ঢাকা ০৫:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে দুই পরিচালক (চঃ দাঃ) এর খুঁটির জোর কোথায়? এখনো বহাল তবিয়তে শফিকুল ইসলাম ও নাঈম গোলদার তেহরানে শতাব্দী প্রাচীন চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রে হামলা ‘আপনারা কাদা ছোঁড়াছুড়ি করবেন না’ প্রধানমন্ত্রী রাজপ্রাসাদে অফিস না করে সচিবালয়ে এসে অফিস করেন চুয়াডাঙ্গায় তাপমাত্রা ৩৮.৫ ডিগ্রি, গলে যাচ্ছে রাস্তার পিচ লক্ষ্মীপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে দুই শ্রমিকের মৃত্যু এলপি গ্যাসের দাম একলাফে বাড়ল ৩৮৭ টাকা শত্রুরা স্থল হামলার চেষ্টা করলে একজনও যেন বাঁচতে না পারে মায়ের দাফন,ভাইয়ে’র জানাযায় দাফন,যেতে পারেননি ১৭ বছর নির্যাতিত বিএনপি নেতা মনোয়ার হাসান জীবন গড়তে চান চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত ‘মডেল’ ওয়ার্ড লামায় শিক্ষকের হাতে মারধর ৬ বছরের শিশু শিক্ষার্থী অজ্ঞান : এলাকায় জুড়ে সমালোচনার ঝড়

গাংনী পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার ১২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম দূর্নীতি

গাংনী পৌরসভায় উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেই উন্নয়নের গুণগত মান, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব উপকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজাকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ, সমালোচনা ও বিতর্ক সামনে আসায় বিষয়টি এখন স্থানীয় জনমনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে আশা তৈরি হলেও, বাস্তব চিত্র নিয়ে ভিন্ন কথা বলছেন পৌরবাসী।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণ, সড়ক কার্পেটিং, আরসিসি ও ইউনিব্লক রাস্তা, মার্কেট নির্মাণ, পার্ক উন্নয়ন, গোরস্থান উন্নয়ন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ল্যাট্রিন স্থাপনসহ নানা অবকাঠামোগত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিম্নমানের কাজ হয়েছে।
পৌরবাসীর দাবি, অনেক প্রকল্পেই কাজের মান অত্যন্ত খারাপ। কোথাও সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকার সমস্যাও আগের মতোই রয়ে গেছে। এতে করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তব সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব টয়লেট এমন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে মানুষের যাতায়াত কম, ফলে এগুলো ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টয়লেটগুলো অযত্নে পড়ে রয়েছে বা বন্ধ অবস্থায় আছে। ফলে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিক সেবা নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। পৌরবাসীর ভাষ্য, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে ঘুষ দিতে হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, টাকা দিলে দ্রুত সেবা পাওয়া যায়, আর টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে তাদের জীবনযাত্রার মানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নানা ক্ষেত্রে হয়রানি বেড়েছে। তাদের মতে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
অভিযোগের তীর সরাসরি পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার দিকে নির্দেশ করছেন অনেকেই। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে তার তদারকির ঘাটতি রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
এমনকি গত প্রায় ২২ মাসে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, এত অল্প সময়ে কিছু মানুষের জীবনযাত্রার মানে হঠাৎ পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক নয়। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুযায়ীই সব কাজ করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। তার দাবি, নির্ধারিত মান বজায় রেখেই কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন জানান, তার কাছে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কেউ যদি লিখিতভাবে অভিযোগ দেন, তাহলে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখব এবং প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, লিখিত অভিযোগ না থাকলেও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা জরুরি। কারণ, অনেক সময় সাধারণ মানুষ ভয় বা জটিলতার কারণে লিখিত অভিযোগ দিতে চান না। তারা মনে করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করা উচিত।
গাংনী পৌরসভায় উন্নয়নের এই চিত্র শুধু অবকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না—এমনটাই মত স্থানীয় সচেতন মহলের।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় জরিপ ও পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, তা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রকল্পই হয়েছে এলোমেলোভাবে, যার ফলে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি করা হয়নি। ফলে ঠিকাদাররা ইচ্ছেমতো কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রসিদ ছাড়া অর্থ আদায় ও ঘুষের অভিযোগ প্রমাণ করে যে, এই খাতে বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।
গাংনী পৌরসভার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না। বরং নানা ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বাড়ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হোক। যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণই যথেষ্ট নয়; সেই প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন, গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আর এই দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট সকলের, বিশেষ করে প্রকৌশল বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা সক্ষম হয়।
সবশেষে বলা যায়, গাংনী পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে উন্নয়নের বড় বড় পরিকল্পনা, অন্যদিকে রয়েছে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন। এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তবেই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে দুই পরিচালক (চঃ দাঃ) এর খুঁটির জোর কোথায়? এখনো বহাল তবিয়তে শফিকুল ইসলাম ও নাঈম গোলদার

গাংনী পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার ১২৭ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম দূর্নীতি

আপডেট সময় ১২:৩১:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

গাংনী পৌরসভায় উন্নয়নের নামে বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সেই উন্নয়নের গুণগত মান, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব উপকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়া পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজাকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ, সমালোচনা ও বিতর্ক সামনে আসায় বিষয়টি এখন স্থানীয় জনমনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক, পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগকে ঘিরে নতুন করে আশা তৈরি হলেও, বাস্তব চিত্র নিয়ে ভিন্ন কথা বলছেন পৌরবাসী।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণ, সড়ক কার্পেটিং, আরসিসি ও ইউনিব্লক রাস্তা, মার্কেট নির্মাণ, পার্ক উন্নয়ন, গোরস্থান উন্নয়ন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ল্যাট্রিন স্থাপনসহ নানা অবকাঠামোগত কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নিম্নমানের কাজ হয়েছে।
পৌরবাসীর দাবি, অনেক প্রকল্পেই কাজের মান অত্যন্ত খারাপ। কোথাও সড়ক নির্মাণের কিছুদিনের মধ্যেই ভেঙে যাচ্ছে, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে না। বর্ষা মৌসুমে পানি জমে থাকার সমস্যাও আগের মতোই রয়ে গেছে। এতে করে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। উন্নয়নের নামে অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তব সুফল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ।
বিশেষ করে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব টয়লেট এমন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে মানুষের যাতায়াত কম, ফলে এগুলো ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টয়লেটগুলো অযত্নে পড়ে রয়েছে বা বন্ধ অবস্থায় আছে। ফলে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, নাগরিক সেবা নিয়েও উঠেছে নানা অভিযোগ। পৌরবাসীর ভাষ্য, হোল্ডিং ট্যাক্সসহ বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়া অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোনো কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে ঘুষ দিতে হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, টাকা দিলে দ্রুত সেবা পাওয়া যায়, আর টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে তাদের জীবনযাত্রার মানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং নানা ক্ষেত্রে হয়রানি বেড়েছে। তাদের মতে, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের সময় জনগণের চাহিদা ও বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
অভিযোগের তীর সরাসরি পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজার দিকে নির্দেশ করছেন অনেকেই। তাদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে তার তদারকির ঘাটতি রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারি প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
এমনকি গত প্রায় ২২ মাসে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ও ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার অস্বাভাবিক পরিবর্তন নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, এত অল্প সময়ে কিছু মানুষের জীবনযাত্রার মানে হঠাৎ পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক নয়। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজা। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুযায়ীই সব কাজ করা হচ্ছে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। তার দাবি, নির্ধারিত মান বজায় রেখেই কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আনোয়ার হোসেন জানান, তার কাছে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “কেউ যদি লিখিতভাবে অভিযোগ দেন, তাহলে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখব এবং প্রয়োজনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, লিখিত অভিযোগ না থাকলেও বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা জরুরি। কারণ, অনেক সময় সাধারণ মানুষ ভয় বা জটিলতার কারণে লিখিত অভিযোগ দিতে চান না। তারা মনে করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করা উচিত।
গাংনী পৌরসভায় উন্নয়নের এই চিত্র শুধু অবকাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে যদি সঠিক পরিকল্পনা, তদারকি এবং জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না—এমনটাই মত স্থানীয় সচেতন মহলের।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় জরিপ ও পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, তা জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রকল্পই হয়েছে এলোমেলোভাবে, যার ফলে সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এছাড়া কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব ক্ষেত্রে যথাযথ নজরদারি করা হয়নি। ফলে ঠিকাদাররা ইচ্ছেমতো কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রসিদ ছাড়া অর্থ আদায় ও ঘুষের অভিযোগ প্রমাণ করে যে, এই খাতে বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্প শুধু অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই এসব প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাবে না।
গাংনী পৌরসভার বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না। বরং নানা ক্ষেত্রে দুর্ভোগ বাড়ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হোক। যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
গাংনী পৌরসভাকে একটি আধুনিক, বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হলে শুধু প্রকল্প গ্রহণই যথেষ্ট নয়; সেই প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন, গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সেবায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আর এই দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট সকলের, বিশেষ করে প্রকৌশল বিভাগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পৌর প্রকৌশলী শামীম রেজাকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে কতটা সক্ষম হয়।
সবশেষে বলা যায়, গাংনী পৌরসভার উন্নয়ন কার্যক্রম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে উন্নয়নের বড় বড় পরিকল্পনা, অন্যদিকে রয়েছে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন। এই দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তবেই প্রকৃত অর্থে উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।