নানা অনিয়ম করেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন, অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর সাজেদুর রহমান। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম এবং পেশাগত নৈতিকতা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও অদৃশ্য প্রভাবে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
উল্লেখযোগ্য কিছু অভিযোগ হলো-আওয়ামীপন্থি এই কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিবের প্রশ্রয় পেয়ে থাকেন। ফলে তার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই করা হোক না কেন, সেগুলো কখনো তদন্তের মুখ দেখে না। তার এ ধরনের কর্মকাণ্ড অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মীর সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে করা কোনো অভিযোগই সত্য নয়। আমি তো নিজে আমার পদায়ন আদেশ করতে পারি না। সব আদেশ মন্ত্রণালয় করে। সুতরাং মন্ত্রণালয়কে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’ তিনি দাবি করেন, ‘নিউজ করার আগে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আরও অনুসন্ধান করেন। তাহলেই সত্যতা পাবেন।’
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি গ্রেডেশন (জ্যেষ্ঠতা) তালিকায় ৫১ নম্বর সিরিয়ালে অবস্থান করা সত্ত্বেও ২০২১ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে পরিচালক পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। নিয়মানুযায়ী পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও তদবিরের মাধ্যমে তিনি ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব বাগিয়ে নেন, যা প্রচলিত পদোন্নতি ও প্রশাসনিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এসব বিষয়ে কথা বলতে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আশরাফী আহমদের কার্যালয়ে গিয়েও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বেশির ভাগ সময় তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকেন।
অভিযোগে বলা হয়, ময়মনসিংহ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে মীর সাজেদুর রহমান তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেন। পরে ময়মনসিংহের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ফাহমি গোলন্দাজ বাবেলের তদবিরে তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইইএম) পদে দায়িত্ব লাভ করেন। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট তিনি অফিসে এলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রোষানলে পড়েন এবং ভয়ে অফিস ত্যাগ করেন। যে ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর কয়েকদিন তিনি আত্মগোপনে থাকেন এবং অফিসে উপস্থিত হননি। পরে ভোল পালটিয়ে এ কর্মকর্তা নিজেকে জামায়াতপন্থি হিসাবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এরপর নানামুখী জোর তদবিরে পরিচালক (প্রশাসন) হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
কোনো লিখিত আবেদন বা সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক কিংবা পরিচালকের অগ্রায়নপত্র (ফরোয়ার্ডিং) ছাড়াই তিনি প্রায় ৩০০ জন চিকিৎসককে বদলি করেন। এই বদলি কার্যক্রমে প্রশাসনিক বিধি ও নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। এছাড়াও অধিদপ্তরের অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির একটি ফাইল লুকিয়ে ফেলার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে অভিযোগ দাখিল করা হলেও কোনো তদন্ত করা হয়নি।
এছাড়া পরিচালক (প্রশাসন) হিসাবে সাজেদুর রহমান প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে কোনো রূপ আবেদন বা সংশ্লিষ্ট জেলা-বিভাগের কর্মকর্তার প্রত্যয়ন ছাড়া নিকটাত্মীয় হিসাবে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আবিদা সুলতানাকে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে পটুয়াখালী সদরে বদলি করেন। একই ভাবে ১৯ অক্টোবর মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস ট্রেনিং সেন্টারের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা মাহবুবাকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের কালপাহাড়িয়া এফডব্লিউসিতে বদলি করা হয়, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার তাকে পূর্বের পদে ফিরিয়ে আনা হয়।
অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার তৎকালীন একজন কর্মকর্তা জানান, নজিরবিহীনভাবে পরিচালকের (প্রশাসন) নির্দেশে অনেক ফাইল ব্যাকডেটে সাবেক মহাপরিচালকের বাসা থেকে অনুমোদন করে আনা হয়। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে অনুমোদিত সেসব ফাইলের জিওগুলো (সরকারি আদেশ) একসঙ্গে জারি না করে ধীরে ধীরে করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তৎকালীন প্রশাসন ইউনিটের একজন কর্মকর্তা উপপরিচালক পদে একটি জেলায় মন্ত্রণালয়ের আদেশে পদায়িত হয়ে থাকা সত্ত্বেও ওই আদেশটি বহাল থাকা অবস্থায় অধিদপ্তরে নিজের আরেকটি আদেশ করান। মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান-‘ওই কর্মকর্তা উপপরিচালক হিসাবে পদায়নের সেই আদেশটি বাতিল না করেই পরিচালকের (প্রশাসন) সহযোগিতায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে আদেশটি করিয়েছেন, যার কপি এ বিভাগে পাঠানোর মাধ্যমে জানতে পারি।’
সম্প্রতি উপসচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত রোষানলের কারণে বেশ কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে। যার বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা মহাপরিচালকের কাছেও অভিযোগ করেছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাজেদুর রহমান তার অপকর্মের সহযোগী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা (৩১তম বিসিএস) কর্মকর্তা নাজমুর রওশন সুমেলকে পদোন্নতি না পাওয়া সত্ত্বেও ময়মনসিংহ বিভাগে সহকারী পরিচালক হিসাবে চলতি দায়িত্বে পদায়ন করানো হয়। আবার যখন তিনি অধিদপ্তরে পোস্টিং নিয়ে আসতে সক্ষম হন, তখন সব কাজের সহযোগী সুমেলকে আইইএম ইউনিটে পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করেন।
এছাড়াও পেনশন ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ রয়েছে, যেখানে উপপরিচালক সায়মা রেজাকে কেন্দ্র করে একটি অস্বচ্ছ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পদ না থাকা সত্ত্বেও সায়মা রেজা প্রায় ১০ বছর ধরে সংযুক্তিতে পেনশন ইউনিটে কাজ করছেন এবং এই ইউনিটে থাকার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি ভিত্তিহীন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পেনশনসংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সায়মা রেজা ও পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমানকে অলিখিতভাবে অর্থ প্রদান করতে হয়। অর্থ প্রদান না করলে মাসের পর মাস ফাইল অগ্রসর হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে পেনশন সহজীকরণের কথা বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। মূলত সায়মা রেজাসহ কয়কজন কর্মচারী অযাচিত ব্যাখ্যা চেয়ে কালক্ষেপণ করেন। পেনশন ইউনিটের আবেদনগুলো এবং নিষ্পত্তির সময় সংক্রান্ত ফাইলগুলো তদন্ত করলেই থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরি জীবনের প্রাপ্য শেষ সম্বলটুকু রক্ষার জন্য সায়মা গংদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। মুখ খুললে পেনশন আটকে যাবে বলে তাদের অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে।
কাজে সহযোগিতার জন্য প্রায় ৬ মাস আগে একজন কল্যাণ কর্মকর্তাকে পেনশন ইউনিটে পদায়ন করা হলেও তাকে কোনো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং তাকে অন্যত্র বদলি হয়ে যেতে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জনস্বার্থে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক পদ বাগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মীর সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আমি কোথাও আবেদনের ভিত্তিতে যাইনি বা আসিনি। জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে কোনো দলকেও সমর্থন করার এখতিয়ারও নেই।’
আবেদন বা অগ্রায়নপত্র ছাড়াই চিকিৎসক বদলির বিষয়ে বলেন, ‘এটি আমার হাতে নয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখে। অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির ফাইল লুকানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, পদোন্নতির জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে। এজন্য ডিপিসি হয়। তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশে পদোন্নতি হয়। পরিচালক প্রশাসনের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
নাজমুর রওশন সুমেলকে সহকারী পরিচালক পদে পদায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজে ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক হিসাবে পদায়ন পাওয়ার পর তাকে সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিসাবে পাই। সেখান থেকে অধিদপ্তর তাকে আইইএম ইউনিটে পদায়ন করছে।’
উপপরিচালক সায়মা রেজার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রায় ১০ বছর ধরে সংযুক্তিতে পেনশন ইউনিটে কাজ করছেন-এটা ঠিক নয়। একই পদে ১০ বছর ধরে সংযুক্তিতে থাকা যায় না। উনি উপপরিচালক হয়েছেন দেড় বছর আগে।’
মোঃ মামুন হোসেন 
























