শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফের পদায়ন নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে এই একই সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকার সময় তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে সেই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়, তবুও পুরোনো কর্মস্থলে তাঁর নতুন করে পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহান স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে চাঁদপুর জেলা থেকে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে বদলি করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালে মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের অতিরিক্ত ও অগ্রিম বিল প্রদানের অভিযোগ ওঠে। রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় আইডিয়াল কলেজের ৮ তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণে ‘শফিক এন্টারপ্রাইজ’কে ৯৩ লাখ টাকা এবং মোহাম্মদপুরে নূরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের ৬ তলা ভবন নির্মাণে একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেড় কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল প্রদানের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া মিরপুরে সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের খেলার মাঠ ও রাস্তা নির্মাণে ‘অনিতা এন্টারপ্রাইজ’কে ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগও ছিল। এসব অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তবে দীর্ঘ তদন্ত, ব্যক্তিগত শুনানি ও নথিপত্রের সার্বিক পর্যালোচনার পর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সোলেমান খান স্বাক্ষরিত এক আদেশে মনজুরুল আলম শরীফসহ চারজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় থেকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও একই স্পর্শকাতর সার্কেলে তাঁর ফিরে আসা নিয়ে ইইডি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে অতীতে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, সেখানে পুনরায় তাঁকে পদায়ন করায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা চরমভাবে ব্যাহত হতে পারে। একাধিক সূত্রের দাবি, মনজুরুল আলম শরীফ বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেকে চতুরতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুরে দীর্ঘদিন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডার-বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ এবং ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ঠিকাদারদের অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার বেশ কয়েকটি অভিযোগ ছিল। বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও, তিনি নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তীব্র গুঞ্জন রয়েছে।
বিভাগীয় মামলা, অতীত অভিযোগ এবং বর্তমান পদায়নের বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “রাজনৈতিকভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পূর্বের মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে একই সংবেদনশীল কর্মস্থলে পদায়ন করা হলো—এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্বে) মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
উল্লেখ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজ কার্যালয়ে নগদ টাকা লেনদেনের একটি স্পর্শকাতর ভিডিও ফাঁস হওয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ভিডিওটি পুরোনো হলেও তা প্রকাশ পাওয়ার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সিলেট সার্কেলে বদলি করা হয়। এমন এক টালমাটাল ও দুর্নীতিগ্রস্ত পরিস্থিতির পরপরই বিতর্কিত অতীত ও মামলার মুখোমুখি হওয়া মনজুরুল আলম শরীফকে পুনরায় ঢাকা মেট্রো সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোয় পুরো অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এখন চরম প্রশ্নের মুখে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























