ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা-এ গরুর হাট ইজারা নিয়ে গুরুতর অনিয়ম ও ‘নিকু’ বা সমঝোতা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা। ইজারা বঞ্চিত ঠিকাদারদের দাবি, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ মদদে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে উপজেলার সবচেয়ে বড় গরুর হাট ভুটিয়ারকোনা গরুর হাট-এর ইজারা কম মূল্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে প্রকাশ্যে আসার পর ঠিকাদার মহল, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বিষয়টিকে প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবের ফল বলেও উল্লেখ করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গৌরীপুর উপজেলার অন্যতম বড় পশুর হাট হলো ভুটিয়ারকোনা গরুর হাট। প্রতি বছর এই হাটে বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু কেনাবেচা হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ী ও পাইকাররা এই হাটে পশু নিয়ে আসেন। ফলে হাটটির আর্থিক গুরুত্বও অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই হাটটির ইজারা মূল্যও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হয়ে থাকে।
সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুটিয়ারকোনা গরুর হাটের ইজারা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি আহ্বান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর হাটটি ইজারা নেওয়ার আগ্রহে মোট ১১ জন ঠিকাদার শিডিউল ক্রয় করেন। তারা প্রত্যাশা করেছিলেন যে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে হাটটি ইজারা দেওয়া হবে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র প্রশাসনের সহযোগিতায় পুরো ইজারা প্রক্রিয়াটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ভূমিকার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে ‘নিকু’ বা সমঝোতার মাধ্যমে হাটটির ইজারা নির্ধারণ করা হয়।
ইজারা বঞ্চিত ঠিকাদারদের দাবি, এই সমঝোতা প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার জন্য হাটটির গড়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অথচ গত বছর একই হাটের ইজারা মূল্য ছিল ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৭ লাখ টাকা কম মূল্যে হাটটির ইজারা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে এতে সরকার কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই পুরো প্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা-এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের দাবি, প্রশাসনের প্রভাব ব্যবহার করে শিডিউল ক্রেতাদের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা হয়েছে এবং দরপত্র প্রক্রিয়াকে কার্যত অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হাবিবুল ইসলাম খান শহীদ এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি শিডিউল ক্রেতাদের ডেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সমঝোতায় বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিডিউল ক্রেতা বলেন, “যে ইজারার ক্ষেত্রে প্রশাসন নিজেই নিকুর পক্ষে অবস্থান নেয়, সেখানে সাধারণ ঠিকাদারদের কিছু বলার সুযোগ থাকে না। আমরা সবাই জানি যে প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা হয়ে গেছে। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে চুপ থেকেছে।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন দরপত্রের প্রতিযোগিতা আর থাকে না। তখন পুরো বিষয়টি আগে থেকেই ঠিক হয়ে যায়।”
অভিযোগ রয়েছে, এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে এবং সেই অর্থ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়েছে বলেও স্থানীয় মহলে আলোচনা রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হাবিবুল ইসলাম খান শহীদ-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, গৌরীপুর উপজেলায় মোট কতগুলো হাট ইজারা হয়েছে তা নথিপত্র দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনই বলা সম্ভব নয়।
এ সময় ইজারা সমঝোতা বা ‘নিকু’ বাণিজ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আজিম উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), ময়মনসিংহ জেলা বলেন, “লোকাল নিগোসিয়েশন বা স্থানীয় সমঝোতা হলে আমাদের কিছু করার থাকে না। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে এমন সমঝোতা হয়ে থাকে।”
রাজস্ব ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, “বিগত তিন বছরের গড়মূল্যের ভিত্তিতে ভুটিয়ারকোনা হাটের ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনো হাটটির ইজারা চূড়ান্ত হয়নি। পুরো প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন মহলের অনেকেই মনে করছেন, যদি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালিত হতো, তাহলে হাটটির ইজারা মূল্য আরও বেশি হতে পারত এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেত।
তাদের মতে, প্রশাসনের দায়িত্ব হলো স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি প্রশাসনের বিরুদ্ধেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়।
এদিকে ইজারা বঞ্চিত ঠিকাদারদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা দাবি করেছেন, ভুটিয়ারকোনা গরুর হাটের ইজারা প্রক্রিয়া তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে তা বাতিল করে পুনরায় উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হোক।
স্থানীয়রা মনে করছেন, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।
সংবাদ শিরোনাম ::
গৌরীপুরে গরুর হাট ইজারার অনিয়মে ক্ষতি প্রায় ৪০ লাখ টাকা
ইউএনও আফিয়া আমীন পাপ্পাকে ঘিরে ‘নিকু’ বাণিজ্যের অভিযোগ
-
মোঃ মামুন হোসেন - আপডেট সময় ১২:১৯:১৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ মার্চ ২০২৬
- ৫৪১ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ

























