স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নতুন প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রজ্ঞাপন, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল হওয়া গুরুতর অভিযোগ—এই দুই বাস্তবতা একই সময়ে সামনে আসায় এলজিইডির শীর্ষ এই নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে। অভিযোগে বলা হয়েছে, জ্ঞাত আয়ের বাইরে শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জন, কাজ না করেই বিল উত্তোলন, অবৈধ পদায়ন ও বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বেলাল হোসেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মো. বেলাল হোসেন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন। সদ্য বিদায়ী প্রধান প্রকৌশলী কাজী গোলাম মোস্তফা অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বেলাল হোসেনকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি এর আগে এলজিইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (শিক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং প্রায় ছয় মাস এই রুটিন দায়িত্বে থাকবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক আগমুহূর্তে ও পরপরই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বেলাল হোসেন একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে এলজিইডিতে কর্মজীবন শুরু করেন। চাকরির শুরুতে তার আর্থিক অবস্থান সীমিত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি অস্বাভাবিকভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগকারী এলজিইডিরই একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও সুপারিশের সুযোগ নিয়ে বেলাল হোসেন একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সাবেক এক মন্ত্রীর নির্দেশে বেলাল হোসেন প্রায় ৪০টি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন না করেই শতভাগ বিল উত্তোলন করেন। প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে ওইসব কাজের ওপর পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং নতুন করে কাজ দেখানো হয়। এতে একই প্রকল্পে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এখনো ওই সময়ের বহু ব্রিজ ও কালভার্ট অসম্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালে বেলাল হোসেন নিয়োগ ও পদায়নে ব্যাপক অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক সুপারিশে প্রায় ১ হাজার ১২৫ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে পদভেদে ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বচ্ছতা ছিল না এবং যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ ও রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল প্রধান বিবেচ্য।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শুধু আউটসোর্সিং নিয়োগই নয়, পদোন্নতি ও পদায়নেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সার্ভেয়ারদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব, ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এমনকি কার্য সহকারীকেও উপসহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সারাদেশে প্রায় ৪১২ জনকে এভাবে অবৈধ পদোন্নতি দিয়ে ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এছাড়া বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বেলাল হোসেনের দায়িত্বকালে এলজিইডির মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ভয়াবহ রূপ নেয়। কাজ না করেই বিল উত্তোলন, নিম্নমানের কাজ, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এই পরিস্থিতির কারণে একপর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন বাধ্য হয়ে একাধিক জেলায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযোগে সম্পদ অর্জনের যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ আয়ের মাধ্যমে বেলাল হোসেন রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় ২ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। এছাড়া পূর্বাচলে ৫ কাঠার একটি প্লট, রংপুর জেলার ধাপ এলাকায় ৬ কাঠা জমির ওপর দুই ইউনিটের পাঁচতলা বাড়ি, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলায় প্রায় ২১০ বিঘা কৃষিজমি এবং রাজধানীর মিরপুর-২ এলাকায় ১ হাজার ৫০০ বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট তার মালিকানায় রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। অভিযোগকারী এসব সম্পদের বাজারমূল্য শত কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে এসব গুরুতর অভিযোগের মধ্যেই এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত সুনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই এমন দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ বিষয়ে বেলাল হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি বলে জানা গেছে। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার অবস্থান বা ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হয়নি।
এলজিইডি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, যা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, ব্রিজ, কালভার্টসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত। এই সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি জনগণের জীবনমান ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জড়িত। তাই সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থে গুরুত্ব বহন করে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছে প্রাপ্ত অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো তদন্তের অগ্রগতি বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সত্য উদঘাটিত হয় এবং দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
অন্যদিকে, প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, রুটিন দায়িত্ব হিসেবে প্রধান প্রকৌশলীর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং এটি স্থায়ী পদায়ন নয়। তবুও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করছেন অনেকেই। তাদের মতে, তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে রাখা যুক্তিযুক্ত কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না—এটি সত্য। তবে গুরুতর অভিযোগ থাকা অবস্থায় দায়িত্ব প্রদান করলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, এলজিইডির নতুন প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণ এক জটিল বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে সংস্থাটিকে। একদিকে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা, অন্যদিকে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ—এই দুইয়ের সমন্বয় কীভাবে হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে সেটি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















