রমজান শুরুর আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। তবে গত কয়েক দিন ধরে তা তীব্র হয়ে উঠেছে। পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি মধ্যাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় জেলাগুলোতেও একই চিত্র। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে মানুষ এলপিজির দিকে ঝুঁকলেও সেখানে সরবরাহ ঘাটতি ও বাড়তি দাম পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় দেড় শতাধিক শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, প্লাস্টিক ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে কাজ বন্ধ থাকায় কয়েক লাখ শ্রমিকের জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। শিল্প মালিকরা জানান, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ব্যাংক ঋণ, বিদ্যুৎ বিল ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে লোকসান বাড়ছে প্রতিদিন।
আড়াইহাজারের হাজী আক্তার টেক্সটাইল অ্যান্ড প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সেলিম ভূঁইয়া বলেন, কারখানা বন্ধ থাকলেও ঈদ ও শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে বেশি খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে শতকরা ৫ শতাংশ মেশিন চালু রাখা হয়েছে।
মিথিলা গ্রুপের পরিচালক মাহবুব খান হিমেল বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। অনেক ক্রয় আদেশ নিতে পারছি না।
তিতাস গ্যাসের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভূলতা এলাকায় প্রায় ২০ ফুট গভীরে পাইপলাইনে লিকেজ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের হলেও রমজানে তা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অধিকাংশ বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলে না। নরসিংদী শহর এবং পলাশ ও শিবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ কার্যত শূন্য। এতে আবাসিক গ্রাহকরা রান্না করতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন। একই সঙ্গে টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। শিল্প মালিকদের অভিযোগ, বৈধ সংযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না, অথচ অবৈধ সংযোগের কারণে সিস্টেমে চাপ কমে যাচ্ছে।
নরসিংদী তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ ৫০ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তা শূন্য থেকে ২-৩ পিএসআইয়ে নেমে এসেছে। এ কারণে চুলা জ্বলছে না, শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায়ও একই অবস্থা। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলে না। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে সরকারি হাসপাতালগুলো। শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, রোগীদের সময়মতো খাবার দিতে গিয়ে আমাদের এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
গ্যাস কোম্পানিগুলোর ভাষ্য, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, এলএনজি আমদানি সীমিত থাকা এবং সিস্টেম লসের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে অবৈধ সংযোগ ও পুরোনো পাইপলাইন থাকায় সমস্যা বেড়েছে।
গ্যাসের বিকল্প এলপিজি
পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকরা বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। তবে হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলায় এলপিজির বাজারেও সংকট দেখা দিয়েছে। জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে একাধিক দোকানে সিলিন্ডার না থাকায় ক্রেতারা খালি হাতে ফিরছেন। কোথাও পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ।
বরগুনার আমতলীতে ৯টি কোম্পানির এলপিজি বিক্রি হলেও অধিকাংশ কোম্পানির সরবরাহ অনিয়মিত। অনেক এলাকায় সপ্তাহে একবারের বেশি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একটি সিলিন্ডার শেষ হলে নতুনটি পেতে দুই থেকে তিন দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
নোয়াখালী, ফেনী ও উপকূলীয় অন্যান্য জেলায় এলপিজির ওপর নির্ভরতা দাঁড়িয়েছে কয়েক গুণ। দিনের বেলায় গ্যাস না থাকায় পরিবারগুলো সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে মাসিক রান্নার ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ছোট খাবারের দোকানগুলোর বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিতে হচ্ছে।
নোয়াখালীর গৃহিণী ইয়াছমিন আক্তার বলেন, লাইনের গ্যাস নেই, আবার সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায়, যেখানে সরকার নির্ধারিত দাম এক হাজার ৩৫৬ টাকা। কিন্তু মাস শেষে গ্যাস বিল ঠিকই আসছে।
এলপিজি আমদানিকারক ওমেরা এলপিজির রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান শহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, পাইপলাইনের গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে এলপিজির ওপর চাপ আরও বাড়বে, যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। গ্যাস ও এলপিজি– দুই খাতেই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















