নানা অজুহাতে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক অকার্যকর করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কমিটির সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বৈঠকে সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্য যথাযথ প্রস্তুতি না থাকার কথা বলে আলোচনা সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করছেন। আবার কখনো অন্য বৈঠকে যাওয়ার তাড়া দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা শেষ না করেই বৈঠক শেষ করা হচ্ছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সংসদ ভবনে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মূল উদ্দেশ্য সরকারের কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, সরকারদলীয় কিছু সদস্য কমিটির বৈঠকে যথাযথ প্রস্তুতি না থাকার অজুহাত দিচ্ছেন। কখনো আবার বৈঠকে এসেই অন্য বৈঠকে যাওয়ার তাড়া দিচ্ছেন।
গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রথম বৈঠকে কমিটির সদস্যদের আগে থেকেই এজেন্ডা ও আলোচনার উপকরণ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্য প্রস্তুতি নিয়ে আসেননি বলে বৈঠকের সময় কমিয়ে দ্রুত শেষ করার কথা বলেন। ফলে বৈঠকটি এক ঘণ্টার মধ্যে অনেকটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়। প্রথমবারের বৈঠক ছিল বলে আমরা বিষয়টি মেনে নিয়েছিলাম। প্রত্যাশা ছিল, দ্বিতীয় বৈঠকে অন্তত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
তবে দ্বিতীয় বৈঠকেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি বলেন, আজকের বৈঠকেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এজেন্ডা ছিল। এর মধ্যে আগের বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামোগত সংস্কার এবং কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার পরপরই সরকারদলীয় কয়েকজন সদস্য বৈঠক দ্রুত শেষ করার কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, অর্থমন্ত্রী আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক ছিলেন। এনবিআরের কর্মকর্তারাও আলোচনায় আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কয়েকজন সদস্য বারবার বৈঠক সংক্ষিপ্ত করার কথা বলায় কোনো এজেন্ডাই পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। এমনকি কোনো এজেন্ডাতেই দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে কথা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই আলোচনা হয়নি। শেষ পর্যন্ত মিটিং শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রত্যেকটি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।
বৈঠকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও রাজস্ব আদায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, সরকার চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে এমন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
হাসনাত বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান বাড়ছে না। জ্বালানি-সংকটের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জন করা হবে, এনবিআরের কাছে তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আমরা এনবিআরের কাছে জানতে চেয়েছি, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাস্তবসম্মত কৌশল কী? কোন প্রক্রিয়ায় তারা এই রাজস্ব সংগ্রহ করবে?
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এনবিআরের উপস্থাপনায় বিদ্যমান করদাতাদের ওপর করের চাপ আরও বাড়ানোর বিষয়টি বেশি দেখা গেছে। কিন্তু নতুন করদাতা তৈরি এবং করের আওতা বাড়ানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত কাঠামো বা রূপরেখা পাওয়া যায়নি। যাঁরা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন, তাঁদের ওপর আবার করের বোঝা চাপানোর বদলে কীভাবে করের আওতা বাড়ানো যায়, নতুন করদাতাদের কীভাবে করের আওতায় আনা যায় এ বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে কর পরিশোধের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলেও জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কর দেওয়ার জন্য বারবার এনবিআর কার্যালয়ে যেতে হবে এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়। বন্দর, ব্যাংক ও এনবিআরের মধ্যে তথ্যের সরাসরি আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা গেলে কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হবে।
হাসনাত বলেন, এখনো এনবিআর, ব্যাংক ও বন্দরের মধ্যে বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানে চিঠিপত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাসে সময় বেড়ে যায়। পাঁচ দিনে যে পণ্য খালাস হওয়ার কথা, তা অনেক সময় দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত আটকে থাকে বলে তিনি দাবি করেন। পোর্ট, ব্যাংক ও এনবিআরের মধ্যে রিয়েল-টাইম ডেটা এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থা করা দরকার। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যাতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমে আসে।
তিনি আরও বলেন, বন্দরগুলোতে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় পণ্য আটকে থাকলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত জাহাজভাড়া ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। এতে কেউ কেউ নিয়মের বাইরে গিয়ে দ্রুত পণ্য খালাসের চেষ্টা করতে পারেন। কমলাপুরের কনটেইনার ডিপোর কার্যকারিতা বাড়ানোর বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান হাসনাত। পাশাপাশি কাস্টমসে আটকে থাকা কনটেইনার দ্রুত খালাসের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমাদের কাস্টমসে ৪৫ হাজারের বেশি আমদানি, রপ্তানি ও এমটি কনটেইনার ঝুলে রয়েছে। এগুলো দ্রুত খালাস এবং পুরো প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করার বিষয়ে আমরা প্রস্তাব দিয়েছি।
এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ও বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব কর্মকর্তার পর্যাপ্ত যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না থাকার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের সময় তাঁদের হয়রানি ও হামলার শিকার হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে এনবিআর কী পদক্ষেপ নেবে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত না করে কার্যকরভাবে পরিচালনার আহ্বান জানান হাসনাত আবদুল্লাহ। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যদি সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জায়গা না হয়ে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়, তাহলে এসব কমিটির সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিকে সরকারদলীয় কিছু সদস্য ‘অলংকারিক কমিটি’ হিসেবে দেখছেন। প্রতিবারই প্রস্তুতি না থাকার কথা, সময়ের অভাব কিংবা অন্য বৈঠক থাকার অজুহাত দেখিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একটা কমিটির বৈঠক যদি এভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে সেটি আমাদের জন্য দুঃখজনক। আমরা চাই প্রতিটি বৈঠক গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হোক, যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে পর্যাপ্ত সময় ধরে আলোচনা হোক এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
হাসনাত আরও বলেন, সংসদে গঠিত অন্যান্য কমিটির ক্ষেত্রেও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে দুটি বৈঠকের পর আর নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে না এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সরকারদলীয় সদস্যরা নিজেদের মতো করে নিচ্ছেন। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর না করা হলে সংসদীয় জবাবদিহির উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। সরকারের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা, প্রশ্ন তোলা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য এসব কমিটিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















