ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-র নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রকৌশলী বি. এম. মিজানুল হাসানকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও, এই নিয়োগে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রকৌশলী মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
একাধিক প্রকৌশলী ও ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন—লিখিত, মৌখিক এবং সক্ষমতা মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা একজনকে শীর্ষ পদের জন্য সুপারিশ করা এবং শেষ পর্যন্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বোর্ড সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে। শুধু তাই নয়—মন্ত্রণালয়ের স্মারকে যেই ‘৩৮৭তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সভার নথিতে এমন কোনো একক সুপারিশের প্রমাণ নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে দুই পক্ষ-সরকারি প্রশাসন ও বিদ্যুৎ খাতের প্রকৌশলী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ, সন্দেহ ও সমালোচনার সুর দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-১ শাখা থেকে স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০৮৮.১১.০০৫.২৪৪৭৩ জারি করে জানানো হয়—ডিপিডিসির এমডি পদে প্রকৌশলী বি. এম. মিজানুল হাসানকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলো। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়—৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৩৮৭তম বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন বোর্ড সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন:
“বোর্ড সভায় তিনজন প্রার্থীকে নিয়ে সুপারিশ হয়েছিল। কিন্তু এককভাবে মিজানুল হাসানকে সুপারিশ করা হয়নি। প্রজ্ঞাপনে যা বলা হয়েছে, তা বোর্ড সভার বাস্তব সিদ্ধান্ত নয়।” যদি এই বক্তব্য সত্য হয়—তাহলে মন্ত্রণালয় কার্যবিবরণী পরিবর্তন করেছে কি না, সেই সন্দেহ স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। এটি হলে তা প্রশাসনিক সত্য গোপন, যা ফৌজদারি অপরাধ।
মেধার লড়াই: কে প্রথম, কে দ্বিতীয়, কে তৃতীয়?
এমডি পদের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং সক্ষমতা যাচাইয়ে যেসব প্রার্থী ছিলেন:
১. প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদ (১ম) বিদেশি অভিজ্ঞতার সনদ নিয়ে বিতর্ক ২. মো. শরিফুল ইসলাম (২য়) দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ৩. প্রকৌশলী বি. এম. মিজানুল হাসান (৩য়) বিতরণ খাতে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সীমিত
প্রকৌশলী সাব্বির আহমেদের সনদে যে বিদেশি কোম্পানির কাজের অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে—সেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ উঠে। সেই কারণে “অভিজ্ঞতা খাতে অসঙ্গতি” দেখিয়ে তাঁর মূল্যায়ন বাতিল করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে তাহলে দ্বিতীয় প্রার্থী কি দোষে বাদ? বোর্ড সদস্যদের দাবি—দ্বিতীয় প্রার্থীকে উপেক্ষা করে তৃতীয় প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার কোনো লিখিত যুক্তি নেই। অর্থাৎ প্রশাসনিকভাবে একে “মেধা বাছাই প্রক্রিয়া ভঙ্গ” বলে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
প্রকৌশলীদের অভিযোগ ডিপিডিসি এবং বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক প্রকৌশলী ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)ুএ লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তারা লিখেছেন:“এই সিদ্ধান্ত সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমান সুযোগের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।”একজন প্রবীণ প্রকৌশলীর ভাষ্যমতে “যেখানে পরীক্ষায় তৃতীয় হওয়া ব্যক্তি এমডি হন—সেখানে আর মেধাব্যবস্থার অস্তিত্ব কোথায় থাকবে?”
ডিপিডিসির প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ প্রভাবশালী বলয়ের অস্তিত্বের কথা বলা হয়। জনপ্রিয়ভাবে তা ‘বিপু বলয়’ নামে পরিচিত। সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সময় থেকে এই বলয়ের অবস্থান শক্তিশালী হয়। ডিপিডিসির তিন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক—ইঞ্জিনিয়ারিং, অপারেশন, ও ফাইন্যান্স—সবাই একই বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। নতুন এমডি নিয়োগে এই বলয় আবার সক্রিয় হয়েছে—এমন দাবি ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তা সরাসরি তুলেছেন। এক কর্মকর্তা বলেন “এটি সাধারণ নিয়োগ নয়—এটি বলয়ের ক্ষমতার পুনর্বাসন।”
মাত্র কয়েক মাস আগেই বিদ্যুৎ বিভাগ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-র সদস্য নিয়োগে বিতর্কে পড়ে। সেখানে গিয়াস উদ্দিন জোয়ারদারকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে একদিনের মধ্যেই জনসমালোচনার চাপে বাতিল করতে হয়েছিল। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবার দেখা যাচ্ছে। যোগ্যতার তুলনায় নিম্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য স্পষ্ট, লিখিত, যৌক্তিক কারণ থাকা বাধ্যতামূলক। এই কারণ জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য। তা না হলে সিদ্ধান্তটি “অবৈধ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে গণ্য হতে পারে। একজন সাবেক নির্বাহী পরিচালক বলেন: “এটি শুধু স্বচ্ছতার অভাব নয়, বরং প্রশাসনিক ন্যায্যতার প্রতি অশ্রদ্ধা।” বিদ্যুৎ বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির এ বিষয়ে বলেন – “সকল অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। সত্য-মিথ্যা বিবেচনা করেই আমরা সিদ্ধান্ত নিই।” তাঁর বক্তব্য অভিযোগ অস্বীকার করে না, বরং একটি পরীক্ষা বা যাচাই প্রক্রিয়া চলছে—এমন ইঙ্গিত দেয়।
২০২৪ সালের মেধা আন্দোলনে তরুণেরা যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি ও সুযোগ দাবি করেছিলেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সেই আন্দোলনের নীতিমূলক মূল্যবোধের সাথেই সাংঘর্ষিক। একজন তরুণ প্রকৌশলীর বক্তব্য বলেন “কাগজ-কলমে পরীক্ষা নিলেও সিদ্ধান্ত যদি আগে থেকেই ঠিক থাকে—তাহলে পরীক্ষা কেন?”
এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো তদন্তাধীন, আলোচ্য এবং বিতর্কিত। অভিযোগ সত্য হলে-এটি হবে মেধা ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধাক্কা। অভিযোগ মিথ্যা হলে—মন্ত্রণালয় পরিষ্কার প্রমাণসহ গণমাধ্যমে ব্যাখ্যা দিতে পারে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















