*একাধিক ফ্ল্যাট-প্লটসহ শত কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ
*জুলাই আন্দোলনে অর্থ জোগানের অভিযোগ
*গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলার আসামি
*নারীঘটিত নানা অভিযোগ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মুদ্রাক্ষরিক মো. আক্তার হোসেনকে ঘিরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রভাব বিস্তার, সম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলেন। সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান ও খালেদ মাহমুদের বিশেষ সহযোগী হিসেবেও তিনি প্রভাব বিস্তার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অর্থসহ বিভিন্ন সামগ্রী সরবরাহ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের জন্য তৎকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। অভিযোগকারীদের দাবি, সে সময় তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পেতেন না।
বর্তমানে আক্তার হোসেন বিআইডব্লিউটিএর শিমুলিয়া অফিসে কর্মরত থাকলেও তার নেতৃত্বে বিআইডব্লিউটিএ ভবনে আবারও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আক্তার হোসেন বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রযোজ্য বিধিবিধানের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সাংঘর্ষিক হলেও তার বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিআইডব্লিউটিএর এই প্রভাবশালী কর্মচারীর উত্থান আওয়ামী লীগের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের হাত ধরে বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিআইডব্লিউটিএতে নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। নারীঘটিত নানা অভিযোগও তাকে ঘিরে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আক্তার হোসেনের নিজ জেলা রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ডিউপাড়া এলাকায় একরের পর একর কৃষিজমি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর মুগদার মদিনাবাগ ময়লার ভাঙার এলাকায় কোটি টাকা মূল্যের একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এছাড়া আশুলিয়া মডেল টাউনে তার ২০ কাঠার একটি প্লট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক শত কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এসবের বাইরে তার নামে-বেনামে আরও বিপুল সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা থেকে বাঁচতে এসব সম্পদের বড় একটি অংশ আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নামে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এদিকে আক্তার হোসেন কোটি টাকা মূল্যের ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাফেরা করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৭ বছরে বিআইডব্লিউটিএতে যেসব ঠিকাদার কাজ করেছেন, তাদের কাছ থেকে আক্তার হোসেন চাহিদা অনুযায়ী ৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিতেন। অন্যদিকে লাভের অংশীদারত্বের ভিত্তিতেও নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কমিশন বাণিজ্যের রফাদফা করতে তাকে রাজধানীর বিভিন্ন নামিদামি রেস্টুরেন্টে নিয়মিত বৈঠক করতে দেখা যেত বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কমিশন ও অন্যান্য অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ অভিযোগ সামনে আসার পর গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সহযোগিতা ও অর্থ সরবরাহের অভিযোগে আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে রাজধানীর মুগদা, যাত্রাবাড়ীসহ কয়েকটি থানায় হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআইডব্লিউটিএর কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ওই সময়ে আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে যারা মুখ খোলার চেষ্টা করেছেন, তাদের লাঞ্ছিত করে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. আক্তার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আক্তার হোসেনকে ঘিরে নারীঘটিত নানা অভিযোগও সামনে এসেছে। বিআইডব্লিউটিএর মাওয়া নদীবন্দর অফিসের মুদ্রাক্ষরিক মো. আক্তার হোসেনকে নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় জনতার হাতে আটকের একটি ঘটনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগকারী ও অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে প্রথমে ফোন নম্বর আদান-প্রদান করতেন আক্তার হোসেন। এরপর সুন্দরী ও আর্থিকভাবে দুর্বল নারীদের কোটিপতি বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর শুরু হতো ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাৎ ও আড্ডা। কোনো কোনো নারীকে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং আইফোন দেওয়ার প্রস্তাব বা উপহার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার কাউকে প্রিমিও জি মডেলের প্রায় ৪০ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি উপহার দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদনে ‘শিলা’ নামে ২২ বছর বয়সী এক নারীর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একদিন শিলার ফোন থেকে ভুলবশত আক্তার হোসেনের নম্বরে একটি মিসকল যায়। এরপর দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়।
কিছুদিন পর চাকরির কথা বলে শিলাকে ঢাকার একটি বাসায় নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ভয়ভীতি দেখানো এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ঢাকায় এনে বিভিন্ন বাসায় নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শিলাকে বিয়ে করবেন—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার বাসায় মাঝেমধ্যে রাত যাপন করতেন আক্তার হোসেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একপর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় শিলার বাসায় স্থানীয়রা আক্তার হোসেনকে আপত্তিকর অবস্থায় আটক করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়রা ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ভিডিওতে আক্তার হোসেনকে ক্ষমা চাইতে এবং নিজের ভুল হয়েছে বলতে শোনা যায়। সেখানে তিনি তার স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে এবং তার স্ত্রী একজন সরকারি চাকরিজীবী—এমন কথাও বলেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। একইসঙ্গে শিলাকে বিয়ে করবেন বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু শিলা নয়, মানিয়া, তানিয়া, ফারিয়াসহ আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে আক্তার হোসেনের সম্পর্কের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি বিআইডব্লিউটিএতে কর্মরত কয়েকজন সহকর্মীর বোনও তার কথিত ঘনিষ্ঠতার আওতায় পড়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর বর্ণনায় একটি অভিন্ন প্রবণতার কথা বলা হয়েছে—প্রথমে আস্থা ও নির্ভরতার পরিবেশ তৈরি করা, পরে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো। অভিযোগ রয়েছে, পারিবারিক সংকট, দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ কিংবা আর্থিক অনিশ্চয়তার মতো পরিস্থিতিতে থাকা নারীদের টার্গেট করা হতো।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত সহানুভূতি, সহযোগিতা ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা হতো। পরে সেই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে তাদের নিজের প্রভাববলয়ের মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হতো।
তবে বিআইডব্লিউটিএর পার্সেস ডিপার্টমেন্টের উচ্চমান সহকারী সিনথিয়া আক্তার হোসেনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, তিনি বিবাহিত এবং আক্তার হোসেনের সঙ্গে শুধু চাকরির সূত্রে পরিচয়। তবে আক্তার হোসেন তার বাসায় আসা-যাওয়া করেন এবং তার বোনের সঙ্গে আক্তার হোসেনের পরিচয় রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা তিনি জানেন না বলেও জানান।
নারীদের ফাঁদে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. আক্তার হোসেন। তার দাবি, এসব অভিযোগ ষড়যন্ত্রের অংশ।
চাষাড়ায় আটকের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনাটি সত্য। তবে শিলা তার খুব কাছের বলে স্বীকার করেছেন।
উলঙ্গ ভিডিও প্রসঙ্গে আক্তার হোসেন বলেন, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তি তিনি নিজেই। তবে ওই ঘটনা সম্পর্কে তার ভাষ্য, এর পেছনে নানা ঘটনা রয়েছে এবং তিনি পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত বলবেন।
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, মামলা, সম্পদের তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















