ঢাকা ০২:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিত্যক্ত খনিতে ঢুকে ১৪ জনের মৃত্যু আউটসোর্সিং ঠিকাদার প্রথা বাতিল না হলে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হবে না: শিমুল বিশ্বাস মির্জাপুরে নবাগত ইউএনও হিসেবে জহিরুল আলমের যোগদান ৩ জন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে পবিপ্রবি’র রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য মনোনয়ন দিলেন চ্যান্সেলর আদিতমারীতে সার আইন লঙ্ঘনে ২ ব্যবসায়ীকে জরিমানা ৫ মাদরাসায় শতভাগ ফেল করায় সিসিটিভিকে দায়ী করলেন অধ্যক্ষ কম্ব্যাট পাইলট হয়ে দেশ ও জাতির সেবা করতে চায় জুয়ারিয়া ১৮ আগস্ট থেকে কুমিল্লায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান, ‘কাউকে ছাড় নয়’ ধামরাইয়ে রাইস মিল ও ৩ মিষ্টির দোকানকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা
২৪ লাখ টাকার পোশাকের হদিস নেই

রামেকে পোশাক কেলেঙ্কারির হোতা সচিব তৌহিদুল ইসলাম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজে (রামেক) ১৬-২০ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত দাপ্তরিক পোশাকসামগ্রীর নামে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থলুটের মহোৎসব। দুই অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৯ টাকার পোশাকসামগ্রীর কোনো হদিস মিলছে না। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এই পোশাকসামগ্রী ক্রয় ও বিতরণের দায়ভার রামেক সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম-এর ওপরই বর্তায়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে বিল দেখিয়ে সব পোশাক বিতরণ দেখালেও বাস্তবে কোনো কর্মচারীই সেই পোশাক পাননি।

কাগজে পোশাক, বাস্তবে নেই কিছুই
রামেক সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিন প্রতিষ্ঠান—ডিসেন্ট টেইলার্স, নয়ন ট্রেডার্স ও নূর ট্রেডিং কোম্পানিুএর মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পোশাক কেনা হয়। তবে পোশাক সরবরাহ ও বিতরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, কেবল নামমাত্র কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো পোশাক হাতে পাননি। তবুও তাদের কাছ থেকে সই নেওয়া হয়েছে, যেন তারা পোশাক গ্রহণ করেছেন। অফিস পরিদর্শনে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কোনো কর্মচারীই দাপ্তরিক পোশাক পরিধান করছেন না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যা স্পষ্ট লঙ্ঘন।

দোষ চাপানোর চেষ্টা, দায় এড়াতে ব্যস্ত সচিব
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে রামেক সচিব তৌহিদুল ইসলাম দাবি করেন, “আমরা পোশাক বিতরণ করেছি, আমাদের কাছে তাদের সই আছে।”
তবে তিনি কোনো বিতরণের ছবি বা রসিদ দেখাতে পারেননি। যখন কর্মচারীরা অভিযোগ করেন যে তারা কোনো পোশাক পাননি, তখন সচিবের জবাব—“যে পায়নি, তাকে আমার কাছে ধরে আনেন।” এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, তিনি অনিয়ম ঢাকতে কর্মচারীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বিতরণ প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সরকারি অর্থ ছাড় এবং বিল অনুমোদন করায় প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে সচিবের তত্ত্বাবধানে এই বিপুল অঙ্কের সরকারি টাকা বিল হিসেবে উত্তোলন করা হলো।

স্টোরকিপারের ফাইলে অনিয়মের ছড়াছড়ি
স্টোরকিপার ফয়সাল হায়দারের নথিতে দেখা যায়, কিছু কর্মচারীর নামে একাধিক সাফারি সেট দেখানো হয়েছে—যেখানে নিয়ম অনুযায়ী একজন মাত্র একটি সেট পাওয়ার কথা। একজন গাড়িচালকের নামে তিনটি সাফারি সেট দেখানো হয়েছে, যা সরকারি নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তদন্তে আরও জানা গেছে, বিল প্রদানের সময় সচিব তৌহিদুল ইসলাম নিজেই ওইসব কাগজে অনুমোদন দিয়েছেন।

ঠিকাদাররাও জানেন না ‘কী সরবরাহ করেছেন’
পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বক্তব্যেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে।
নূর ট্রেডিং-এর মালিক হুমায়ুন ফরিদ বলেন, “আমরা মালামাল দিয়েছি, তবে কী দিয়েছি মনে নেই।”
অন্যদিকে ডিসেন্ট টেইলার্স-এর মালিক এমদাদুল ইসলাম জানান, “আমার লাইসেন্স ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু আমি কোনো মালামাল দিইনি।” এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ কাগুজে ও জালিয়াতিপূর্ণ—যার মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন সচিব তৌহিদুল ইসলাম।

অধ্যক্ষের বক্তব্যেও অনিয়মের ইঙ্গিত
রামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফয়সাল আলম বলেন, “পরপর দুবছর লিভারেজ বিতরণ করা হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। আমি শুনেছি কিছু অনিয়ম হয়েছে।”
অর্থাৎ, প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়টি স্বয়ং অধ্যক্ষও অস্বীকার করেননি। তবে তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক নওশাদ আলী, যিনি স্বাচিপ নেতা হিসেবেও পরিচিত, বদলির পর আত্মগোপনে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গোড়ায় গলদ প্রশাসনিক দায়িত্বে গাফিলতি
সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সচিবের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেছে, সচিবের অনুমোদনেই বিল উত্তোলন, পোশাক বিতরণ দেখানো এবং জাল স্বাক্ষর সংগ্রহের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এমনকি তিনি সাংবাদিকদের সামনে নিজের দপ্তরের অনিয়ম ঢাকতে ধৃষ্টতার সঙ্গে দায় অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “রামেক সচিবের অনুমোদন ও তত্ত্বাবধান ছাড়া এই ধরনের কাগুজে পোশাক কেলেঙ্কারি সম্ভব নয়। তিনি সরাসরি জবাবদিহির দায়ে পড়বেন।”

দাপ্তরিক পোশাকে হরিলুট, প্রশাসনে নীরবতা
২৪ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ কোথায় গেল, কে সেই অর্থ আত্মসাৎ করল, কার অনুমোদনে বিল ছাড় হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তবে সবকিছু মিলিয়ে পোশাক কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে রামেক সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম-এর দিকে।

উপসংহার:
রামেকে পোশাক কেলেঙ্কারি কেবল দুর্নীতির গল্প নয়, এটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির চরম অভাবের প্রতিফলন।
সরকারি অর্থে কেনা পোশাক কর্মচারীদের হাতে না পৌঁছে সচিবের ডেস্কেই হারিয়ে গেছে—এমন অভিযোগে এখন তদন্ত দাবি উঠছে রামেকের ভেতরেই।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভাগ্নি-জামাই-ভাগিনা’দের দাপটে সক্রিয় আওয়ামী দুর্নীতিবাজরা

২৪ লাখ টাকার পোশাকের হদিস নেই

রামেকে পোশাক কেলেঙ্কারির হোতা সচিব তৌহিদুল ইসলাম

আপডেট সময় ০৯:৩৬:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

রাজশাহী মেডিকেল কলেজে (রামেক) ১৬-২০ গ্রেডভুক্ত কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দকৃত দাপ্তরিক পোশাকসামগ্রীর নামে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থলুটের মহোৎসব। দুই অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৯ টাকার পোশাকসামগ্রীর কোনো হদিস মিলছে না। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, এই পোশাকসামগ্রী ক্রয় ও বিতরণের দায়ভার রামেক সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম-এর ওপরই বর্তায়। কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে, কাগজে-কলমে বিল দেখিয়ে সব পোশাক বিতরণ দেখালেও বাস্তবে কোনো কর্মচারীই সেই পোশাক পাননি।

কাগজে পোশাক, বাস্তবে নেই কিছুই
রামেক সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তিন প্রতিষ্ঠান—ডিসেন্ট টেইলার্স, নয়ন ট্রেডার্স ও নূর ট্রেডিং কোম্পানিুএর মাধ্যমে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পোশাক কেনা হয়। তবে পোশাক সরবরাহ ও বিতরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কর্মচারীরা অভিযোগ করেছেন, কেবল নামমাত্র কিছু টাকা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো পোশাক হাতে পাননি। তবুও তাদের কাছ থেকে সই নেওয়া হয়েছে, যেন তারা পোশাক গ্রহণ করেছেন। অফিস পরিদর্শনে দেখা গেছে, ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের কোনো কর্মচারীই দাপ্তরিক পোশাক পরিধান করছেন না। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যা স্পষ্ট লঙ্ঘন।

দোষ চাপানোর চেষ্টা, দায় এড়াতে ব্যস্ত সচিব
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে রামেক সচিব তৌহিদুল ইসলাম দাবি করেন, “আমরা পোশাক বিতরণ করেছি, আমাদের কাছে তাদের সই আছে।”
তবে তিনি কোনো বিতরণের ছবি বা রসিদ দেখাতে পারেননি। যখন কর্মচারীরা অভিযোগ করেন যে তারা কোনো পোশাক পাননি, তখন সচিবের জবাব—“যে পায়নি, তাকে আমার কাছে ধরে আনেন।” এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার, তিনি অনিয়ম ঢাকতে কর্মচারীদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বিতরণ প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও সরকারি অর্থ ছাড় এবং বিল অনুমোদন করায় প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে সচিবের তত্ত্বাবধানে এই বিপুল অঙ্কের সরকারি টাকা বিল হিসেবে উত্তোলন করা হলো।

স্টোরকিপারের ফাইলে অনিয়মের ছড়াছড়ি
স্টোরকিপার ফয়সাল হায়দারের নথিতে দেখা যায়, কিছু কর্মচারীর নামে একাধিক সাফারি সেট দেখানো হয়েছে—যেখানে নিয়ম অনুযায়ী একজন মাত্র একটি সেট পাওয়ার কথা। একজন গাড়িচালকের নামে তিনটি সাফারি সেট দেখানো হয়েছে, যা সরকারি নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তদন্তে আরও জানা গেছে, বিল প্রদানের সময় সচিব তৌহিদুল ইসলাম নিজেই ওইসব কাগজে অনুমোদন দিয়েছেন।

ঠিকাদাররাও জানেন না ‘কী সরবরাহ করেছেন’
পোশাক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের বক্তব্যেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে।
নূর ট্রেডিং-এর মালিক হুমায়ুন ফরিদ বলেন, “আমরা মালামাল দিয়েছি, তবে কী দিয়েছি মনে নেই।”
অন্যদিকে ডিসেন্ট টেইলার্স-এর মালিক এমদাদুল ইসলাম জানান, “আমার লাইসেন্স ব্যবহার হতে পারে, কিন্তু আমি কোনো মালামাল দিইনি।” এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ক্রয় ও বিতরণ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ কাগুজে ও জালিয়াতিপূর্ণ—যার মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন সচিব তৌহিদুল ইসলাম।

অধ্যক্ষের বক্তব্যেও অনিয়মের ইঙ্গিত
রামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফয়সাল আলম বলেন, “পরপর দুবছর লিভারেজ বিতরণ করা হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত। আমি শুনেছি কিছু অনিয়ম হয়েছে।”
অর্থাৎ, প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়টি স্বয়ং অধ্যক্ষও অস্বীকার করেননি। তবে তৎকালীন অধ্যক্ষ অধ্যাপক নওশাদ আলী, যিনি স্বাচিপ নেতা হিসেবেও পরিচিত, বদলির পর আত্মগোপনে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গোড়ায় গলদ প্রশাসনিক দায়িত্বে গাফিলতি
সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সচিবের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেছে, সচিবের অনুমোদনেই বিল উত্তোলন, পোশাক বিতরণ দেখানো এবং জাল স্বাক্ষর সংগ্রহের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এমনকি তিনি সাংবাদিকদের সামনে নিজের দপ্তরের অনিয়ম ঢাকতে ধৃষ্টতার সঙ্গে দায় অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, “রামেক সচিবের অনুমোদন ও তত্ত্বাবধান ছাড়া এই ধরনের কাগুজে পোশাক কেলেঙ্কারি সম্ভব নয়। তিনি সরাসরি জবাবদিহির দায়ে পড়বেন।”

দাপ্তরিক পোশাকে হরিলুট, প্রশাসনে নীরবতা
২৪ লাখ টাকার সরকারি বরাদ্দ কোথায় গেল, কে সেই অর্থ আত্মসাৎ করল, কার অনুমোদনে বিল ছাড় হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তবে সবকিছু মিলিয়ে পোশাক কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে রামেক সচিব মো. তৌহিদুল ইসলাম-এর দিকে।

উপসংহার:
রামেকে পোশাক কেলেঙ্কারি কেবল দুর্নীতির গল্প নয়, এটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির চরম অভাবের প্রতিফলন।
সরকারি অর্থে কেনা পোশাক কর্মচারীদের হাতে না পৌঁছে সচিবের ডেস্কেই হারিয়ে গেছে—এমন অভিযোগে এখন তদন্ত দাবি উঠছে রামেকের ভেতরেই।