গ্যাস সরবরাহ কমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি; শিল্প, আবাসিক ও সিএনজি খাতে চরম দুর্ভোগ
২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকে দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে লোডশেডিং বেড়েছে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা, আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার রাত ১টার দিকে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। ফলে একপর্যায়ে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট। দিনের বিভিন্ন সময়েও বিদ্যুতের ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি ছিল।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি। প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। তবে টার্মিনালের অক্ষত অংশ চলতি সপ্তাহেই চালু করা সম্ভব হলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি পেট্রোবাংলার এবং অন্যটি সামিটের মালিকানাধীন হলেও উভয়টিই পরিচালনা করে এক্সিলারেট এনার্জি। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট থেকে কমে ২১০-২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট।
দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। ফলে সংকট মোকাবিলায় আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজি—সব খাতেই গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন গ্রাহকদের তীব্র স্বল্পচাপের মুখে থাকতে হবে।
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও শুক্রবার তা নেমে আসে প্রায় ৬৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি।
এদিকে কয়লাভিত্তিক ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ফলে রাজধানীর তুলনায় জেলা ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি দেখা যাচ্ছে।
গ্যাসের অভাবে ঢাকার রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, মগবাজার, মোহাম্মদপুর ও আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না। অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলা ও রাইস কুকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় সময় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকাসহ শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো কারখানা সক্ষমতার মাত্র ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এনে ইতোমধ্যে মহেশখালীতে পৌঁছানো হয়েছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় প্রকৌশলীরাও মেরামতকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অক্ষত অংশটি চালু হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
এতে বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি লোডশেডিংও কমে আসতে পারে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
আবু হেনা মোহাম্মদ আসিফ, মহেশখালী প্রতিনিধি 


















