ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি—ডেসকোতে সাম্প্রতিক সিওএসএস টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে যে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল হকের নাম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, ডেসকোর একাধিক কর্মকর্তা, এমনকি সরকারি ক্রয়বিধি বিশেষজ্ঞরা তাকে এ ঘটনার প্রধান নিয়ন্ত্রক, সিদ্ধান্ত প্রণেতা এবং টেন্ডারের ফল পূর্বনির্ধারণকারী ব্যক্তি হিসেবে অভিযুক্ত করছেন। অভিযোগকারীরা বলছেন, সিওএসএস টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি-২ (টিইসি-২)-এর ওপর প্রধান প্রকৌশলীর ‘অস্বাভাবিক প্রভাব’ ও ‘চাপ’ ছাড়া এত বড় ধরনের বৈষম্যমূলক মূল্যায়ন সম্ভবই নয়। পুরো প্রক্রিয়া ছিল নির্দেশিত, নিয়ন্ত্রিত এবং বিশেষ কিছু ঠিকাদারি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রভাবান্বিত।
অভিযোগকারীদের ভাষায়, “টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটি নামেই কমিটি; সিদ্ধান্ত আসলে নিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল হক।” তারা দাবি করেন, তিনি সরাসরি নির্দেশ দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপনসিভ’ করা হবে আর কোনটিকে বাতিল করা হবে—সেই চূড়ান্ত তালিকা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন। টিইসি-২ুএর সদস্যরা নাকি শুধু সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে ডেসকোর মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ব্যবস্থা ক্ষমতাবান ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে—যা সরাসরি সরকারি ক্রয়নীতির পরিপন্থী। কারণ সরকারি টেন্ডার মূল্যায়নে স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক, আর কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারেন না।
টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা হলো মনোয়ারা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজনীয় সব নথি, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা জমা দিয়েছিল বলে দাবি করেছে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা বা স্পষ্টীকরণ না চেয়েই সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হয়। অথচ সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণার আগে ব্যাখ্যা চাওয়াই বাধ্যতামূলক।
মনোয়ারা কনস্ট্রাকশনের মালিকরা অভিযোগ করেন—“আমাদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ এসেছে উপর থেকে, টেন্ডার কমিটি শুধু স্ক্রিনে সই করেছে। প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী।”
ডেসকোর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “টেন্ডার মূল্যায়নে মনজুরুল হক নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কোন নথি গুরুত্ব পাবে আর কোন ভুলকে বড় ইস্যু করা হবে—এসব তার নির্দেশেই হয়েছে। এমনকি টেকনিক্যাল স্কোরিংয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন।”
আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, “ক্রয় পর্যালোচনা কমিটি (পিআরসি) কিছু নথি পুনরায় যাচাই, কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং কিছু অস্পষ্টতা দূর করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু টিইসি-২ সেই সুপারিশগুলোই প্রতিবেদন থেকে বাদ দিয়েছে। কেন বাদ দিল? কার নির্দেশে বাদ দিল? এর জবাব শুধু প্রধান প্রকৌশলীই দিতে পারবেন।”
অভিযোগ অনুসারে, টেন্ডারে অংশ নেওয়া ৪৩ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ২৫টি প্রতিষ্ঠান চার-পাঁচটি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। এই গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে ডেসকোর বড় প্রকল্পগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই সিন্ডিকেটুনির্ভর স্থাপনা মনজুরুল হকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
মনোয়ারা কনস্ট্রাকশনকে কেন বাতিল করা হলো—এর উত্তরে ঠিকাদারি মালিকরা দাবি করেন, “আমরা সিন্ডিকেটের অংশ নই। তাই আগেই সিদ্ধান্ত ছিল আমাদের বাদ দেওয়ার। টেন্ডারের আগে থেকেই গোষ্ঠীগুলো জানত কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাবে।”
একজন সরকারি ক্রয়নীতি বিশেষজ্ঞ বলেন, “অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সারা টেন্ডার প্রক্রিয়াই একটি কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সেটি আর সরকারি প্রক্রিয়া থাকে না। তা হয়ে যায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ছায়া-প্রশাসন।” তিনি আরও বলেন, “ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্পূর্ণ থাকবে।”
জ্বালানি খাত বিশ্লেষক ড. সাইফুল আলম বলেন, “সিওএসএস টেন্ডার বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে যদি কোনো একক কর্মকর্তা টেকনিক্যাল মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে এটি ভয়াবহ সংকেত। কারণ এটি সেবার মান, ব্যয় এবং প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।”
টেন্ডার বাতিল হওয়া প্রতিষ্ঠানের একজন প্রতিনিধি জানান, “আমাদের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা চাওয়া হয়নি। হঠাৎই দেখি আমাদের বিড বাতিল। আমরা পরে জানতে পারলাম, প্রধান প্রকৌশলী নাকি আগেই বলে দিয়েছেন আমাদের রাখা যাবে না। সেটাই বাস্তবায়ন করেছে মূল্যায়ন কমিটি।”
ডেসকোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র বলছে, সিওএসএস টেন্ডারে প্রথম থেকেই ‘পছন্দের প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের’ একটি অদৃশ্য তালিকা ছিল। কোন প্রতিষ্ঠান টেন্ডার পাবে, কোন প্রতিষ্ঠান টেকনিক্যাল মূল্যায়নে বাদ পড়বে—এ সবই নাকি আগেই নির্ধারিত ছিল। আর এই অদৃশ্য তালিকার নির্মাতা হিসেবে মনজুরুল হকের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।
কিছু কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেন, প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল হক নিয়মিতই টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন, যদিও কমিটির অভ্যন্তরীণ কাজের ওপর তার প্রভাব রাখতে কথা নয়। “অনেক সিদ্ধান্ত তিনি বৈঠক চলাকালেই ‘পরামর্শ’ বা ‘নির্দেশনা’ হিসেবে দিয়েছেন”—বলেন এক কর্মকর্তা।
সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারি মালিকদের ভাষায়, “যে চার-পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বেশি, তারাই টেন্ডার পাচ্ছে। আর যারা এই গোষ্ঠীর বাইরে আছে, তারা কতই যোগ্য হোক—বাতিল হচ্ছে।” তারা দাবি করেছেন, প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক আছে, যা সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
সরকারি ক্রয়বিধিতে রয়েছে, কোনো কর্মকর্তার স্বার্থসংঘাত থাকলে তিনি টেন্ডার মূল্যায়ন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন। কিন্তু অভিযোগকারী ঠিকাদারি মালিকরা বলছেন, “এখানে প্রধান প্রকৌশলী উল্টো সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন।”
ডেসকোর একজন কর্মকর্তা বলেন, “যদি তদন্ত হয়, অনেক নথি, বৈঠকের অডিও রেকর্ড, ইমেইল—এসব বেরিয়ে আসবে। তখন বোঝা যাবে কারা টেন্ডার প্রভাবিত করেছে।”
দুদক কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, “টেন্ডারে অনেক প্রতিষ্ঠান অযোগ্য হওয়ার মতো বড় ভুল করেছে। কিন্তু তারা যেহেতু গোষ্ঠীর সদস্য, তাই চোখ বুঁজে তাদের গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।”
ডেসকোর অভ্যন্তরে এই টেন্ডার নিয়ে এখনই ব্যাপক চাপা উত্তেজনা রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত শুরু হলে অনেক অনিয়ম বের হয়ে আসবে। তাদের মতে, “প্রধান প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই পুরো নাটক পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলীর ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তা অভিযোগগুলোকে ‘মিথ্যে’, ‘অতিরঞ্জিত’ এবং ‘টেন্ডারে পরাজিত পক্ষের রাজনৈতিক চাপ’ বলে দাবি করছেন। তবে তারা কেউই নথি, তথ্য বা যুক্তি দিয়ে অভিযোগগুলো খণ্ডন করতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেসকোর মতো প্রতিষ্ঠানে একটি টেন্ডারের সিদ্ধান্ত যদি কোনো একক কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে, তবে এটি পুরো ক্রয়ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা। কিন্তু এখানে উল্টো অভিযোগ উঠে এসেছে—অস্বচ্ছতা, পক্ষপাতিত্ব এবং প্রভাব খাটানোর।
দুদকে অভিযোগ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা বলছেন—“আমরা চাই না কেউ শাস্তি পাক, আমরা শুধু চাই ন্যায় বিচার। যদি আমরা অযোগ্য হই, তা নথি দিয়ে প্রমাণ করুন। কিন্তু ব্যাখ্যা না চেয়ে বাতিল করা—এটা অন্যায়।”
তারা আরও বলেন—“দুদক বা বিদ্যুৎ বিভাগ যদি স্বাধীন তদন্ত করে, আমরা সকল নথি দেব। কারণ আমরা জানি, আমরা সঠিক পথে ছিলাম।”
ডেসকোর অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, এ ঘটনা পুনরায় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা কমিয়ে দেবে। তারা মনে করেন, এখনই যদি শক্ত তদন্ত না হয়, ভবিষ্যতের টেন্ডারগুলো আরও বেশি প্রভাবান্বিত হবে।
তারা বলেন, “ডেসকোতে সিন্ডিকেট আছে—এটা খোলামেলা গোপন বিষয়। কিন্তু এবার সিন্ডিকেটের ক্ষমতা এতটা বাড়বে, তা কেউ ভাবেনি। এই সিন্ডিকেটের ভরসা প্রধান প্রকৌশলীর মতো পদে বসা কর্মকর্তাদের ওপর।”
টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে এই ভয়াবহ অভিযোগের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদন্ত চলবে কিনা—এ বিষয়ে ডেসকো কর্তৃপক্ষ এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, “অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। এগুলো যাচাই না করলে ভবিষ্যতে ডেসকোর সুনাম, সেবা ও প্রশাসনিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তিনি আরও বলেন—“প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল হক যদি সত্যিই টেন্ডার প্রভাবিত করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক শাস্তিতে শেষ হওয়ার মতো নয়। এটি সরাসরি দুর্নীতির আওতায় পড়ে।”
অভিযোগকারীরা বলছেন, “তদন্ত হলে মনজুরুল হকের ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে যাবে। আমরা শুধু চাই একটি নিরপেক্ষ তদন্ত।”
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একই—ডেসকো কি সত্যিই একজন কর্মকর্তার হাতে নিয়ন্ত্রিত? সিওএসএস টেন্ডার কি পূর্বনির্ধারিত ছিল? সিন্ডিকেট কি সত্যিই প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রধান প্রকৌশলী মনজুরুল হক কি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অপ্রত্যাশিত প্রভাব বিস্তার করেছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ঘিরে এমন অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া আস্থা ফিরবে না—এমনটাই বলছে সংশ্লিষ্টরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















