বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনে প্রায় ৮৮৪ কোটি টাকার প্রকল্পে পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা দিতে প্যাকেজ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের কাজ এমনভাবে প্যাকেজ করা হয়েছে, যাতে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের একাধিক ঠিকাদার।
তাদের দাবি, আগে যেখানে ট্র্যাক মেরামতের কাজ ২ থেকে ৫ বা ৭ কোটি টাকার ছোট প্যাকেজে দেওয়া হতো, এবার বিভিন্ন এলাকার কাজ একত্র করে বড় বড় প্যাকেজ করা হয়েছে। এতে বড় কাজের অভিজ্ঞতা ও আর্থিক সক্ষমতার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ছোট ও মাঝারি ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন।
ফলে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সরঞ্জামসহ মোট প্রায় ১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদন করা হয় ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই। ট্র্যাকের কাজগুলো আটটি প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে।
প্যাকেজগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে ফতেয়াবাদ হয়ে নাজিরহাট এবং ফতেয়াবাদ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার টাকা এবং জয়দেবপুর-শ্রীপুর অংশে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ-বেগুনবাড়ি, ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন-জারিয়া জাঞ্জাইল এবং গৌরীপুর-ময়মনসিংহ জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ২৩৫ কোটি ৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা; বেগুনবাড়ী-দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট-তারাকান্দি এবং তারাকান্দি-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব অংশে ২০০ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা; ভৈরব বাজার জংশন-আঠারোবাড়ী অংশে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা; আখাউড়া-সাটিয়াজুরী অংশে ৫৯ কোটি ২৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং সিলেট-সাটিয়াজুরী অংশে ১৯০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অভিজ্ঞ একাধিক ঠিকাদার বলেন, বড় প্যাকেজের কারণে স্থানীয় ও ছোট-মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ কার্যত সংকুচিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে একই ধরনের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে দেওয়া হলেও এবার বিভিন্ন কাজ একত্র করে বড় প্যাকেজ করা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের প্রতিযোগিতায় আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজের ভলিউম অনুযায়ী মাত্র দুই থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এসব প্যাকেজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রতিযোগিতা সীমিত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হবে।’
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, প্রয়োজনের তুলনায় কিছু কাজের পরিধি ও প্রাক্কলন বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতা কমিয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রেলের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সম্প্রতি দুটি টেন্ডারে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ২৩৫ কোটি টাকার প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে। অন্যদিকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্যাকেজে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।
তাদের দাবি, একক দরদাতা থাকা সত্ত্বেও ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তবে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে— এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়টিও সামনে এনেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যারা ব্যবসায় সুবিধা পেয়েছেন, তাদের একটি অংশ এখনও রেলের বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে। আবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ঠিকাদারদের অনেকে অতীতে রাজনৈতিক হয়রানি ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে ব্যবসায়িকভাবে পিছিয়ে পড়েছেন বলে দাবি তাদের।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা রাজনৈতিক অর্থায়নের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের দাবি, বড় প্যাকেজ ভেঙে ছোট ছোট প্যাকেজে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে। এতে অধিকসংখ্যক যোগ্য ঠিকাদার অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে ২০২৫ সালে। কাজের ভলিউম বড় হওয়ায় প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। ২০০ কোটি ও ১৯০ কোটি টাকার দুটি প্যাকেজ ভেঙে আরও দুটি প্যাকেজ বাড়ানো হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারপরও যদি কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে তা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে প্যাকেজ ছোট করা যেতে পারে। আমরা পিপিআর-২০২৫-এর শর্ত পালন সাপেক্ষে টেন্ডার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি। কর্তৃপক্ষ চাইলে তা বাতিল করা হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















