সংবাদ শিরোনাম ::
সানভিউ টাওয়ার্সের দখলবাজি: শতকোটি টাকার সরকারি জমি বেহাত মীর শাহে আলমের হাত ধরে বদলে যাচ্ছে শিবগঞ্জের সমাজ ও শিক্ষার মানচিত্র অ্যাভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করলো আমিরাত বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ বর্তমান সংসদের কোনো সদস্য ঋণখেলাপি নন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ নীলফামারীতে পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত, সম্মাননা দেয়া হলো তিনটি স্কুলকে আত্রাইয়ে ৫০ জাতের দেশীয় ফলের প্রদর্শনী নিয়ে ব্যতিক্রমী ফল উৎসব অনুষ্ঠিত নি’হ’ত নন্দিনীর বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছুটে গেলেন ত্রাণমন্ত্রী

কৃষকের নামে ঋণ তুলে নিয়েছেন ব্যবস্থাপক

কোনোদিন ব্যাংকেই যাইনি, অথচ ঋণখেলাপির লাল নোটিশ এসেছে বাড়িতে। মাঠে এক শতক জমিও নেই আমার, নাম-ঠিকানা ধরে জমির ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে ব্যাংক থেকে ৯-১০ বছর আগে আমার নামে কৃষি ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। নোটিশ পেয়ে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েছি। কালাই পৌর শহরের আঁওড়া মহল্লার নুর আলম মণ্ডল এসব কথা বলছিলেন।

অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাটের কালাই শাখা থেকে এই চিঠি পেয়েছেন নুর আলম। শুধু তিনিই নন, ২০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিসহ অর্ধশতাধিক পরিবারকে এমন নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৬-২০১৭ সালে বিভিন্ন অঙ্কের ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের বাড়ি কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা ও উপজেলার হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামে। তারা এখন নিয়মিত ধরনা দিচ্ছেন ব্যাংকে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।

বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ জানান, ২০১৬-২০১৭ সালে কর্মরত শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম ও দুজন ফিল্ড সুপারভাইজারকে এসব ভুয়া ঋণের বিষয়ে তলব করা হয়েছে। এসবের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের অবসরকালীন সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তৎকালীন দুই ফিল্ড সুপারভাইজার অন্য শাখায় কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালাম বলেন, ‘শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম অফিস সময়ের পর চাকরির ভয় দেখিয়ে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছেন। চাকরি হারানোর ভয়ে আমরা ভুয়া ঋণের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি। তবে কার নামে কত ঋণ নিয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।’

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে জানা যায়, কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, আহম্মেদাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর গ্রামের ৩৮ জন, হারুঞ্জা গ্রামের ৩৩ জনের নামে এই শাখা থেকে বিভিন্ন পরিমাণ কৃষি ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। যাদের নামে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যা ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর নামে ২০১৬ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে সুদ-আসলে ৯৯ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাঁর পরিবারকে।

আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যার ছেলে সোহেল মোল্ল্যা বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। জীবিত থাকা অবস্থায় বাবার নামে কৃষি ঋণ ছিল। বাবা সেই ঋণ পরিশোধও করেছেন। হঠাৎ করে বাবার নামে ঋণ পরিশোধের নোটিশ এসেছে। দেশে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। ব্যবস্থাপকের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত।’ একই ধরনের অভিযোগ হারুঞ্জা বাহিরপাড়া গ্রামের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে ফজলুর রহমানের।

আঁওড়া মহল্লার ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ে। একটি ভ্যান কিনতে টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। তখন ঋণের জন্য ব্যাংকের দালাল আব্দুস সামাদের কাছে যাই। সে বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলে পাঁচ হাজার টাকাসহ আইডি কার্ড ও ছবি দিতে হবে। দুই হাজার টাকা, আইডি কার্ডের ফটোকপি ও দুই কপি ছবি দিই তার কাছে। ১৫ দিন পর টাকা, আইডি কার্ড ও ছবি ফেরত দিয়ে বলে আপাতত ঋণ দেওয়া বন্ধ আছে। এখন দেখছি আমার নামে ২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। সুদ-আসলে সেই টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ২০০।’

আঁওড়া মহল্লার জাহানারা বেগম ঢাকায় কাজ করেন। তাঁর নামে কালাই শাখা থেকে ৩৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই গ্রামের খাজাউল ইসলামের নামে ৪৫ হাজার টাকা, শরাফত আলীর নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার দালাল আঁওড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘এলাকার যে কোনো ব্যক্তির আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিলেই ম্যানেজার আমাকে দুই হাজার টাকা করে দিতেন। আইডি কার্ড ও ছবি নিয়ে তিনি কী করতেন তা জানা নেই। আমি কমপক্ষে ৬০-৭০ জনের আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিয়েছি। এখন শুনছি তাদের নামে ঋণ তুলে নিয়েছেন ম্যানেজার নূরুল ইসলাম। অভাবের কারণে আমি এই কাজ করেছি।’

জানতে চাইলে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসরে এসেছি, বয়স অনেক হয়েছে। এত আগের বিষয় কী মনে আছে। বাদ দেন এসব কথা, নিউজটি বন্ধ রাখতে কী করতে হবে তাই বলেন। যা ঘটেছে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর আমার বিষয়।’
অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক মো. জুলফিকার আলী বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই জালিয়াতি করে নেওয়া অর্থ ওই ব্যবস্থাপকের পেনশন থেকে সমন্বয় করা হবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সানভিউ টাওয়ার্সের দখলবাজি: শতকোটি টাকার সরকারি জমি বেহাত

কৃষকের নামে ঋণ তুলে নিয়েছেন ব্যবস্থাপক

আপডেট সময় ১২:২৪:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

কোনোদিন ব্যাংকেই যাইনি, অথচ ঋণখেলাপির লাল নোটিশ এসেছে বাড়িতে। মাঠে এক শতক জমিও নেই আমার, নাম-ঠিকানা ধরে জমির ভুয়া কাগজপত্র প্রস্তুত করে ব্যাংক থেকে ৯-১০ বছর আগে আমার নামে কৃষি ঋণ তুলে নেওয়া হয়েছে। নোটিশ পেয়ে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েছি। কালাই পৌর শহরের আঁওড়া মহল্লার নুর আলম মণ্ডল এসব কথা বলছিলেন।

অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাটের কালাই শাখা থেকে এই চিঠি পেয়েছেন নুর আলম। শুধু তিনিই নন, ২০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিসহ অর্ধশতাধিক পরিবারকে এমন নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ২০১৬-২০১৭ সালে বিভিন্ন অঙ্কের ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশের বাড়ি কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা ও উপজেলার হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামে। তারা এখন নিয়মিত ধরনা দিচ্ছেন ব্যাংকে। এ নিয়ে তদন্ত চলছে।

বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ জানান, ২০১৬-২০১৭ সালে কর্মরত শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম ও দুজন ফিল্ড সুপারভাইজারকে এসব ভুয়া ঋণের বিষয়ে তলব করা হয়েছে। এসবের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপকের অবসরকালীন সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তৎকালীন দুই ফিল্ড সুপারভাইজার অন্য শাখায় কর্মরত আছেন। তাদের মধ্যে ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালাম বলেন, ‘শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম অফিস সময়ের পর চাকরির ভয় দেখিয়ে এসব কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়েছেন। চাকরি হারানোর ভয়ে আমরা ভুয়া ঋণের কাগজপত্রে স্বাক্ষর করেছি। তবে কার নামে কত ঋণ নিয়েছেন তা আমাদের জানা নেই।’

ব্যাংকের খেলাপি ঋণের তালিকা থেকে জানা যায়, কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, আহম্মেদাদ ইউনিয়নের ঝামুটপুর গ্রামের ৩৮ জন, হারুঞ্জা গ্রামের ৩৩ জনের নামে এই শাখা থেকে বিভিন্ন পরিমাণ কৃষি ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। যাদের নামে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যা ১৫ বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর নামে ২০১৬ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে সুদ-আসলে ৯৯ হাজার ২০০ টাকা পরিশোধের নোটিশ দেওয়া হয়েছে তাঁর পরিবারকে।

আব্দুর রাজ্জাক মোল্ল্যার ছেলে সোহেল মোল্ল্যা বলেন, ‘আমার বাবা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। জীবিত থাকা অবস্থায় বাবার নামে কৃষি ঋণ ছিল। বাবা সেই ঋণ পরিশোধও করেছেন। হঠাৎ করে বাবার নামে ঋণ পরিশোধের নোটিশ এসেছে। দেশে লুটপাটের মহোৎসব চলছে। ব্যবস্থাপকের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত।’ একই ধরনের অভিযোগ হারুঞ্জা বাহিরপাড়া গ্রামের মৃত খলিলুর রহমানের ছেলে ফজলুর রহমানের।

আঁওড়া মহল্লার ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ে। একটি ভ্যান কিনতে টাকার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। তখন ঋণের জন্য ব্যাংকের দালাল আব্দুস সামাদের কাছে যাই। সে বলে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিলে পাঁচ হাজার টাকাসহ আইডি কার্ড ও ছবি দিতে হবে। দুই হাজার টাকা, আইডি কার্ডের ফটোকপি ও দুই কপি ছবি দিই তার কাছে। ১৫ দিন পর টাকা, আইডি কার্ড ও ছবি ফেরত দিয়ে বলে আপাতত ঋণ দেওয়া বন্ধ আছে। এখন দেখছি আমার নামে ২০১৭ সালে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। সুদ-আসলে সেই টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ২০০।’

আঁওড়া মহল্লার জাহানারা বেগম ঢাকায় কাজ করেন। তাঁর নামে কালাই শাখা থেকে ৩৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। একই গ্রামের খাজাউল ইসলামের নামে ৪৫ হাজার টাকা, শরাফত আলীর নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার দালাল আঁওড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘এলাকার যে কোনো ব্যক্তির আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিলেই ম্যানেজার আমাকে দুই হাজার টাকা করে দিতেন। আইডি কার্ড ও ছবি নিয়ে তিনি কী করতেন তা জানা নেই। আমি কমপক্ষে ৬০-৭০ জনের আইডি কার্ডের ফটোকপি ও ছবি দিয়েছি। এখন শুনছি তাদের নামে ঋণ তুলে নিয়েছেন ম্যানেজার নূরুল ইসলাম। অভাবের কারণে আমি এই কাজ করেছি।’

জানতে চাইলে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলাম বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসরে এসেছি, বয়স অনেক হয়েছে। এত আগের বিষয় কী মনে আছে। বাদ দেন এসব কথা, নিউজটি বন্ধ রাখতে কী করতে হবে তাই বলেন। যা ঘটেছে তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আর আমার বিষয়।’
অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক মো. জুলফিকার আলী বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই জালিয়াতি করে নেওয়া অর্থ ওই ব্যবস্থাপকের পেনশন থেকে সমন্বয় করা হবে।