ঢাকা ১২:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৬ মাসে দুই লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া : প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম গুমের ১৬ বছর পরও ফেরেননি তারা, থামেনি পরিবারের কান্না শপথ নিলেন আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত বিচারপতি হাবিবুল গনি সোনারগাঁও হোটেলে আন্তর্জাতিক প্রেস ক্লাব ট্রাস্টের অভিষেক ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত নেপালে আকস্মিক বন্যায় মৃত বেড়ে ৭৩৪, জীবিত উদ্ধার ৮১৮৬ জন রেলের হুইসেল নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট, অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান বালাসী-বাহাদুরাবাদ সেতুর দাবিতে বাবা-ছেলের দীর্ঘ পদযাত্রা মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষ-বদলি বাণিজ্যের বিস্ফোরক অভিযোগ ঢাকাসহ সারাদেশে অভিযানে নামছে পুলিশের নতুন ‘স্পেশাল’ ইউনিট নেপালে কাদার ভেতর উদ্ধারকারীদের মরিয়া অনুসন্ধান, নিখোঁজ ৩০০০

রেলের হুইসেল নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট, অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে পার্বতীপুরের কেলোকা, সিআরবির রেলভূমি থেকে ঢাকার কমলাপুর—রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, যন্ত্রাংশ মেরামত, বাণিজ্যিক দোকান ও সরকারি জমি বরাদ্দের নানা নথিপত্রে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ বলয়ের মাধ্যমে রেলের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন, ঠিকাদার আনিসুর রহমান টিপু ওরফে ‘পার্কিং টিপু’ এবং রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আফসার আলী বিশ্বাস। একই সময়ে প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি ওঠায় রেলের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে এই সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ট্রাকশন মোটর মেরামতের পাঁচটি চুক্তি-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথি ও সার্বিক কার্যক্রমের বিবরণ চেয়ে চলতি বছরের ৮ মার্চ রেলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় দুদক। উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে চুক্তিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়।

এই অনুসন্ধানে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার (কেলোকা) যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেলোকায় আফসার আলী বিশ্বাসের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৮০টি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। নতুন যন্ত্রাংশ সরবরাহের টেন্ডার থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ করা হয়েছে পুরোনো মেরামত করা যন্ত্রাংশ। পরে ব্যবহারে ত্রুটি দেখা দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন। ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ট্রাকশন মেইন বিয়ারিং কেনাকাটাও রয়েছে আলোচনায়।

যন্ত্রাংশ সরবরাহের পাশাপাশি রেলের নতুন কেনা কোচ ও ইঞ্জিনের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৬৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব কোচ ও ইঞ্জিনে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা তদন্ত করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২ জুলাই প্রেরিত এক তদন্তপত্রে সংশ্লিষ্টদের যাবতীয় প্রমাণসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যুগ্ম সচিব ও তদন্ত কর্মকর্তা খালেদা আখতারের স্বাক্ষরিত সেই পত্রে শুনানির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ১১টা ৩০ মিনিট।

রেলভূমিতে বরাদ্দের প্রশ্ন
চট্টগ্রামে রেলের মালিকানাধীন ভূমির হিসাব পর্যালোচনায় আরেকটি নথির তথ্য মিলেছে। এস এম এ মোসাব্বিরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিআরবি থেকে পাহাড়তলীর এসআরভি স্টেশনের পশ্চিম-উত্তর পাশে সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুট রেলভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবরের সেই পত্রে চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও এসিসিএম (আব) (পূর্ব) স্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ওই ভূমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

রেলের বাণিজ্যিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার পুরোনো নীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভেন্ডিং নীতিমালা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগে ৯২৬টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫২টি দোকান বরাদ্দ রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আমজাল হোসেনের স্বাক্ষরিত ইউও নোটে নতুন দোকান বরাদ্দ না দেওয়া এবং পুরোনো বরাদ্দের মেয়াদ না বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সংখ্যা কমানোর নির্দেশ ছিল।

সেই নির্দেশনার পরও কমলাপুর রেলস্টেশনের পাবলিক টয়লেটের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে ৪৮০ বর্গফুট জায়গায় ফাস্টফুডের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৪ জুন ২০২৬-এর নথিতে দেখা যায়, আনিসুর রহমান টিপু, স্বত্বাধিকারী সিকদার কনস্ট্রাকশনের আবেদনের ভিত্তিতে বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) সিআরবি ও এসিসিএম (আর) (পূর্ব) ওই পত্রে স্বাক্ষর করেন।

সরেজমিন ওই জায়গায় বড় দোকান নির্মাণের চিত্রও পাওয়া গেছে। জায়গাটির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি বলে দাবি করা হলেও এ মূল্যায়নের স্বাধীন যাচাই মেলেনি। পাবলিক টয়লেটের পাশে খাদ্যপণ্যের দোকান স্থাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি বরাদ্দের নথিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায়। রেলপথ মন্ত্রণালয় এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া যাচাইয়ে ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই জারি করা অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব মো. রুপম আনোয়ারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

টেন্ডার থেকে বরাদ্দ-ঘুরেফিরে একই নাম
কমলাপুরের এই বরাদ্দের বাইরে টিপুর প্রতিষ্ঠান ঘিরে আরও কাজের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিমানবন্দর, টঙ্গী, জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও ইসলামপুর স্টেশনের গণশৌচাগারের কাজ বরাদ্দেও তার নাম রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তরের ১৬টি দরপত্রের মধ্যে আটটির কাজ সিকদার এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের ডিইএন-১, ডিইএন-২ ও ডিইএন-৩ দপ্তরেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাজ তার প্রতিষ্ঠান পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অন্যদিকে আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে কাজ চালানোর তথ্য মিলেছে। মেসার্স বাঁধন এন্টারপ্রাইজ, রুপিতা এন্টারপ্রাইজ, শ্রীজা মেটাল ও বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন—এই চারটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারের ১২ তলা, সুইট-১৮ থেকে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। রেলের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের সেখানে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এবং কাজের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

আফসার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর মো. আব্দুল বারিক শেখের করা মামলায় মোট ১০৯ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আফসার আলী বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

পদ্মা প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন
২০১৬ সালে একনেক সভায় পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। তবে অনুমোদনের মাত্র দুই বছর পর ২০১৮ সালে প্রকল্প ব্যয় এক লাফে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রস্তুত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়নের প্রায় সব পর্যায়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। দরপত্র যাচাই ছাড়াই চীনা ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন (২০২৩-২৪ অর্থবছর) অনুযায়ী, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার অনিয়মকে ‘গুরুতর’ ও ‘মীমাংসাযোগ্য নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অডিটে যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে ৫৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ; কম উচ্চতায় মাটি ভরাট করে অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ; বালুর স্তর কম ব্যবহার করে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান; প্রকৃত কাজের চেয়ে বেশি দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা বিল পরিশোধ; এবং ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে ১৭.১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যে ইপিসি/টার্নকি চুক্তির মাধ্যমে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন নির্মাণ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকায় এটি নির্মাণ সম্ভব ছিল, সেখানে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন কৌশলে এই প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করেন।

ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছে ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি টাকা (প্রায় ২০.৪ মিলিয়ন ডলার)। অথচ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ছিল ৪৪.৭১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে পদ্মা রেল সংযোগে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি খরচ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য রেখে কর্মকর্তা পদায়ন, কাজ বণ্টন ও অর্থ পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে আফজাল নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনেন; যার মধ্যে তার ফরিদপুরের শ্বশুরালয়ের আত্মীয় ও কথিত শ্যালিকাসহ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আফজালের অবস্থানে ব্যাঘাত ঘটেনি। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বরের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মাধ্যমে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিতে জড়িত প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তার পুরো রেলের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জমি, নকশা ও অর্থের হিসাব
পদ্মা প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণেও অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে জমি অধিগ্রহণে ভুয়া নথিপত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। মাদারীপুরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা হওয়ার তথ্যও মিলেছে।

প্রকল্পে আফজালের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া আগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে আফজালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বীথি), ফারহানা সুলতানা, যুগ্ম সচিব মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের নামও এসেছে।

দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল-আমিন বলেন, ‘যে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হয়। কোনো মামলায় চার্জশিট আদালতে দাখিলের পর এর বিচারিক প্রক্রিয়া আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। তখন মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতই গ্রহণ করেন।’

রেলের কর্মীরা জানান, আফজালের দায়িত্বকালে টিপু ও আফসারকে ঘিরে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়। কাজের তালিকা, বাণিজ্যিক বরাদ্দ এবং রেলসম্পদ ব্যবহারের নথিগুলো পাশাপাশি রাখলে একই নাম ও প্রতিষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। শাহীনুর রহমান নামের এক অভিযোগকারী জানান, রেলের অনেক কাজই একই বলয়ের লোকজন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। অন্য কর্মীরাও সব খাতের নথিপত্র পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানান।

অভিযোগ অস্বীকার আফজাল হোসেনের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। রেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। তবে আইনের বাইরে কিছুই হচ্ছে না।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৬ মাসে দুই লাখ শ্রমিক নেবে মালয়েশিয়া : প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম

রেলের হুইসেল নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট, অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান

আপডেট সময় ১১:৩০:০৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে পার্বতীপুরের কেলোকা, সিআরবির রেলভূমি থেকে ঢাকার কমলাপুর—রেলওয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, যন্ত্রাংশ মেরামত, বাণিজ্যিক দোকান ও সরকারি জমি বরাদ্দের নানা নথিপত্রে ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম সামনে আসছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি সংঘবদ্ধ বলয়ের মাধ্যমে রেলের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

এই প্রক্রিয়ায় যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন, ঠিকাদার আনিসুর রহমান টিপু ওরফে ‘পার্কিং টিপু’ এবং রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক আফসার আলী বিশ্বাস। একই সময়ে প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি ওঠায় রেলের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে এই সিন্ডিকেট ও অনিয়মের বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের মাধ্যমে। ট্রাকশন মোটর মেরামতের পাঁচটি চুক্তি-সংক্রান্ত তথ্য, সংশ্লিষ্ট নথি ও সার্বিক কার্যক্রমের বিবরণ চেয়ে চলতি বছরের ৮ মার্চ রেলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায় দুদক। উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান মো. জাহাঙ্গীর আলমের স্বাক্ষরিত ওই স্মারকে চুক্তিগুলোর বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়।

এই অনুসন্ধানে পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার (কেলোকা) যন্ত্রাংশ সরবরাহে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেলোকায় আফসার আলী বিশ্বাসের স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৮০টি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। নতুন যন্ত্রাংশ সরবরাহের টেন্ডার থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহ করা হয়েছে পুরোনো মেরামত করা যন্ত্রাংশ। পরে ব্যবহারে ত্রুটি দেখা দেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত করেছেন। ৩০০০ সিরিজের লোকোমোটিভের ট্রাকশন মেইন বিয়ারিং কেনাকাটাও রয়েছে আলোচনায়।

যন্ত্রাংশ সরবরাহের পাশাপাশি রেলের নতুন কেনা কোচ ও ইঞ্জিনের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৬৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা এসব কোচ ও ইঞ্জিনে গুরুতর ত্রুটি ধরা পড়ার পর তা তদন্ত করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২ জুলাই প্রেরিত এক তদন্তপত্রে সংশ্লিষ্টদের যাবতীয় প্রমাণসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যুগ্ম সচিব ও তদন্ত কর্মকর্তা খালেদা আখতারের স্বাক্ষরিত সেই পত্রে শুনানির সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ জুলাই ২০২৬, সকাল ১১টা ৩০ মিনিট।

রেলভূমিতে বরাদ্দের প্রশ্ন
চট্টগ্রামে রেলের মালিকানাধীন ভূমির হিসাব পর্যালোচনায় আরেকটি নথির তথ্য মিলেছে। এস এম এ মোসাব্বিরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিআরবি থেকে পাহাড়তলীর এসআরভি স্টেশনের পশ্চিম-উত্তর পাশে সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুট রেলভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবরের সেই পত্রে চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও এসিসিএম (আব) (পূর্ব) স্বাক্ষর করেন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ওই ভূমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

রেলের বাণিজ্যিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার পুরোনো নীতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভেন্ডিং নীতিমালা অনুযায়ী পূর্বাঞ্চলের ঢাকা বিভাগে ৯২৬টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৫২টি দোকান বরাদ্দ রয়েছে। ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আমজাল হোসেনের স্বাক্ষরিত ইউও নোটে নতুন দোকান বরাদ্দ না দেওয়া এবং পুরোনো বরাদ্দের মেয়াদ না বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সংখ্যা কমানোর নির্দেশ ছিল।

সেই নির্দেশনার পরও কমলাপুর রেলস্টেশনের পাবলিক টয়লেটের পূর্ব-দক্ষিণ পাশে ৪৮০ বর্গফুট জায়গায় ফাস্টফুডের দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৪ জুন ২০২৬-এর নথিতে দেখা যায়, আনিসুর রহমান টিপু, স্বত্বাধিকারী সিকদার কনস্ট্রাকশনের আবেদনের ভিত্তিতে বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার (পূর্ব) সিআরবি ও এসিসিএম (আর) (পূর্ব) ওই পত্রে স্বাক্ষর করেন।

সরেজমিন ওই জায়গায় বড় দোকান নির্মাণের চিত্রও পাওয়া গেছে। জায়গাটির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার কাছাকাছি বলে দাবি করা হলেও এ মূল্যায়নের স্বাধীন যাচাই মেলেনি। পাবলিক টয়লেটের পাশে খাদ্যপণ্যের দোকান স্থাপন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয়টি বরাদ্দের নথিতে সীমাবদ্ধ না থেকে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায়। রেলপথ মন্ত্রণালয় এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া যাচাইয়ে ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই জারি করা অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব মো. রুপম আনোয়ারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

টেন্ডার থেকে বরাদ্দ-ঘুরেফিরে একই নাম
কমলাপুরের এই বরাদ্দের বাইরে টিপুর প্রতিষ্ঠান ঘিরে আরও কাজের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিমানবন্দর, টঙ্গী, জয়দেবপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও ইসলামপুর স্টেশনের গণশৌচাগারের কাজ বরাদ্দেও তার নাম রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) দপ্তরের ১৬টি দরপত্রের মধ্যে আটটির কাজ সিকদার এন্টারপ্রাইজ পেয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকা বিভাগের ডিইএন-১, ডিইএন-২ ও ডিইএন-৩ দপ্তরেরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাজ তার প্রতিষ্ঠান পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

অন্যদিকে আফসার আলী বিশ্বাসের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে কাজ চালানোর তথ্য মিলেছে। মেসার্স বাঁধন এন্টারপ্রাইজ, রুপিতা এন্টারপ্রাইজ, শ্রীজা মেটাল ও বিশ্বাস কনস্ট্রাকশন—এই চারটি প্রতিষ্ঠান ঢাকার বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারের ১২ তলা, সুইট-১৮ থেকে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে। রেলের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের সেখানে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এবং কাজের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

আফসার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলাও রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর মো. আব্দুল বারিক শেখের করা মামলায় মোট ১০৯ জনকে আসামি করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আফসার আলী বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

পদ্মা প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন
২০১৬ সালে একনেক সভায় পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। তবে অনুমোদনের মাত্র দুই বছর পর ২০১৮ সালে প্রকল্প ব্যয় এক লাফে ৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রস্তুত, ঠিকাদার নিয়োগ এবং বাস্তবায়নের প্রায় সব পর্যায়ে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। দরপত্র যাচাই ছাড়াই চীনা ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে চীনা ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিরীক্ষা প্রতিবেদন (২০২৩-২৪ অর্থবছর) অনুযায়ী, পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পে মোট ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকার অনিয়মকে ‘গুরুতর’ ও ‘মীমাংসাযোগ্য নয়’ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। অডিটে যেসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মূল চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে ৫৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ; কম উচ্চতায় মাটি ভরাট করে অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধনের অভিযোগ; বালুর স্তর কম ব্যবহার করে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদান; প্রকৃত কাজের চেয়ে বেশি দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি টাকা বিল পরিশোধ; এবং ‘বিশেষায়িত কাজ’ দেখিয়ে ১৭.১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যে ইপিসি/টার্নকি চুক্তির মাধ্যমে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা রেলস্টেশন নির্মাণ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকায় এটি নির্মাণ সম্ভব ছিল, সেখানে ১৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক মো. আফজাল হোসেন কৌশলে এই প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করেন।

ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার রেলপথে কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছে ২২৫ থেকে ২২৮ কোটি টাকা (প্রায় ২০.৪ মিলিয়ন ডলার)। অথচ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ছিল ৪৪.৭১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে পদ্মা রেল সংযোগে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি খরচ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন। ওই সময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য রেখে কর্মকর্তা পদায়ন, কাজ বণ্টন ও অর্থ পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে আফজাল নিজের পছন্দমতো ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আনেন; যার মধ্যে তার ফরিদপুরের শ্বশুরালয়ের আত্মীয় ও কথিত শ্যালিকাসহ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও আফজালের অবস্থানে ব্যাঘাত ঘটেনি। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বরের সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ৮ ডিসেম্বর ২০২৪ তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মাধ্যমে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তিতে জড়িত প্রকল্পের প্রধান কর্মকর্তার পুরো রেলের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়া নিয়ে প্রশাসনিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জমি, নকশা ও অর্থের হিসাব
পদ্মা প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণেও অর্থের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে জমি অধিগ্রহণে ভুয়া নথিপত্র ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। মাদারীপুরে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলা হওয়ার তথ্যও মিলেছে।

প্রকল্পে আফজালের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন কর্মকর্তার নামও এসেছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া আগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাকে আফজালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বীথি), ফারহানা সুলতানা, যুগ্ম সচিব মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের নামও এসেছে।

দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আল-আমিন বলেন, ‘যে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হয়। কোনো মামলায় চার্জশিট আদালতে দাখিলের পর এর বিচারিক প্রক্রিয়া আদালতের এখতিয়ারে চলে যায়। তখন মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতই গ্রহণ করেন।’

রেলের কর্মীরা জানান, আফজালের দায়িত্বকালে টিপু ও আফসারকে ঘিরে একটি প্রভাববলয় তৈরি হয়। কাজের তালিকা, বাণিজ্যিক বরাদ্দ এবং রেলসম্পদ ব্যবহারের নথিগুলো পাশাপাশি রাখলে একই নাম ও প্রতিষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি চোখে পড়ে। শাহীনুর রহমান নামের এক অভিযোগকারী জানান, রেলের অনেক কাজই একই বলয়ের লোকজন পাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। অন্য কর্মীরাও সব খাতের নথিপত্র পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানান।

অভিযোগ অস্বীকার আফজাল হোসেনের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন তার বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। রেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি চক্র উঠেপড়ে লেগেছে। তবে আইনের বাইরে কিছুই হচ্ছে না।