ্রামজুড়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বলেন, এতদিন পর হলেও অন্তত বিষয়টি এখন আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় এসেছে।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের তদন্তে জমির দলিল, খতিয়ান, কর পরিশোধের নথি, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর বিবরণী, সম্পদ অর্জনের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে বিভাগীয় ব্যবস্থা ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কিংবা ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত গড়াতে পারে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্তদের জন্য তা স্বস্তির বিষয় হবে।

অভিযুক্ত মো. শওকত আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোনো জ্ঞাতবহির্ভূত আয় করেননি। তার এবং তার স্ত্রীর সঞ্চয়ের অর্থ থেকে কিছু জমি কেনা হয়েছে মাত্র। তিনি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন। অন্যদিকে রফিকুল ইসলাম শফির পক্ষ থেকেও অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের একটি অংশ বলছে, কেবল বক্তব্য নয়, প্রকৃত সত্য বের করতে নিরপেক্ষ তদন্তই সবচেয়ে জরুরি।

গ্রামবাসীরা বলছেন, জমি তাদের কাছে শুধু সম্পত্তি নয়, জীবিকার ভিত্তি। কয়েক বিঘা জমি হারানো মানে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যাওয়া। তাই জমি দখলের অভিযোগ তাদের কাছে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিষয় নয়, বেঁচে থাকার প্রশ্ন। তারা চান, যে-ই হোক—সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী বা ধনী ব্যক্তি—আইনের চোখে সবাই সমান হোক।

অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনা শুধু দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; এটি স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গ্রামীণ ন্যায়বিচার ব্যবস্থারও একটি প্রতিচ্ছবি। যখন সাধারণ মানুষ মনে করেন তারা কথা বলতে পারবেন না, তখন সমস্যা আরও গভীরে যায়। আর যখন তারা একসঙ্গে মুখ খোলেন, তখন বহু বছরের নীরবতা ভেঙে যায়।

সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ তদন্তে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ভয়মুক্তভাবে সাক্ষ্য দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, জমি সংক্রান্ত নথিপত্র ডিজিটাল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। তৃতীয়ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে আয়কর, ব্যাংক হিসাব ও বৈধ আয় বিশ্লেষণ জরুরি। চতুর্থত, তদন্ত প্রতিবেদন যেন শুধু দাপ্তরিক ফাইলে আটকে না থাকে, সে দিকেও নজর দিতে হবে।

এলাকার তরুণদের অনেকে বলছেন, তারা এমন একটি সমাজ চান যেখানে সরকারি চাকরি মানে সেবা, ভয় দেখানোর লাইসেন্স নয়। একজন কর্মকর্তা গ্রামের গর্ব হতে পারেন, যদি তিনি ন্যায়পরায়ণ থাকেন। কিন্তু যদি পদমর্যাদা ব্যবহার করে মানুষকে চাপে রাখা হয়, তবে তা পুরো ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে দেয়।

গুরুদাসপুরে এখন চায়ের দোকান থেকে হাটবাজার—সব জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলী। কেউ বলছেন, এবার বড় কিছু হবে। কেউ বলছেন, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। আবার অনেকে আশা করছেন, নতুন বাস্তবতায় অন্তত তদন্ত সুষ্ঠু হবে এবং সত্য প্রকাশ পাবে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, তারা প্রতিশোধ চান না; তারা ন্যায়বিচার চান। কেউ যদি অবৈধভাবে জমি নিয়ে থাকে, তা ফেরত দেওয়া হোক। কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকে, তার জবাবদিহি হোক। কেউ যদি অবৈধ সম্পদ গড়ে থাকে, তার উৎস তদন্ত হোক। তাদের মতে, বিচার হলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার নয়, পুরো সমাজ উপকৃত হবে।

এই ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকাও নতুন করে সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, বহুদিন তারা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েও সাড়া পাননি। কিন্তু সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এটি দেখিয়েছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখনো জনস্বার্থ রক্ষার বড় হাতিয়ার হতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার চাপা পড়ে থাকা অভিযোগ সামনে আনতে সংবাদমাধ্যমের বিকল্প নেই।

সব মিলিয়ে রফিকুল ইসলাম শফি ও মো. শওকত আলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন কেবল একটি গ্রামের সীমাবদ্ধ ইস্যু নয়; এটি ক্ষমতা, সম্পদ, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের জাতীয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অন্যদিকে অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থন। এই দুই অবস্থানের মাঝে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরপেক্ষ তদন্ত, সত্য উদঘাটন এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। গুরুদাসপুরের মানুষ তাকিয়ে আছেন—বহু বছরের অভিযোগ কি এবার বিচার পাবে, নাকি আবারও সবকিছু সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যা