বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ দিবসটি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
১৬ বছরেও ফেরেননি চৌধুরী আলম
কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাসিনা চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি এখনো অপেক্ষায় আছি—আমার স্বামী ফিরে আসবেন। আল্লাহ একদিন আমার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন। আমার সন্তানরাও বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাসবে। আল্লাহ যেন এ দিনটি দেখার পর আমাকে মৃত্যু দেন।
২০১০ সালের ২৫ জুন গুমের শিকার হন তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর, বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম। পরিবারের অভিযোগ, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনায় মামলা হলে থানা পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। তবে প্রতিবেদনে তার গুমের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
চৌধুরী আলমের গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে করা মামলা চলছে।
চৌধুরী আলমের ছেলে ও শাহবাগ থানা বিএনপির নেতা আবু সাদাত সাওয়ান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, সরকার এখনো ঘোষণা করেনি যে তার বাবা আর বেঁচে নেই। তাই তারা এখনো বাবার ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
দেড় দশকে ১ হাজার ৫৬৯ গুমের তথ্য
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাবে, আওয়ামী লীগের দেড় যুগের শাসনকালে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ। এছাড়া ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব ব্যক্তির অনেকেই কথিত ‘ক্রসফায়ারের’ শিকার হয়েছেন অথবা নদীতে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছেন।
সূত্র অনুযায়ী, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগকে সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘নিখোঁজ ও মৃত’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলে অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।
এখনো নিখোঁজ ইলিয়াস আলী
আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম বিএনপির প্রভাবশালী নেতা ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ তিনি নিখোঁজ হন।
এরপর থেকে তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের পর ইলিয়াস আলীকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে তার পরিবার হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। আদালত রুল জারি করলেও তার কোনো হদিস মেলেনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দীর্ঘদিন তদন্তের কথা বললেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনা বাংলাদেশে গুম ও রাজনৈতিক নিপীড়নের অন্যতম বড় প্রতীক হিসেবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনেও স্থান পেয়েছে।
ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী গণমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বাবার আদর না পেয়েই বড় হচ্ছে আরাফ
১১ বছর বয়সি আরাফ হোসেন পৃথিবীর আলো দেখার কয়েক মাস আগে তার বাবা পারভেজ হোসেনকে রাজধানীর শাহবাগ থেকে একদল লোক গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ।
আরাফ এখন মাতুয়াইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার আদর ও স্নেহ কেমন, তা জানে না সে।
পারভেজ হোসেন ছিলেন বংশাল থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তার স্ত্রী ফারজানা আক্তার দুই সন্তানকে নিয়ে বর্তমানে রাজধানীর ওয়ারী থানার যোগীনগর এলাকায় বোনের বাসায় থাকেন।

ফারজানা গণমাধ্যমকে জানান, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর দুপুরে শাহবাগ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে তিন সহযোগীসহ পারভেজকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে অভিযোগ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা করেন।
ফারজানা গণমাধ্যমকে বলেন, ৫ আগস্টের পর আশায় বুক বেঁধেছিলাম স্বামী ফিরে আসবে। কিন্তু এখনো এলো না। আমি আজও তার ফেরার অপেক্ষায় আছি। আমার বিশ্বাস সে ফিরে আসবে।
১২ বছরেও সন্ধান নেই ব্যবসায়ী কুদ্দুসুরের
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থানা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ব্যবসায়ী মো. কুদ্দুসুর রহমান চৌধুরী। পরিবারের দাবি, সাদা পোশাকে একদল লোক তাকে তুলে নিয়ে যায়। অপহরণকারীরা কুদ্দুসুরের পূর্বপরিচিত ছিলেন বলেও দাবি পরিবারের।
কুদ্দুসুরের সঙ্গে থাকা তার ভাতিজা মোহাম্মদ সাজাহান অপহরণকারীদের চিনতে পেরেছিলেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি তাকে তুলে নেওয়ার পর আর ফিরে আসেননি তিনি। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, সেটিও জানেন না স্বজনরা।
ঘটনার পর কুদ্দুসুরের স্ত্রী জোসনা বেগম পল্লবী থানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয় সদস্যের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। পরে থানা পুলিশ ও পুলিশের দুটি বিশেষায়িত সংস্থা মামলাটি তদন্ত করে। কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং অভিযুক্তদেরও আইনের আওতায় আনা যায়নি।
জোসনা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, আমার মন বলছে এখনো সে বেঁচে আছে। হয়তো একদিন ফিরে আসবে। আমি আমার স্বামীকে ফিরে পেতে চাই।
সুমনেরও খোঁজ মেলেনি
২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিখোঁজ হন ঢাকা মহানগর বিএনপির ৩৮ নম্বর, বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন।

এরপর থেকে তারও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়কারী এবং বর্তমানে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির ভাই।
গুম প্রতিরোধ দিবসের আয়োজন
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬’ উদযাপনের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার কোনো ধরনের গুম, খুন বা নির্যাতনে বিশ্বাস করে না। অনুষ্ঠানে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও অন্যান্য ব্যক্তিদের মধ্যে যারা গুমের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
‘শুধু আইন করলেই হবে না’
এদিকে শনিবার (২৯ আগস্ট) আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, গুমের অবসান ঘটাতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রতিটি গুমের অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, অতীতের ঘটনাগুলোর সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুমের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
গুমের অবসান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান সম্পর্কে সত্য উদ্ঘাটন এবং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষা শেষ হয়নি। কেউ স্বামীকে, কেউ বাবাকে, কেউ ভাইকে ফিরে পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন। তাদের কাছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস শুধু একটি দিবস নয়—প্রিয় মানুষটির সন্ধান পাওয়ার দাবিও।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















