বাংলাদেশের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর-এর বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা, অসন্তোষ ও অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. আবু সুফিয়ানকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
ডা. আবু সুফিয়ান দীর্ঘদিন ধরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাজ করে আসছেন। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সংস্থার কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করেছেন বলে জানা যায়। তার এই দীর্ঘ উপস্থিতি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে বলে একাংশ মনে করলেও, অন্য একটি অংশের কর্মকর্তারা মনে করেন—একই কেন্দ্রিক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ বলয় তৈরি করেছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমশ সীমিত পরিসরের কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের ভেতরে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, দায়িত্ব বণ্টন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট একটি গ্রুপের প্রভাব বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অধিদপ্তরের ভেতরে একটি নীরব বিভাজন তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একদিকে রয়েছে প্রশাসনিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল অংশ, অন্যদিকে রয়েছে এমন একটি অংশ যারা নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাওয়া বা উপেক্ষিত মনে করছেন। ফলে কর্মপরিবেশে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার অনুভূতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সম্প্রতি অধিদপ্তরে বড় আকারের জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের মতে, প্রায় ৬০০ জন কর্মচারী নিয়োগের এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিছু কর্মকর্তার দাবি—নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, সুপারিশ নির্ভরতা এবং আর্থিক লেনদেনের সম্ভাবনা নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও প্রশাসনের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে।
অধিদপ্তরের একটি অংশ মনে করছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কঠোর প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠরা দাবি করছেন, সব প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে এবং অভিযোগগুলো মূলত অসন্তুষ্ট গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া।
টেন্ডার ব্যবস্থাপনাও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ক্ষুরারোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট ভ্যাকসিন ক্রয় প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে—ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মাত্রা যথেষ্ট ছিল না। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—সব ক্রয় কার্যক্রম সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে এবং কোন ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই। তারা এটিকে “প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভুল ব্যাখ্যা” হিসেবে দেখছেন।
গত বছরের জাতীয় প্রাণিসম্পদ মেলা আয়োজন নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আয়োজনে ব্যয়ের মাত্রা, স্পন্সরশিপ ব্যবস্থাপনা এবং ভেন্যু নির্বাচন নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা গেছে। কিছু কর্মকর্তা মনে করছেন, মেলার আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে আয়োজকদের দাবি—এটি ছিল একটি জাতীয় পর্যায়ের সফল আয়োজন, যা দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এই পুরো পরিস্থিতির মধ্যে অধিদপ্তরের ভেতরে কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের সুযোগ কমে গেলে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা একটি অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠদের মতে, পরিবর্তনের সময় স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রতিরোধ তৈরি হয় এবং সেটিকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যু হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তারা মনে করেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দৃঢ়তা প্রয়োজন এবং সব সিদ্ধান্ত জনপ্রিয় নাও হতে পারে।
প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুধ, মাংস, ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি, খামারভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির গতিশীলতায় এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একটি অংশ মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে নিয়োগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একই সঙ্গে অনেকেই মনে করছেন, অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা থাকলে বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব—উভয়ের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন সম্ভব।
সব মিলিয়ে ডা. আবু সুফিয়ানকে কেন্দ্র করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেতরে যে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়—বরং বৃহত্তর প্রশাসনিক কাঠামো, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে। বিষয়টি কীভাবে সমাধানের দিকে এগোয়, সেটিই এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















