ঢাকা ০১:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নেপাল-তিব্বতে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০০০ মুকসুদপুরে সরকারি খাসজমি ও জলাশয় দখলের অভিযোগ বোরহানউদ্দিনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত, হাফিজ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে বর্ণাঢ্য র‍্যালি জিয়া ‍উদ্যানের লেকে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী চীনে অনিশ্চয়তা, ভারতে ব্যবসা বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবের ৫০ বছরপূর্তি, কর্মসূচি নির্ধারণে জেলা-উপজেলা সাংবাদিকদের প্রস্তুতি সভা বাবা-মায়ের দেওয়া নাম বদলে চলচ্চিত্রে তারকা পরিচিতি পেয়েছেন যেসব অভিনেত্রী ধসে পড়তে পারে বিশ্ব শেয়ারবাজার, এআই নিয়ে ভয়ংকর সতর্কবার্তা সংসার-সন্তান রেখে প্রেমের টানে উধাও প্রবাসীর স্ত্রী বিএনপি ওয়াদা ও জনগণের কাছে অঙ্গীকার রক্ষাকারী দল : রিজভী

চীনে অনিশ্চয়তা, ভারতে ব্যবসা বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো

চীনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার মধ্যেই ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো। ভোক্তা পণ্য থেকে ব্যাংকিং, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত পর্যন্ত ভারতের বাজারে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল গত সপ্তাহে জাপানে দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও বাড়ানোই ছিল এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

ভারতের মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর শপিংমল ও প্রধান সড়কে জাপানি পণ্য ও ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখন বেশ দৃশ্যমান। পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজি এবং স্নিকার্স কোম্পানি অনিতসুকা টাইগার দেশটিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

এর পাশাপাশি জাপানের আসবাব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিটোরি সম্প্রতি ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। দেশটিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপানি কনভেনিয়েন্স স্টোর চেইন লসনও। প্রতিষ্ঠানটি ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ১০ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর শুরু হবে মুম্বাই থেকে।

শুধু খুচরা ব্যবসাতেই নয়, ভারতের আর্থিক খাতেও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। বিদেশি ঋণদাতারা যখন ভারতের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন জাপানি ব্যাংকগুলো দেশটির আর্থিক সম্পদ কিনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক এমইউএফজি গত বছর ভারতের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। একই বছর সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ভারতের ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হয়।

ভারতের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা জিসিসি ব্যবস্থাতেও জাপানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে শতাধিক জাপানি প্রতিষ্ঠান এসব জিসিসি পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্র গবেষণা ও উন্নয়ন, করপোরেট কৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।

নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা ভিপুল নাথ জিন্দাল বিবিসিকে বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলোকে এখন প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কারণ জাপানের স্থানীয় জনসংখ্যা গত ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে কমছে। ফলে দেশটিতে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে না, বাজারের আকারও স্থায়ীভাবে ছোট হয়ে আসছে।

একই সময়ে জাপানের ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রচলিত বাজারগুলোও আগের তুলনায় কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীনে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসা করা আরও কঠিন হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের বাজারের আকার তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের বাজারকে জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরালো হয় প্রায় দেড় দশক আগে বাণিজ্য উদারীকরণের একটি চুক্তির মাধ্যমে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। একই সময়ে ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয় এবং মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে জাপানের বেসরকারি কোম্পানিগুলো।

জুলাইয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম দিল্লি সফরের সময় অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ জ্বালানিও রয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেছেন, জাপানের ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হতে পারে।

শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, জাপানের ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্মস্থান হামামাতসু শহরে সম্প্রতি হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি গঠন করা হয়েছে। শহরটির ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।

ভারতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার সময়েই চীনে জাপানের নিট বিনিয়োগ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে চীন ছেড়ে যাচ্ছে। বরং কয়েক বছর ধরে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে চাইছে।

সিডনিভিত্তিক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া চেয়ার শ্রুতি পান্ডালাইয়ের মতে, চীনসংক্রান্ত ঝুঁকির বিরুদ্ধে ভারত জাপানের জন্য এক ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে টোকিওর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দিল্লির উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।

তবে ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে জাপান এখনো গভীরভাবে যুক্ত। ফলে চীন থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসা বা সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাণিজ্যিক খরচ এবং চীনের পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে।

ভারতেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশগত অনুমোদনে বিলম্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়েছে।

সম্প্রতি জাপানের এক সাবেক মন্ত্রী দিল্লির সরকারের সমালোচনা করে বুলেট ট্রেন প্রকল্পে বিলম্বের জন্য ভারতকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভারত নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করেছে। ভারত সরকার অবশ্য ওই সমালোচনা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

ঘটনাটি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। তারা এটিকে ভারত ও জাপানের মধ্যে মতপার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ভারতের চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এ অবস্থায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগের এই গতি ধরে রাখতে ভারতকে আরও সতর্কভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অন্য দেশগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারতের চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকায় জাপানি বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: বিবিসি

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নেপাল-তিব্বতে আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ছাড়াল ১০০০

চীনে অনিশ্চয়তা, ভারতে ব্যবসা বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো

আপডেট সময় ০১:১৭:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চীনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ার মধ্যেই ভারতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে জাপানি কোম্পানিগুলো। ভোক্তা পণ্য থেকে ব্যাংকিং, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত পর্যন্ত ভারতের বাজারে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি দ্রুত বাড়ছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল গত সপ্তাহে জাপানে দেশটির সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও বাড়ানোই ছিল এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

ভারতের মুম্বাই, দিল্লি ও বেঙ্গালুরুর শপিংমল ও প্রধান সড়কে জাপানি পণ্য ও ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এখন বেশ দৃশ্যমান। পোশাকের ব্র্যান্ড ইউনিক্লো ও মুজি এবং স্নিকার্স কোম্পানি অনিতসুকা টাইগার দেশটিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে।

এর পাশাপাশি জাপানের আসবাব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিটোরি সম্প্রতি ভারতের বাজারে প্রবেশ করেছে। দেশটিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাপানি কনভেনিয়েন্স স্টোর চেইন লসনও। প্রতিষ্ঠানটি ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ১০ হাজার দোকান খোলার পরিকল্পনা করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর শুরু হবে মুম্বাই থেকে।

শুধু খুচরা ব্যবসাতেই নয়, ভারতের আর্থিক খাতেও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়ছে। বিদেশি ঋণদাতারা যখন ভারতের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে সরে যাচ্ছে, তখন জাপানি ব্যাংকগুলো দেশটির আর্থিক সম্পদ কিনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

জাপানের সবচেয়ে বড় ব্যাংক এমইউএফজি গত বছর ভারতের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগ হিসেবে ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে শ্রীরাম ফাইন্যান্সের ২০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে। একই বছর সুমিতোমো মিৎসুই ব্যাংকিং করপোরেশন ভারতের ইয়েস ব্যাংকের ২৪ দশমিক ২২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হয়ে সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হয়।

ভারতের এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার বা জিসিসি ব্যবস্থাতেও জাপানি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ছে। ডেলয়েটের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে শতাধিক জাপানি প্রতিষ্ঠান এসব জিসিসি পরিচালনা করছে। এসব কেন্দ্র গবেষণা ও উন্নয়ন, করপোরেট কৌশল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকে।

নেক্সট ভারত ভেঞ্চার্সের প্রতিষ্ঠাতা ভিপুল নাথ জিন্দাল বিবিসিকে বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলোকে এখন প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের দিকে তাকাতে হচ্ছে। কারণ জাপানের স্থানীয় জনসংখ্যা গত ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে কমছে। ফলে দেশটিতে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমছে না, বাজারের আকারও স্থায়ীভাবে ছোট হয়ে আসছে।

একই সময়ে জাপানের ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রচলিত বাজারগুলোও আগের তুলনায় কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে চীনে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসা করা আরও কঠিন হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের বাজারের আকার তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ভারতের বাজারকে জাপানি কোম্পানিগুলোর কাছে স্বাভাবিক গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরালো হয় প্রায় দেড় দশক আগে বাণিজ্য উদারীকরণের একটি চুক্তির মাধ্যমে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ককে বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। একই সময়ে ভারতে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয় এবং মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে জাপানের বেসরকারি কোম্পানিগুলো।

জুলাইয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রথম দিল্লি সফরের সময় অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে জাপানি কোম্পানিগুলো প্রায় ১২০টি চুক্তির মাধ্যমে ভারতে ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও সবুজ জ্বালানিও রয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেছেন, জাপানের ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই পূরণ হতে পারে।

শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, জাপানের ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলোও ভারতের বাজারে প্রবেশের সুযোগ খুঁজছে। সুজুকি, হোন্ডা ও ইয়ামাহার মতো প্রতিষ্ঠানের জন্মস্থান হামামাতসু শহরে সম্প্রতি হামামাতসু ইন্ডিয়া কমিটি গঠন করা হয়েছে। শহরটির ছোট কোম্পানিগুলো কীভাবে ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারে, তা খতিয়ে দেখবে এই কমিটি।

ভারতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ার সময়েই চীনে জাপানের নিট বিনিয়োগ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অর্থ এই নয় যে জাপানি কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে চীন ছেড়ে যাচ্ছে। বরং কয়েক বছর ধরে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর তারা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে চাইছে।

সিডনিভিত্তিক লোয়ি ইনস্টিটিউটের ইন্ডিয়া চেয়ার শ্রুতি পান্ডালাইয়ের মতে, চীনসংক্রান্ত ঝুঁকির বিরুদ্ধে ভারত জাপানের জন্য এক ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে টোকিওর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দিল্লির উৎপাদন খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করছে।

তবে ভারত ও জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চীনের উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে জাপান এখনো গভীরভাবে যুক্ত। ফলে চীন থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসা বা সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাণিজ্যিক খরচ এবং চীনের পাল্টা অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঝুঁকি রয়েছে।

ভারতেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা রয়েছে। করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জমি ও পরিবেশগত অনুমোদনে বিলম্ব দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়েছে।

সম্প্রতি জাপানের এক সাবেক মন্ত্রী দিল্লির সরকারের সমালোচনা করে বুলেট ট্রেন প্রকল্পে বিলম্বের জন্য ভারতকে দায়ী করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভারত নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিশ্রুতি পরিবর্তন করেছে। ভারত সরকার অবশ্য ওই সমালোচনা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

ঘটনাটি চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়। তারা এটিকে ভারত ও জাপানের মধ্যে মতপার্থক্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে ভারতের চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এ অবস্থায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করার পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগের এই গতি ধরে রাখতে ভারতকে আরও সতর্কভাবে কাজ করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে অন্য দেশগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ভারতের চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকায় জাপানি বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: বিবিসি