ঢাকা ০৩:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী ৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা ডিএসসিসির ঘোড়াশাল প্রকল্পে ৪,৭৫৮ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ ‘শৃঙ্খলিত পুলিশ, নিরাপদ ভোলা’ মাস্টার প্যারেডে পুলিশ সুপারের কঠোর বার্তা চাঁদাবাজির মামলায় বিএনপি নেতা আলমগীর মালতিয়া কারাগারে, পরিবারের দাবি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা মানুষ আমাকে কোনো পুরুষের সঙ্গে দেখতে চায় না: পরীমণি ভারতের ওপর ১০০ শতাংশ কর বসানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র মানবপাচার ও অনলাইন স্ক্যাম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৫ দিনেও মেলেনি বিচার, প্রতারণার অভিযোগে হতাশায় ফাতেমা আক্তারের পরিবার নওগাঁর দয়ালের মোড়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল এক শিক্ষকের
কাজ শেষের আগেই ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধ

ঘোড়াশাল প্রকল্পে ৪,৭৫৮ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ

ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করেই প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন এবং সরকারের অডিট বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।

সারের চাহিদা মেটাতে ও আমদানি নির্ভরশীলতা কমাতে ২০১৮ সালে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

ব্যয় বেড়েছে ৪৮ শতাংশ
২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। তখন মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৫ হাজার ৩৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়। মেয়াদও ২ বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে ৫৩ শতাংশ, ব্যয় বাড়ে ৪৮ শতাংশ।

তারপরও কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। পরে মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও পুরো কাজ এখনও শেষ হয়নি।

আইএমইডি বলছে, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মূল পরিকল্পনার তুলনায় এই ৬ বছরের বাড়তি সময়কে প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

৩০ অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টির নিষ্পত্তি হলেও ৩০টি এখনও অনিষ্পন্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অডিটে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৭ টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে অডিট আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৩ ডলার এবং ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ ৫ হাজার ইয়েন।।

অডিটে সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠেছে প্রকল্পের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন।

এই উৎপাদন ঘাটতিসংক্রান্ত ২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার অডিট আপত্তি এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলেও নিরীক্ষা বিভাগ সন্তুষ্ট না হওয়ায় পুনরায় জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানায় প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। কোল কনভেয়ার বেল্ট ছিঁড়ে যাওয়া, পাওয়ার ফেইলিওর ও স্ট্রিপার লিক হওয়ার মতো ঘটনায় বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যন্ত্রপাতি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকল্পের মূল প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন ও যোগসাজশের মাধ্যমে প্রায় ৭৩ কোটি ডলার এবং ৩ হাজার ৩০০ কোটি ইয়েনের একটি সমন্বিত টেন্ডার সাধারণ ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবাসিক ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণেও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্যাকেজ-ডব্লিউ-১-এ প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে বাদ দেয় মূল্যায়ন কমিটি। এরপর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে ৩ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ২৮৮ টাকায় চুক্তি করা হয়।

অডিট প্রতিবেদনে পুরো প্রক্রিয়াটিকে কোলিউসিভ প্র্যাকটিস বা পারস্পরিক যোগসাজশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্যাকেজ ডব্লিউ-২-তেও একই ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্য একটি কোম্পানিকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে পরিশোধ করা হয় ৩২৭ কোটি টাকার বিল

প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ১৩৪ কোটি জাপানি ইয়েন পরিশোধ করা হয়।

এ ছাড়া কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদারকে ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৩৬ টাকা, প্রকৃত কাজ না করে ৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৮১ টাকা এবং লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিন স্থাপন ছাড়া ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ ডলার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এই খাতে টাকা, ডলার ও ইয়েনে পরিশোধিত অঙ্ক একত্রে বর্তমান বাজারদরে রূপান্তর করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অঙ্ক হিসাব করা হয়েছে। তবে লেনদেনগুলো ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত পরিশোধের সময়কার বিনিময় হার ভিন্ন থাকতে পারে।

অতিরিক্ত বিল পরিশোধ
ড্রয়িং ও ডিজাইনের চেয়ে অতিরিক্ত মাটি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৮৩ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকৃত কাজের বাইরে কয়েক দফায় যথাক্রমে ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৪০৪ টাকা, ৩১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯২ টাকা এবং ৮ লাখ ২২ হাজার ৪৬৫ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

চুক্তি লঙ্ঘন করে ঠিকাদারকে ১০৪ কোটি ৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২৫০ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মান যথাযথভাবে নিশ্চিত না করেই কার্যাদেশ দিয়ে ১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে বিধি লঙ্ঘন করে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) ১ কোটি ৯৯ লাখ ৩ হাজার ৮৯৫ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের ট্রাক ইয়ার্ড নির্মাণের পরও ঠিকাদারকে ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৪৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

পিপিআর লঙ্ঘন করে ও যোগসাজশের মাধ্যমে সরঞ্জাম কেনা এবং পেমেন্ট বাবদ যথাক্রমে ৭৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৪০ টাকা এবং ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯৯ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

পরিবেশ ও সামাজিক তদারকি কাজের প্রমাণ ছাড়াই ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৫ টাকা। সিপিটিইউয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে পরিশোধ করা হয়েছে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৯৭৩ টাকা।

ঠিকাদারের দাবিকৃত পোর্ট ও শিপিং এজেন্ট ডিটেনশন চার্জ বাবদ ১ কোটি ৮৭ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৩ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

প্রকল্পের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। পরামর্শক সংস্থার চুক্তিতে না থাকা ব্যক্তির বিপরীতে ৯৮ লাখ ৩১ হাজার ৯৯৫ টাকা প্রদান এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই পরামর্শক পরিবর্তনের জন্য ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৩৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

নির্মাণসামগ্রী সিলবিহীন অবস্থায় পরীক্ষার জন্য ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। ডিপোজিট ওয়ার্ক সেক্টর থেকে রেললাইন স্থাপনের জন্য রেলওয়েকে ২১৫ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে তিতাস গ্যাসকে মেরামত কাজের জন্য দেওয়া হয়েছে ৪৯ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সংশোধিত এডিপির বাজেট বরাদ্দের বাইরে প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫৪০ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কোনো সমঝোতা স্মারক ছাড়াই রেলওয়েকে ৫০ কোটি টাকা এবং ক্যাপিটাল ব্লক অ্যালোকেশন থেকে গ্যাস বিল বাবদ তিতাস গ্যাসকে ২০৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। তিতাস গ্যাসকে আরএমএস নির্মাণের জন্য কোনো বিস্তারিত এস্টিমেট ছাড়াই দেওয়া হয়েছে আরও ১৯ কোটি টাকা।

ডিপিপি ও আরডিপিপিতে কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে কর্মকর্তাদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি বাবদ কয়েক দফায় দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এই ব্যয়কে নিরীক্ষা বিভাগ প্রকল্পের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে পুনরায় জবাব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন শুরুর পরও প্রকল্পের টাকা থেকে ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার গ্যাস বিল দেওয়া হয়েছে, যা কারখানার নিজস্ব আয় থেকে হওয়ার কথা ছিল।

আরডিপিপি বহির্ভূতভাবে প্রায় ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রকল্প তদারকির জন্য ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি জিপ ও ১০টি মাইক্রোবাসসহ মোট ৪০টি যানবাহন কেনা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে আইএমইডি প্রশ্ন তুলেছে।

বিভিন্ন বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কম কাটার কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের সময় ভ্যাট ও আয়কর কম কাটায় সরকারের ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫৮ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তিতাস গ্যাসকে দেওয়া অগ্রিমের ওপর ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য অর্জিত সুদ কোষাগারে জমা না দেওয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিরীক্ষায় পাওয়া অধিকাংশ গুরুতর অনিয়ম এখনও অনিষ্পন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা বিভাগের প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।

আইএমইডি ও অডিট বিভাগ থেকে এসব অনিয়ম দূর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

নিম্নমানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা ঝুঁকি
আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রকল্পের আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বেশ কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। আবাসন প্রকল্পের দেয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক দালান নির্মাণের অনুপযোগী। ইটের আকৃতি সঠিক না হওয়ায় দেয়ালের গাঁথুনি মসৃণ হয়নি।

বিভিন্ন স্থাপনার ঢালাইয়ে অসাবধানতার কারণে ছিদ্র দেখা দিয়েছে। আবাসিক ভবনের ভেতরে টাইলস লাগানো ও ফিনিশিং কাজের মানও সন্তোষজনক নয়।
নির্মাণাধীন স্কুল ও কলেজ ভবনের বারান্দার রেলিংয়ের উচ্চতা নিয়েও ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। রেলিংয়ের উচ্চতা কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমইডি।

উচ্চতা ৩৬ ইঞ্চি থেকে বাড়িয়ে ৪২ ইঞ্চি করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিকদের হেলমেট, গামবুট বা মাস্কের মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে জমি ব্যবহারে অদূরদর্শিতার তথ্য উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য ৪৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ সরকারি জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে।

এর পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণ করলে জায়গা সাশ্রয় হতো এবং ভবিষ্যতে কারখানা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকত। কারখানা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় গোডাউন, ব্যাগিং অফিস ও ব্রিজ স্কেলের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল না, যা পরে আলাদাভাবে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উৎপাদিত সারের ৪০ শতাংশ রেলপথে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও রেললাইন নির্মাণে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্ধারিত ঠিকাদার কাজ না করায় চুক্তি বাতিল হয়েছে, ফলে সার বিতরণে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে।

এত অনিয়মের মধ্যেও দেশের প্রথম গ্রিন ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট হিসেবে পরিচিত এই কারখানায় সার উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে চালুর পর থেকে কারখানাটি প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ‘ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট’ দেওয়া এবং ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘এমন কিছু ঘটেনি।’

মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি জানান, প্রকল্পের একটি অংশ রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে চুক্তিভিত্তিক (ডিপোজিটরি) কাজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই অংশের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রজেক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া আবাসন খাতের কাজও কিছু বাকি আছে। আনুমানিক ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।

মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের ১ জুলাই যখন এই প্রকল্পের কমিশনিং সম্পন্ন হয়, তখন আমি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। অথচ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের অক্টোবরে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী

কাজ শেষের আগেই ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধ

ঘোড়াশাল প্রকল্পে ৪,৭৫৮ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:৪৯:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ শেষ না করেই প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন এবং সরকারের অডিট বিভাগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।

সারের চাহিদা মেটাতে ও আমদানি নির্ভরশীলতা কমাতে ২০১৮ সালে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

ব্যয় বেড়েছে ৪৮ শতাংশ
২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। তখন মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ৪৬০ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় ৫ হাজার ৩৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়। মেয়াদও ২ বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়। এতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ে ৫৩ শতাংশ, ব্যয় বাড়ে ৪৮ শতাংশ।

তারপরও কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। পরে মেয়াদ আরও ২ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হলেও পুরো কাজ এখনও শেষ হয়নি।

আইএমইডি বলছে, রেললাইনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় পুরো প্রকল্প শেষ হতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মূল পরিকল্পনার তুলনায় এই ৬ বছরের বাড়তি সময়কে প্রকল্পের অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

৩০ অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন
আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৬৮টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টির নিষ্পত্তি হলেও ৩০টি এখনও অনিষ্পন্ন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অডিটে আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৪ হাজার ৭৫৮ কোটি ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৭ টাকা। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে অডিট আপত্তিকৃত অর্থের পরিমাণ ৭৪ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬৩ ডলার এবং ৩ হাজার ৪৩৪ কোটি ৯২ লাখ ৫ হাজার ইয়েন।।

অডিটে সবচেয়ে বড় আপত্তি উঠেছে প্রকল্পের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ ১৪ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন।

এই উৎপাদন ঘাটতিসংক্রান্ত ২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার অডিট আপত্তি এখনও অনিষ্পন্ন রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জবাব দিলেও নিরীক্ষা বিভাগ সন্তুষ্ট না হওয়ায় পুনরায় জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানায় প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। কোল কনভেয়ার বেল্ট ছিঁড়ে যাওয়া, পাওয়ার ফেইলিওর ও স্ট্রিপার লিক হওয়ার মতো ঘটনায় বাণিজ্যিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। যন্ত্রপাতি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে যান্ত্রিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকল্পের মূল প্ল্যান্ট স্থাপনের ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন ও যোগসাজশের মাধ্যমে প্রায় ৭৩ কোটি ডলার এবং ৩ হাজার ৩০০ কোটি ইয়েনের একটি সমন্বিত টেন্ডার সাধারণ ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবাসিক ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণেও পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্যাকেজ-ডব্লিউ-১-এ প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে বাদ দেয় মূল্যায়ন কমিটি। এরপর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে ৩ কোটি ৬০ লাখ ২০ হাজার ২৮৮ টাকায় চুক্তি করা হয়।

অডিট প্রতিবেদনে পুরো প্রক্রিয়াটিকে কোলিউসিভ প্র্যাকটিস বা পারস্পরিক যোগসাজশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্যাকেজ ডব্লিউ-২-তেও একই ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্য একটি কোম্পানিকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে পরিশোধ করা হয় ৩২৭ কোটি টাকার বিল

প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার এবং ১৩৪ কোটি জাপানি ইয়েন পরিশোধ করা হয়।

এ ছাড়া কাজ সম্পাদন না করেই ঠিকাদারকে ৩৪ লাখ ১৯ হাজার ৩৩৬ টাকা, প্রকৃত কাজ না করে ৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৮১ টাকা এবং লোকোমোটিভ বা রেল ইঞ্জিন স্থাপন ছাড়া ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৩১৩ ডলার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এই খাতে টাকা, ডলার ও ইয়েনে পরিশোধিত অঙ্ক একত্রে বর্তমান বাজারদরে রূপান্তর করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অঙ্ক হিসাব করা হয়েছে। তবে লেনদেনগুলো ২০১৮ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত পরিশোধের সময়কার বিনিময় হার ভিন্ন থাকতে পারে।

অতিরিক্ত বিল পরিশোধ
ড্রয়িং ও ডিজাইনের চেয়ে অতিরিক্ত মাটি ভরাটের জন্য ঠিকাদারকে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮৮৩ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে। প্রকৃত কাজের বাইরে কয়েক দফায় যথাক্রমে ৪৬ লাখ ১৫ হাজার ৪০৪ টাকা, ৩১ লাখ ৭৯ হাজার ১৯২ টাকা এবং ৮ লাখ ২২ হাজার ৪৬৫ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

চুক্তি লঙ্ঘন করে ঠিকাদারকে ১০৪ কোটি ৭৬ লাখ ২৯ হাজার ২৫০ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর মান যথাযথভাবে নিশ্চিত না করেই কার্যাদেশ দিয়ে ১৯ কোটি ৪৯ লাখ ৬৪ হাজার ৫৫২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে বিধি লঙ্ঘন করে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) ১ কোটি ৯৯ লাখ ৩ হাজার ৮৯৫ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্নমানের ট্রাক ইয়ার্ড নির্মাণের পরও ঠিকাদারকে ৮৯ লাখ ৩৩ হাজার ২৪৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

পিপিআর লঙ্ঘন করে ও যোগসাজশের মাধ্যমে সরঞ্জাম কেনা এবং পেমেন্ট বাবদ যথাক্রমে ৭৮ লাখ ১৬ হাজার ৫৪০ টাকা এবং ৮ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯৯ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

পরিবেশ ও সামাজিক তদারকি কাজের প্রমাণ ছাড়াই ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৫ টাকা। সিপিটিইউয়ের নীতিমালা লঙ্ঘন করে পরিশোধ করা হয়েছে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৯৭৩ টাকা।

ঠিকাদারের দাবিকৃত পোর্ট ও শিপিং এজেন্ট ডিটেনশন চার্জ বাবদ ১ কোটি ৮৭ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৩ টাকার অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে।

প্রকল্পের অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। পরামর্শক সংস্থার চুক্তিতে না থাকা ব্যক্তির বিপরীতে ৯৮ লাখ ৩১ হাজার ৯৯৫ টাকা প্রদান এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই পরামর্শক পরিবর্তনের জন্য ৪ লাখ ৬১ হাজার ৫৩৮ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

নির্মাণসামগ্রী সিলবিহীন অবস্থায় পরীক্ষার জন্য ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। ডিপোজিট ওয়ার্ক সেক্টর থেকে রেললাইন স্থাপনের জন্য রেলওয়েকে ২১৫ কোটি ২৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা অনিয়মিতভাবে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে তিতাস গ্যাসকে মেরামত কাজের জন্য দেওয়া হয়েছে ৪৯ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

সংশোধিত এডিপির বাজেট বরাদ্দের বাইরে প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫৪০ কোটি ৩৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কোনো সমঝোতা স্মারক ছাড়াই রেলওয়েকে ৫০ কোটি টাকা এবং ক্যাপিটাল ব্লক অ্যালোকেশন থেকে গ্যাস বিল বাবদ তিতাস গ্যাসকে ২০৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। তিতাস গ্যাসকে আরএমএস নির্মাণের জন্য কোনো বিস্তারিত এস্টিমেট ছাড়াই দেওয়া হয়েছে আরও ১৯ কোটি টাকা।

ডিপিপি ও আরডিপিপিতে কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও অবৈধভাবে কর্মকর্তাদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি বাবদ কয়েক দফায় দেওয়া হয়েছে ৪ কোটি ২৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এই ব্যয়কে নিরীক্ষা বিভাগ প্রকল্পের আর্থিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে পুনরায় জবাব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।

তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে বাণিজ্যিকভাবে সার উৎপাদন শুরুর পরও প্রকল্পের টাকা থেকে ৩৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার গ্যাস বিল দেওয়া হয়েছে, যা কারখানার নিজস্ব আয় থেকে হওয়ার কথা ছিল।

আরডিপিপি বহির্ভূতভাবে প্রায় ১৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় হেলিপ্যাড নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে প্রকল্প তদারকির জন্য ৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি জিপ ও ১০টি মাইক্রোবাসসহ মোট ৪০টি যানবাহন কেনা হয়েছে, যার যৌক্তিকতা নিয়ে আইএমইডি প্রশ্ন তুলেছে।

বিভিন্ন বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর কম কাটার কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের সময় ভ্যাট ও আয়কর কম কাটায় সরকারের ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫৮ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। তিতাস গ্যাসকে দেওয়া অগ্রিমের ওপর ব্যাংক সুদ ও অন্যান্য অর্জিত সুদ কোষাগারে জমা না দেওয়ায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে।

আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিরীক্ষায় পাওয়া অধিকাংশ গুরুতর অনিয়ম এখনও অনিষ্পন্ন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা বিভাগের প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি।

আইএমইডি ও অডিট বিভাগ থেকে এসব অনিয়ম দূর করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

নিম্নমানের অবকাঠামো, নিরাপত্তা ঝুঁকি
আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদনে প্রকল্পের আবাসন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বেশ কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। আবাসন প্রকল্পের দেয়াল নির্মাণে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে, যা আধুনিক দালান নির্মাণের অনুপযোগী। ইটের আকৃতি সঠিক না হওয়ায় দেয়ালের গাঁথুনি মসৃণ হয়নি।

বিভিন্ন স্থাপনার ঢালাইয়ে অসাবধানতার কারণে ছিদ্র দেখা দিয়েছে। আবাসিক ভবনের ভেতরে টাইলস লাগানো ও ফিনিশিং কাজের মানও সন্তোষজনক নয়।
নির্মাণাধীন স্কুল ও কলেজ ভবনের বারান্দার রেলিংয়ের উচ্চতা নিয়েও ঝুঁকি চিহ্নিত হয়েছে। রেলিংয়ের উচ্চতা কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমইডি।

উচ্চতা ৩৬ ইঞ্চি থেকে বাড়িয়ে ৪২ ইঞ্চি করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এ ছাড়া নির্মাণকাজ চলাকালে শ্রমিকদের হেলমেট, গামবুট বা মাস্কের মতো প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি।

আইএমইডির প্রতিবেদনে জমি ব্যবহারে অদূরদর্শিতার তথ্য উঠে এসেছে। কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য ৪৯টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ সরকারি জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে।

এর পরিবর্তে বহুতল ভবন নির্মাণ করলে জায়গা সাশ্রয় হতো এবং ভবিষ্যতে কারখানা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকত। কারখানা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় গোডাউন, ব্যাগিং অফিস ও ব্রিজ স্কেলের মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল না, যা পরে আলাদাভাবে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উৎপাদিত সারের ৪০ শতাংশ রেলপথে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও রেললাইন নির্মাণে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। নির্ধারিত ঠিকাদার কাজ না করায় চুক্তি বাতিল হয়েছে, ফলে সার বিতরণে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে।

এত অনিয়মের মধ্যেও দেশের প্রথম গ্রিন ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট হিসেবে পরিচিত এই কারখানায় সার উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালে চালুর পর থেকে কারখানাটি প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখছে।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারকে ‘ফাইনাল এক্সেপ্টেন্স সার্টিফিকেট’ দেওয়া এবং ৩২৭ কোটি টাকার বিল পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘এমন কিছু ঘটেনি।’

মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি জানান, প্রকল্পের একটি অংশ রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে চুক্তিভিত্তিক (ডিপোজিটরি) কাজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এই অংশের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রজেক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া আবাসন খাতের কাজও কিছু বাকি আছে। আনুমানিক ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।

মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের ১ জুলাই যখন এই প্রকল্পের কমিশনিং সম্পন্ন হয়, তখন আমি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। অথচ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের অক্টোবরে।