ঢাকা ০৫:৫০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
টিকিটের অগ্নিমূল্যে যাত্রীদের নাভিশ্বাস ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পোর্টেবল সিগন্যাল লাইট ব্যবহার শুরু পুলিশের ঈদযাত্রায় ‘তেলের টেনশনে’ শিডিউল বিপর্যয়ের শঙ্কা সালমান আগার রান আউট বিতর্কে যা বলছে এমসিসি ঈদযাত্রা নিরাপদ রাখতে নোয়াখালীতে র‍্যাবের কঠোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ঈদযাত্রায় সাভারে সড়কে মানুষের ঢল, বেড়েছে গণপরিবহনের চাপ কক্সবাজার সৈকতে বারুণী স্নান ও গঙ্গাপূজায় পুণ্যার্থীর ঢল মতিঝিলে চোর-পুলিশ খেলা, গুলিস্তানে পুলিশের সামনে নতুন নোট বিক্রি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, দুই পরিবহনকে জরিমানা
শতকোটি টাকা লুট

কৃষি খাতে মাফিয়া বাংলামার্ক

* এক প্রকল্পেই লুট ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা
* কৃষকের কাছে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে পণ্য বিক্রি
* ভুয়া কৃষক দেখিয়ে এক পণ্য দুইবার বিক্রি
* অস্তিত্ব নেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্টিভেনের
* আড়ালে মূল মালিক চট্টগ্রামের রফিকুল ইসলাম
* মালয়েশিয়ান কোম্পানির পরিচালক সাজানো হয় বাংলামার্কের ইরফানকে

টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে ছিল নানা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম বাংলামার্ক। তৎকালীন সরকারের ছায়াতলে থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে মাফিয়া হিসেবে গড়ে তোলে। শুধু একটি প্রকল্প থেকেই তারা হাতিয়ে নেয় ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রভ স্টিভেন নামে একজনের কথা বলা হলেও আদতে তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‘অশরীরী’ স্টিভেনকে খুঁজতে গিয়েই দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’টি গ্রহণ করা হয়। যাকে বলা হয়েছিল কৃষকদের জন্য যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু সেই প্রকল্প নিয়ে হাজার কোটি টাকা লুটপাটে মেতে ওঠে একটি চক্র। এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি জাল-জালিয়াতি করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে বাংলামার্কের নাম। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিরীক্ষায় উঠে এসেছে এই প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের চিত্র। সাবেক আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় বাংলামার্ক গ্রুপ দিনের পর দিন কৃষি খাতের বড় বড় কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এবার সামনে এসেছে ওই প্রতিষ্ঠানের গায়েবি মালিকের
নাম- ‘রব স্টিভেন’। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ‘স্টিভেন’-এর অপকর্মের দোসর কোম্পানির কর্মকর্তা ইরফান উদ্দিন ভিকির ভূমিকা নিয়েও।
২০২০ সালে শুরু হয় বহুল আলোচিত ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’।
আইএমইডির তথ্যমতে, প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তারা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উঠেছে বাংলামার্কের নাম।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে ধান-কাটার মেশিন জালিয়াতির মূল হোতা বাংলামার্ক। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলামার্ক মালয়েশিয়ান মার্কসান কো. লিমিটেডের কাছ থেকে মেশিন আমদানি করেছে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে জোচ্চুরি। কারণ বাংলামার্কে কর্মরত ইরফান উদ্দিন ভিকিকেই মালয়েশিয়ান মার্কসান কোম্পানির পরিচালক দেখানো হয়েছে। এর নেপথ্য লক্ষ্য আমদানি কর ফাঁকি দেওয়া।
জানা গেছে, ভিকির বাড়ি চট্টগ্রামে। নূর মোহাম্মদ তার বাবা। ভিকির পারিবারিক নাম ইরফান বিন নূর। বাংলামার্কের জেনারেল ম্যানেজার হওয়ার পর তিনি বনে যান ইরফান উদ্দিন ভিকি। উল্লেখ্য, মার্কসান কো. লি. মালয়েশিয়ার একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে থাকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিকির নাম পাল্টে গেছে ঠিক বাংলামার্ক গ্রুপের মালিক রব স্টিভেনের মতো। তার স্বাক্ষরেই বিকিকিনি হয় বাংলামার্কের প্রোডাক্ট।
কে এই রব স্টিভেন- তা জানে না কেউ। বাংলামার্কের ওয়েবসাইটে তার নাম থাকলেও বাস্তবে তাকে কেউ দেখেনি বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। ‘এটি একটি কাগুজে নাম’ উল্লেখ করে বাংলামার্কের এক কর্মী দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন , ‘এই ভুয়া নামের আড়ালে শত শত কোটি টাকা জাল-জালিয়াতি হয়েছে। ভুয়া নামের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপও সরকার নিতে পারবে না।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই বাংলামার্ক রব স্টিভেনের ভুয়া গল্প সাজায়। কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্টিভেন রয়েছেন শুধু কাগুজে নাম হিসেবে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের ধূর্ত মালিক মো. রফিকুল ইসলাম নিজেকে আড়ালে রাখতেই রব স্টিভেনকে জন্ম দিয়েছেন। রফিকুলের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশের কাঞ্চননগর গ্রামে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ নজির আহমদ। ভোটার আইডি অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৮৫ সালে। ৪০ বছর না পেরুতেই রফিকুল ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। এক প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় গড়ে তুলেছেন একের পর এক অধিপ্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ ১২ বছর তিনি সরকারের সঙ্গে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। তার ভাগ্যের দুয়ার খুলে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বিশেষ সহকারী এবং দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সরাসরি কল্যাণে।
এদিকে বাংলামার্ক গ্রুপের ওয়েবসাইটে জ্বলজ্বল করছে রব স্টিভেনের অস্তিত্ব। ২০১০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখানো হচ্ছে। অধিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে তার আরও পদবি।
কোম্পানির ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং লিঙ্কডিনেও রব স্টিভেনের খোঁজ পাওয়া যায়। আর সেখানেই ধরা পড়েছে রফিকুলের ধান্ধাবাজি। কারণ রব স্টিভেনের যে ছবি দেওয়া আছে তা মূলত রফিকুল ইসলামেরই। সাবেক আমলে সরকারের কাছ থেকে কৃষিতে রফিকুল ইসলাম পুরস্কার নিয়েছেন রব স্টিভেনের নামে। আবার সেই রফিকুল ইসলাম সরকারের নানা আয়োজনে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এক ব্যক্তির দুই পরিচয়- এটা আইনগতভাবে মহাঅপরাধ বলে দাবি করেন আইনজীবীরা।
বাংলামার্ক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- সে তথ্য নেই ওয়েবসাইটে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার নামও কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই কোম্পানির উত্থান আওয়ামী লীগ আমলে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত কমিটির ২১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলামার্কের নাম। সেখানে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ লোপাটে এই প্রকল্পে লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ, আবেদিন ইকুইপমেন্ট, চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি, মেটাল অ্যাগ্রিটেক, এসিআই মোটরস, এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাকডোনাল্ড ক্রপ কেয়ার, এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, গ্রিনল্যান্ড টেকনোলজিস, উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং ও আদি এন্টারপ্রাইজের নামও রয়েছে। আওয়ামী সরকার ক্ষমতাবলে বাংলামার্কের মতো ধান্ধাবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও তাদের
বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছিল। কিন্তু সে সময়ও দুর্নীতিবাজ কোম্পানিগুলোর কিছু হয়নি। শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে। অথচ দুর্নীতির ঘটনায় সরকার নয়জন কর্মকর্তাকে স্থায়ী এবং ২৫ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে,
বাংলামার্কের মতো কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যন্ত্রের প্রকৃত দামের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি দেখিয়েছে। ১৪ লাখ টাকার যন্ত্র কৃষকের কাছে ৩৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। কৃষকের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে সরকারি ভর্তুকির টাকা লুটপাট করেছে।
ভুয়া কৃষকদের নামে যন্ত্র বরাদ্দ দেখিয়ে একই মেশিন দুই দফা বিক্রি করেছে। চেসিস নাম্বার প্লেট পাল্টিয়ে নতুন
বিল-ভাইচার করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। যৌক্তিক কারণেই কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের জুন থেকে এই প্রকল্পের ভর্তুকির টাকা আর ছাড় করেনি। প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও প্রকল্প স্থগিত রাখা হয়েছে। সর্বশেষ এই প্রকল্প বন্ধের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য অসাধারণ এক উদ্যোগ রব স্টিভেনের মতো ধান্ধাবাজ এবং সরকারের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির জন্য বন্ধ হয়ে যাক- এটা করা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে ক্ষমতায় আছে বিএনপি জোট সরকার। এর মধ্যে বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষিক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাই সেই বিষয়টি বিবেচনায় এনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, এনবিআরের তথ্য ও আইএমইডির নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষেই মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, বিগত ১৭বছরে বিভিন্ন খাতে যেসব দুর্নীতি হয়েছে তার সবকিছুই তদন্ত হবে। বিশেষ করে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’র বিষয়ে অনেক তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে, যা অনেক জায়গায় প্রকাশিতও হয়েছে। আইএমইডি’র ২১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের নানা অনিয়মের যে চিত্রের কথা আপনি বলছেন সেটির বিরুদ্ধেও আমরা নিশ্চয় ব্যবস্থা নেব। ওই প্রকল্পের অনেককেই শাস্তিমূলকভাবে ওএসডি করা হয়েছে। বাংলামার্কের বিষয়টি যেহেতু উঠেছে আমরা তাদের বিরুদ্ধেও অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়ে বাংলামার্কের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ইরফান উদ্দিন ভিকি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, আপনারা যেহেতু অনুসন্ধান করেছেন আপনারাই প্রমাণ করুন। রব স্টিভেন কে- তা খুঁজে বের করুন। আমরা অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়িত করি। আপনি কোন প্রকল্পের কথা বলছেন, তা আমার মনে নেই।
তথ্য অনুসারে, কোম্পানির সুবিধাভোগীদের মধ্যে
অন্যতম ভিকি। খোঁজ নিতে বনানীর কামাল আতাতুর্কের অফিসে গিয়েও তাদের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি-এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্ষেপে গিয়ে ভিকি বলেন, সেটাও আপনি তদন্ত করেন।
বিগত সরকারের আমলে অসহায় কৃষকদের জিম্মি করে যারা হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা না নিলে এই সরকারও প্রশ্নবিদ্ধ হবে উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, দিনের পর দিন একটা শ্রেণি অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে যাবে আর আরেকটা শ্রেণি অবহেলিত থেকে মানবেতর জীবন কাটাবে, তা তো মানা যায় না। অবৈধ উপায়ে যারা কৃষকদের ঠকিয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে অবশ্যই।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

টিকিটের অগ্নিমূল্যে যাত্রীদের নাভিশ্বাস

শতকোটি টাকা লুট

কৃষি খাতে মাফিয়া বাংলামার্ক

আপডেট সময় ০১:১৭:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬

* এক প্রকল্পেই লুট ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা
* কৃষকের কাছে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি দামে পণ্য বিক্রি
* ভুয়া কৃষক দেখিয়ে এক পণ্য দুইবার বিক্রি
* অস্তিত্ব নেই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্টিভেনের
* আড়ালে মূল মালিক চট্টগ্রামের রফিকুল ইসলাম
* মালয়েশিয়ান কোম্পানির পরিচালক সাজানো হয় বাংলামার্কের ইরফানকে

টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে ছিল নানা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে অন্যতম বাংলামার্ক। তৎকালীন সরকারের ছায়াতলে থেকে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে মাফিয়া হিসেবে গড়ে তোলে। শুধু একটি প্রকল্প থেকেই তারা হাতিয়ে নেয় ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রভ স্টিভেন নামে একজনের কথা বলা হলেও আদতে তার কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ‘অশরীরী’ স্টিভেনকে খুঁজতে গিয়েই দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’টি গ্রহণ করা হয়। যাকে বলা হয়েছিল কৃষকদের জন্য যুগান্তকারী উদ্যোগ। কিন্তু সেই প্রকল্প নিয়ে হাজার কোটি টাকা লুটপাটে মেতে ওঠে একটি চক্র। এই প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি জাল-জালিয়াতি করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে এসেছে বাংলামার্কের নাম। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিরীক্ষায় উঠে এসেছে এই প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা লুটপাটের চিত্র। সাবেক আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় বাংলামার্ক গ্রুপ দিনের পর দিন কৃষি খাতের বড় বড় কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এবার সামনে এসেছে ওই প্রতিষ্ঠানের গায়েবি মালিকের
নাম- ‘রব স্টিভেন’। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে ‘স্টিভেন’-এর অপকর্মের দোসর কোম্পানির কর্মকর্তা ইরফান উদ্দিন ভিকির ভূমিকা নিয়েও।
২০২০ সালে শুরু হয় বহুল আলোচিত ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’।
আইএমইডির তথ্যমতে, প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ব্যয়ে অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তারা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উঠেছে বাংলামার্কের নাম।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে ধান-কাটার মেশিন জালিয়াতির মূল হোতা বাংলামার্ক। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলামার্ক মালয়েশিয়ান মার্কসান কো. লিমিটেডের কাছ থেকে মেশিন আমদানি করেছে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে জোচ্চুরি। কারণ বাংলামার্কে কর্মরত ইরফান উদ্দিন ভিকিকেই মালয়েশিয়ান মার্কসান কোম্পানির পরিচালক দেখানো হয়েছে। এর নেপথ্য লক্ষ্য আমদানি কর ফাঁকি দেওয়া।
জানা গেছে, ভিকির বাড়ি চট্টগ্রামে। নূর মোহাম্মদ তার বাবা। ভিকির পারিবারিক নাম ইরফান বিন নূর। বাংলামার্কের জেনারেল ম্যানেজার হওয়ার পর তিনি বনে যান ইরফান উদ্দিন ভিকি। উল্লেখ্য, মার্কসান কো. লি. মালয়েশিয়ার একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে থাকে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিকির নাম পাল্টে গেছে ঠিক বাংলামার্ক গ্রুপের মালিক রব স্টিভেনের মতো। তার স্বাক্ষরেই বিকিকিনি হয় বাংলামার্কের প্রোডাক্ট।
কে এই রব স্টিভেন- তা জানে না কেউ। বাংলামার্কের ওয়েবসাইটে তার নাম থাকলেও বাস্তবে তাকে কেউ দেখেনি বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। ‘এটি একটি কাগুজে নাম’ উল্লেখ করে বাংলামার্কের এক কর্মী দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন , ‘এই ভুয়া নামের আড়ালে শত শত কোটি টাকা জাল-জালিয়াতি হয়েছে। ভুয়া নামের কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপও সরকার নিতে পারবে না।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই বাংলামার্ক রব স্টিভেনের ভুয়া গল্প সাজায়। কোম্পানির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্টিভেন রয়েছেন শুধু কাগুজে নাম হিসেবে। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের ধূর্ত মালিক মো. রফিকুল ইসলাম নিজেকে আড়ালে রাখতেই রব স্টিভেনকে জন্ম দিয়েছেন। রফিকুলের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশের কাঞ্চননগর গ্রামে। তার বাবার নাম মোহাম্মদ নজির আহমদ। ভোটার আইডি অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৮৫ সালে। ৪০ বছর না পেরুতেই রফিকুল ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন। এক প্রতিষ্ঠানের ছায়ায় গড়ে তুলেছেন একের পর এক অধিপ্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ শাসনামলের শেষ ১২ বছর তিনি সরকারের সঙ্গে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। তার ভাগ্যের দুয়ার খুলে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বিশেষ সহকারী এবং দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সরাসরি কল্যাণে।
এদিকে বাংলামার্ক গ্রুপের ওয়েবসাইটে জ্বলজ্বল করছে রব স্টিভেনের অস্তিত্ব। ২০১০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাকে গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেখানো হচ্ছে। অধিপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রয়েছে তার আরও পদবি।
কোম্পানির ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং লিঙ্কডিনেও রব স্টিভেনের খোঁজ পাওয়া যায়। আর সেখানেই ধরা পড়েছে রফিকুলের ধান্ধাবাজি। কারণ রব স্টিভেনের যে ছবি দেওয়া আছে তা মূলত রফিকুল ইসলামেরই। সাবেক আমলে সরকারের কাছ থেকে কৃষিতে রফিকুল ইসলাম পুরস্কার নিয়েছেন রব স্টিভেনের নামে। আবার সেই রফিকুল ইসলাম সরকারের নানা আয়োজনে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এক ব্যক্তির দুই পরিচয়- এটা আইনগতভাবে মহাঅপরাধ বলে দাবি করেন আইনজীবীরা।
বাংলামার্ক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- সে তথ্য নেই ওয়েবসাইটে। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার নামও কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই কোম্পানির উত্থান আওয়ামী লীগ আমলে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত কমিটির ২১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলামার্কের নাম। সেখানে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল-ভাউচারে অর্থ লোপাটে এই প্রকল্পে লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আলিম ইন্ডাস্ট্রিজ, আবেদিন ইকুইপমেন্ট, চিটাগাং বিল্ডার্স অ্যান্ড মেশিনারি, মেটাল অ্যাগ্রিটেক, এসিআই মোটরস, এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যাকডোনাল্ড ক্রপ কেয়ার, এসকিউ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, গ্রিনল্যান্ড টেকনোলজিস, উত্তরণ ইঞ্জিনিয়ারিং ও আদি এন্টারপ্রাইজের নামও রয়েছে। আওয়ামী সরকার ক্ষমতাবলে বাংলামার্কের মতো ধান্ধাবাজ প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতি প্রমাণিত হলেও তাদের
বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিষয়টি নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছিল। কিন্তু সে সময়ও দুর্নীতিবাজ কোম্পানিগুলোর কিছু হয়নি। শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে। অথচ দুর্নীতির ঘটনায় সরকার নয়জন কর্মকর্তাকে স্থায়ী এবং ২৫ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে,
বাংলামার্কের মতো কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান যন্ত্রের প্রকৃত দামের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি দেখিয়েছে। ১৪ লাখ টাকার যন্ত্র কৃষকের কাছে ৩৪ লাখ টাকায় বিক্রি করেছে। কৃষকের নামে ভুয়া বিল-ভাউচার করে সরকারি ভর্তুকির টাকা লুটপাট করেছে।
ভুয়া কৃষকদের নামে যন্ত্র বরাদ্দ দেখিয়ে একই মেশিন দুই দফা বিক্রি করেছে। চেসিস নাম্বার প্লেট পাল্টিয়ে নতুন
বিল-ভাইচার করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। যৌক্তিক কারণেই কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের জুন থেকে এই প্রকল্পের ভর্তুকির টাকা আর ছাড় করেনি। প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকার পরও প্রকল্প স্থগিত রাখা হয়েছে। সর্বশেষ এই প্রকল্প বন্ধের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
কৃষকদের জন্য অসাধারণ এক উদ্যোগ রব স্টিভেনের মতো ধান্ধাবাজ এবং সরকারের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির জন্য বন্ধ হয়ে যাক- এটা করা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বর্তমানে ক্ষমতায় আছে বিএনপি জোট সরকার। এর মধ্যে বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষিক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাই সেই বিষয়টি বিবেচনায় এনে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদরা।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে জানান, এনবিআরের তথ্য ও আইএমইডির নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষেই মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, বিগত ১৭বছরে বিভিন্ন খাতে যেসব দুর্নীতি হয়েছে তার সবকিছুই তদন্ত হবে। বিশেষ করে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প’র বিষয়ে অনেক তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে, যা অনেক জায়গায় প্রকাশিতও হয়েছে। আইএমইডি’র ২১৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের নানা অনিয়মের যে চিত্রের কথা আপনি বলছেন সেটির বিরুদ্ধেও আমরা নিশ্চয় ব্যবস্থা নেব। ওই প্রকল্পের অনেককেই শাস্তিমূলকভাবে ওএসডি করা হয়েছে। বাংলামার্কের বিষয়টি যেহেতু উঠেছে আমরা তাদের বিরুদ্ধেও অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়ে বাংলামার্কের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ইরফান উদ্দিন ভিকি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, আপনারা যেহেতু অনুসন্ধান করেছেন আপনারাই প্রমাণ করুন। রব স্টিভেন কে- তা খুঁজে বের করুন। আমরা অনেক প্রকল্পই বাস্তবায়িত করি। আপনি কোন প্রকল্পের কথা বলছেন, তা আমার মনে নেই।
তথ্য অনুসারে, কোম্পানির সুবিধাভোগীদের মধ্যে
অন্যতম ভিকি। খোঁজ নিতে বনানীর কামাল আতাতুর্কের অফিসে গিয়েও তাদের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি-এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্ষেপে গিয়ে ভিকি বলেন, সেটাও আপনি তদন্ত করেন।
বিগত সরকারের আমলে অসহায় কৃষকদের জিম্মি করে যারা হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার ব্যবস্থা না নিলে এই সরকারও প্রশ্নবিদ্ধ হবে উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দৈনিক আমাদের মাতৃভূমিকে বলেন, দিনের পর দিন একটা শ্রেণি অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে যাবে আর আরেকটা শ্রেণি অবহেলিত থেকে মানবেতর জীবন কাটাবে, তা তো মানা যায় না। অবৈধ উপায়ে যারা কৃষকদের ঠকিয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে অবশ্যই।