দরিদ্র কৃষকদের জমি দখল করে প্রায় একশ বিঘার কৃষি খামার তৈরি করেছেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন। তার হাত থেকে রক্ষা পায়নি দুটি বিলের খাসজমিও। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিলন যশোর সদরের কাশিমপুর ইউনিয়নের রাহেলাপুর গ্রামে গড়ে তোলেন বিশাল এই কৃষি খামার। ওই এলাকায় বর্তমানে রাস্তার ধারের জমি বিঘাপ্রতি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা এবং বিলের জমি ১০ লাখের মতো দাম বলে স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন। এছাড়া বিগত সরকারের আমলে ২০১৬ ও ২০২১ সালে ইউপি চেয়ারম্যান মনোনয়ন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি থাকাকালে শিক্ষক নিয়োগে বিপুল পরিমাণ অর্থ উৎকোচ নিয়ে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগেরই এক নেতা বলেছেন, যশোরে দুর্নীতির এক নম্বরে ছিলেন শহিদুল ইসলাম মিলন। বর্তমানে হত্যা-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন মামলায় মিলন কারাগারে রয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, মায়ের সম্পত্তির অংশ হিসাবে মিলন ১১ বিঘা জমি পান রাহেলাপুরে। পরে ধীরে ধীরে মানুষের জমি দখল, অল্প দামে ক্রয় করে টাকা না দেওয়া, ফার্মের ভেতরে থাকা অন্যের জমি অদলবদলের কথা বলে দখল, সরকারি খাসজমি (দুটি বিলের ৪০ বিঘার মতো) দখল করে মাটি ফেলে ভরাট করে বানিয়েছেন কৃষি ফার্মটি। সেখানে রয়েছে ছোট-বড় মিলে ১০টি পুকুর। আছে বিশাল আমবাগান। মূলত যশোর সদরের নওয়াপড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে শুরু হয় তার এই কার্যক্রম। বর্তমানে কারাগারে থাকার কারণে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য জানা যায়নি।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর প্রতারণার শিকার মানুষগুলো ধীরে ধীরে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। জানিয়েছেন কীভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের ফসলি জমি।
স্থানীয়দের যত অভিযোগ : যশোর সদরের পাঁচবাড়িয়া কাছারিপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে আমার ২৬ শতক জমি আওয়ামী লীগ নেতা মিলন অদলবদলের কথা বলে দখলে নেন। ওই জমির পরিবর্তে আমাকে তিন মাসের মধ্যে যে জমি লিখে দিতে চেয়েছিলেন, তা আর দেননি। তখন প্রাপ্য জমির ধান হিসাবে টাকা দিতেন বছরে দুইবার। বিঘাপ্রতি ৬ মন। ঠিক একইভাবে দখল করে নেন তারই প্রতিবেশী সম্পর্কে ভাগিনা মইদুল-মিথুনদের দেড় বিঘা জমি।
আব্দুল কাদের জানান, মিলনের ফার্মে প্রবেশের মুখে যে রাইস মিল করা হয়েছে, সেখানেই ছিল তার জমি। আর ভাগিনাদের জমি ছিল ভেতরে বড়পুকুরের মধ্যে (যা তিনি খনন করে মাছ চাষ করে থাকেন)। বর্তমান ফার্মের ভেতরে ৭৬ শতক আবাদের জমি ছিল কাশিমপুর দফাদারপাড়ার বাসিন্দা আজিজুল দফাদারের ছেলে শরিফুল ইসলামদের। তারা চার ভাই। ২০১৯ সালের দিকে শহিদুল ইসলাম মিলন মুখে মুখে সেই জমি অদলবদল করে নেন। এর পরিবর্তে পাশের নিচু জমি দেন তাদের। জমি নেওয়ার পরপরই সেখানে পুকুর কাটেন।
শরিফুল ইসলাম জানান, তাদের প্রতিবেশী ইমরান নামে এক ছেলেকে সরকারি চাকরি দিয়ে দেন মিলন। তার বদলে নগদ টাকা ও জমি মিলিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। স্থানীয়রা জানান, ওই এলাকায় কালীদার বিল ও বৌদার বিল নামে খাস খতিয়ানের দুটি বিলের জমি দখল করেছেন মিলন। ফার্মের ভেতরে ১১টি পুকুর কেটে সেই মাটি দিয়ে ভরাট করেন বিল দুটি। এর মধ্যে কালীদার বিলের ২০ কাঠা জমির ১০ কাঠা তিনি কিনে নেন রাহেলাপুরের আবুল হোসেনের কাছ থেকে। কিন্তু দখলে নিয়েছেন গোটা জমিটাই। এছাড়া পুকুরের মাটি দিয়ে ভরাট করে আরও চার বিঘার মতো খাসজমি নিজ দখলে নিয়েছেন।
অপরদিকে, বৌদার বিলের ৪০ বিঘার মতো খাসজমি দখলে রেখে ফার্ম করেছেন। সবমিলিয়ে ওই ফার্মে তার একশ বিঘার মতো জমি রয়েছে বলে সূত্র জানায়। জানতে চাইলে ফার্ম দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আক্তারুজ্জামান বলেন, ফার্মে জমির পরিমাণ ৭০-৭৫ বিঘা। ৮টি পুকুর রয়েছে, যেখানে মাছ চাষ করা হয়। এছাড়া একটি গরুর ফার্ম, যেখানে বর্তমানে ১১টি গরু রয়েছে। একটি রাইস মিল, ধানি জমি আর আমবাগান রয়েছে। ওই ফার্মে তিনিসহ তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনের দখলবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন নেতা এই প্রতিনিধিকে বলেছেন, বিগত সময়কালে বিভিন্নভাবে যারা নিজেদের পকেট ভারী করেছেন, যশোরে দলীয় প্রধান হিসাবে মিলনের নাম আসবে এক নম্বরে। তার বিরুদ্ধে হামলা, লুটপাট ও দখলের অভিযোগে মামলা রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর গা ঢাকা দেন মিলন ও তার ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সামির ইসলাম পিয়াস। ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর রাতে ডিএমপি পুলিশ রাজধানীর গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া এলাকা থেকে শহিদুল ইসলাম মিলনকে আটক করে। পরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি, মালামাল লুট ও প্রাণনাশের ঘটনাসহ কয়েকটি মামলায় তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি যশোরে কয়েকটি মামলা নিষ্পত্তির জন্য পুলিশের একটি টিম মিলনকে ঢাকা থেকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যান।
২০২৪ সালের ২২ জুন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পদক, নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি মরহুম অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান মুকুলের করা চাঁদাবাজি মামলা এবং ঘর ভাঙচুরসহ টাকা লুট, অস্ত্র প্রদর্শন, জীবননাশের হুমকি প্রদানসহ কয়েকটি মামলায় মিলনকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর থেকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরিন রয়েছেন। নেতৃত্বে পরিবার : শহিদুল ইসলাম মিলন ২০১৫ সালে দলের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে যশোর জেলার সভাপতি ও শাহীন চাকলাদার সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। পরে ২০২১ সালে ১৯ জন উপদেষ্টাসহ ৯৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। ওই কমিটির সহসভাপতি হিসাবে স্থান পান শহিদুল ইসলাম মিলনের শ্যালক এসএম হুমায়ুন কবীর কবু, শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক ভায়রা ভাই শেখ আতিকুর রহমান বাবু এবং সদস্য হন তার ছেলে সামির ইসলাম পিয়াস।
যশোর জেলা প্রতিনিধি 



















