শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু জিপিএ-৫ অর্জন বা ভালো ফলাফল নয়; বরং শিক্ষার্থীদের আদর্শ ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড মিলনায়তনে ‘এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার বৃদ্ধি ও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, “জিপিএ-৫ পাওয়া কিংবা ভালো ফলাফল একজন শিক্ষার্থীকে শুধু একটি সার্টিফিকেট দিতে পারে। কিন্তু প্রকৃত মানুষ হতে হলে আদর্শ ও নৈতিকতার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে হবে।”
এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী ফেল করলে তার দায়ভার শুধু ওই শিক্ষার্থীর নয়। শিক্ষক, অভিভাবকসহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থারও এর দায় রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী একা ফেল করেনি, বরং পুরো সিস্টেমই ফেল করেছে।
তিনি বলেন, অকৃতকার্যের হার কমাতে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বাস্তবিক অর্থে মোটিভেট করবেন। প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের সমস্যা চিহ্নিত করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মূল দায়িত্ব শিক্ষকদের।
ড. সায়মা বলেন, একজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে ফেল করার অর্থ তার শিক্ষার ভিত্তি বা ফাউন্ডেশনে কোথাও সমস্যা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে কেন সমাধান করা হয়নি, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। ক্লাস ওয়ান থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী কীভাবে উঠে এলো, অথচ তার মৌলিক দুর্বলতা দূর হলো না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “টোটাল সিস্টেমটাই পরিবর্তন করে গোড়া থেকে শিক্ষার্থীদের বেসিক শক্ত করতে হবে। তাদের মধ্যে শিক্ষার প্রকৃত অর্থ জাগিয়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।”
দেশের আর্থসামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদক, কিশোর গ্যাংসহ নানা সামাজিক সমস্যায় তরুণ প্রজন্ম জর্জরিত। এসব সমস্যা মোকাবিলায় শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ মনে করলে হবে না। সে কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের খোঁজ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামাজিক আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
শিক্ষার্থীদের দুর্বল ফলাফলের সমাধান হিসেবে শুধু অতিরিক্ত ক্লাসের ওপর নির্ভর না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এক্সট্রা ক্লাসই একমাত্র সমাধান নয়। কোনো শিক্ষার্থী প্রথম ক্লাসেই বিষয়টি বুঝতে না পারলে কেন বুঝতে পারেনি, তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। একই পদ্ধতিতে বারবার ক্লাস নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিক্ষকদের গতানুগতিক পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে।
তিনি বলেন, সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে অকৃতকার্যের হার বেশি। নির্দিষ্ট এ দুটি বিষয়ে কেন শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে, তার কারণ চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষকদের উদ্দেশে ড. সায়মা বলেন, “আপনারা আগামী এক বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। সামনে যারা পরীক্ষা দেবে, তাদের নিয়ে এখন থেকেই কাজ করুন। শিক্ষার্থীদের বেসিক জায়গাগুলো শক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিন। দেখবেন, ফলাফল ভালো হবে ইনশাআল্লাহ।”
তিনি শিক্ষকদের শুধু জিপিএ-৫ অর্জনের লক্ষ্যে পাঠদান না করে আদর্শ, নীতি ও নৈতিকতার সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহসান পারভেজের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বোর্ডের সচিব অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক শফিকুর রহমান। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অধ্যাপক সিপন মিয়া।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পাপিয়া আক্তার ও উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক কাজী আপন তিবরানী।
পরে বিকেলে নগরীর গুলবাগিচা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস।
আব্দুর রহমান সাঈফ, কুমিল্লা 




















