সংবাদ শিরোনাম ::
দেবিদ্বারে ইয়াবা সেবনের দায়ে ৪ জনের কারাদণ্ড কাতারে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন ৫ বাংলাদেশি সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার দেশভাগ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য মোদির মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী তিস্তার স্রোতে ধসে গেল ১৪ লাখ টাকার বাঁশের পাইলিং, ঝুঁকিতে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু “চাঁপাইনবাবগঞ্জে টাস্কফোর্সের অভিযান: ওয়ারড্রব থেকে হেরোইন-ইয়াবা-গাঁজাসহ নারী মাদক কারবারি আটক অনিয়মের বেড়াজালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: মন্ত্রী-সচিবের নির্দেশেও ঘুষ ছাড়া নড়ে না ফাইল স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে দুই বছর লাগবে: অর্থমন্ত্রী

গাজায় নতুন বছর শুরু হলো টিকে থাকার লড়াই দিয়ে

ছবি- সংগৃহীত

সাদা প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছাদের নিচে, কাপড়ের চাদর দিয়ে তৈরি একটি তাঁবু। ভেতরে মেয়েদের নিয়ে একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর চেষ্টা করছিলেন সানা ইসা।

গাজায় কাগজে কলমে অস্ত্রবিরতি চলছে। নতুন বছরও শুরু হয়েছে। কিন্তু ভেজা কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা সানার কাছে আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন কোনো উপলক্ষ্য নেই।

‘বুঝতে পারছি না কাকে দোষ দেব। যুদ্ধ, শীত নাকি ক্ষুধাকে। এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটি সামনে আসছে।’ গাজা উপত্যকায় নিজের মতো বাস্তুচ্যুতদের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে এ কথাগুলো বলছিলেন সানা। তাঁর মতো হাজারো ফিলিস্তিনির ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন যেন আটা, পানি সংগ্রহের লড়াই আর অবিরাম বোমাবর্ষণের মাঝে টিকা থাকার চেষ্টার সঙ্গে মিশে গেছে।

৪১ বছর বয়সী সানা ইসা একাই সাত সন্তানের দেখভাল করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলে হামলায় তাঁর স্বামী নিহত হন। সানা বলেন, সন্তানদের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি, খাবার-পানির ব্যবস্থা, একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত- সবকিছুই একসঙ্গে তাঁর কাঁধে গিয়ে পড়ে। পরিবারসহ এক সময় মধ্য গাজার আল-বুরেইজ থেকে দেইর এল-বালাহ’তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল প্রতিদিন পরিবারের জন্য ‘এক টুকরো রুটি’ জোগাড় করা এবং অন্তত এক কেজি আটা হাতে পাওয়া। ‘দুর্ভিক্ষের সময় আমি ঘুমাতে যেতাম আর ঘুম থেকে ওঠার পর একটাই কামনা করতাম- অন্তত সেদিন যেন পর্যাপ্ত রুটি জোটে। আমার সন্তানরা চোখের সামনে অনাহারে কাতরাতো, আর আমি কিছুই করতে পারতাম না। মনে হতো, আমিই যেন ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি।’ -বলছিলেন সানা ইসা।

শেষ পর্যন্ত আটা খোঁজার তাগিদেই সানা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সানা বলেন, ‘শুরুতে ভয় আর দ্বিধা কাজ করতো। কিন্তু যে ক্ষুধার ভেতর আমরা বেঁচে আছি, তা মানুষকে এমন কাজ করতে বাধ্য করে, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনে চালু হওয়া এসব ত্রাণ কেন্দ্র ছিল বেশ বিপজ্জনক। জাতিসংঘের হিসাবে, গত নভেম্বরের আগ পর্যন্ত জিএইচএফ কেন্দ্রের ভেতরে ও আশপাশে ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম শেষ করে নভেম্বর মাসে।

জিএইচএফ- এর কেন্দ্রে যাওয়াটা সানার কাছে কেবল জীবনের ঝুঁকি ছিল না। এটি ছিল এমন এক পথ, যা তাঁর মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। একবার মধ্য গাজার নেতজারিম ত্রাণকেন্দ্রে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকাকালে সানার হাতে শ্রাপনেলের (বোমা বা বুলেটের ছোট ধাতব টুকরো) আঘাত লাগে। আর রাফাহর পূর্বে মোরাগ কেন্দ্রে শ্রাপনেল আঘাত করে তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়ের বুকে। এসব আঘাত সত্ত্বেও ক্ষুধার যন্ত্রণায় তিনি বারবার ত্রাণ নিতে গেছেন।

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। সানা বলেন, দুই বছরই যথেষ্ট। প্রতি বছর আগের বছরের চেয়েও কঠিন হয়েছে। মানুষ এখনো এই দুর্বিষহ চক্রে আটকে আছে। তারা শীতে আশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত তাঁবু চায়। কাঠ পুড়িয়ে রান্নার বদলে একটি গ্যাস সিলিন্ডার চায়। বড় কোনো প্রত্যাশা নয়, টিকে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোই এখন মানুষের স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দেবিদ্বারে ইয়াবা সেবনের দায়ে ৪ জনের কারাদণ্ড

গাজায় নতুন বছর শুরু হলো টিকে থাকার লড়াই দিয়ে

আপডেট সময় ০৭:৩৩:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

সাদা প্লাস্টিকের ত্রিপল দিয়ে ঢাকা ছাদের নিচে, কাপড়ের চাদর দিয়ে তৈরি একটি তাঁবু। ভেতরে মেয়েদের নিয়ে একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর চেষ্টা করছিলেন সানা ইসা।

গাজায় কাগজে কলমে অস্ত্রবিরতি চলছে। নতুন বছরও শুরু হয়েছে। কিন্তু ভেজা কম্বলের ওপর শুয়ে থাকা সানার কাছে আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন কোনো উপলক্ষ্য নেই।

‘বুঝতে পারছি না কাকে দোষ দেব। যুদ্ধ, শীত নাকি ক্ষুধাকে। এক সংকট কাটতে না কাটতেই আরেকটি সামনে আসছে।’ গাজা উপত্যকায় নিজের মতো বাস্তুচ্যুতদের অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে এ কথাগুলো বলছিলেন সানা। তাঁর মতো হাজারো ফিলিস্তিনির ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন যেন আটা, পানি সংগ্রহের লড়াই আর অবিরাম বোমাবর্ষণের মাঝে টিকা থাকার চেষ্টার সঙ্গে মিশে গেছে।

৪১ বছর বয়সী সানা ইসা একাই সাত সন্তানের দেখভাল করেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলে হামলায় তাঁর স্বামী নিহত হন। সানা বলেন, সন্তানদের দায়িত্ব, বাস্তুচ্যুতি, খাবার-পানির ব্যবস্থা, একের পর এক কঠিন সিদ্ধান্ত- সবকিছুই একসঙ্গে তাঁর কাঁধে গিয়ে পড়ে। পরিবারসহ এক সময় মধ্য গাজার আল-বুরেইজ থেকে দেইর এল-বালাহ’তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

২০২৫ সালে সানার সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল প্রতিদিন পরিবারের জন্য ‘এক টুকরো রুটি’ জোগাড় করা এবং অন্তত এক কেজি আটা হাতে পাওয়া। ‘দুর্ভিক্ষের সময় আমি ঘুমাতে যেতাম আর ঘুম থেকে ওঠার পর একটাই কামনা করতাম- অন্তত সেদিন যেন পর্যাপ্ত রুটি জোটে। আমার সন্তানরা চোখের সামনে অনাহারে কাতরাতো, আর আমি কিছুই করতে পারতাম না। মনে হতো, আমিই যেন ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি।’ -বলছিলেন সানা ইসা।

শেষ পর্যন্ত আটা খোঁজার তাগিদেই সানা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সানা বলেন, ‘শুরুতে ভয় আর দ্বিধা কাজ করতো। কিন্তু যে ক্ষুধার ভেতর আমরা বেঁচে আছি, তা মানুষকে এমন কাজ করতে বাধ্য করে, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমর্থনে চালু হওয়া এসব ত্রাণ কেন্দ্র ছিল বেশ বিপজ্জনক। জাতিসংঘের হিসাবে, গত নভেম্বরের আগ পর্যন্ত জিএইচএফ কেন্দ্রের ভেতরে ও আশপাশে ২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। সংস্থাটি তাদের কার্যক্রম শেষ করে নভেম্বর মাসে।

জিএইচএফ- এর কেন্দ্রে যাওয়াটা সানার কাছে কেবল জীবনের ঝুঁকি ছিল না। এটি ছিল এমন এক পথ, যা তাঁর মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। একবার মধ্য গাজার নেতজারিম ত্রাণকেন্দ্রে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকাকালে সানার হাতে শ্রাপনেলের (বোমা বা বুলেটের ছোট ধাতব টুকরো) আঘাত লাগে। আর রাফাহর পূর্বে মোরাগ কেন্দ্রে শ্রাপনেল আঘাত করে তাঁর ১৭ বছর বয়সী মেয়ের বুকে। এসব আঘাত সত্ত্বেও ক্ষুধার যন্ত্রণায় তিনি বারবার ত্রাণ নিতে গেছেন।

গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। সানা বলেন, দুই বছরই যথেষ্ট। প্রতি বছর আগের বছরের চেয়েও কঠিন হয়েছে। মানুষ এখনো এই দুর্বিষহ চক্রে আটকে আছে। তারা শীতে আশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত তাঁবু চায়। কাঠ পুড়িয়ে রান্নার বদলে একটি গ্যাস সিলিন্ডার চায়। বড় কোনো প্রত্যাশা নয়, টিকে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণগুলোই এখন মানুষের স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।