ঢাকা ০৫:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কুমিল্লা লাকসামে ইয়াবা ও মাদকসামগ্রীসহ ৩ যুবক আটক ডিএসইর বাজার মূলধন কমলো সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার বড় চ্যালেঞ্জ: তথ্যমন্ত্রী শাপলা চত্বর মামলা : আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা সোমবার দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও ৬ মাসের বেতন পেলেন আ.লীগ নেত্রী ৩০ দিন এক টুকরা আদা খেলেই মিলবে চমকে দেওয়া উপকারিতা মধ্যরাতে জনপ্রিয় স্ট্রিমার স্পিডের বিশ্বরেকর্ড ভাঙলেন মোদি ১৯ বছরেই বাবা হচ্ছেন এনদ্রিক, জন্মের আগেই ছেলের নাম রাখা হলো ‘কেন্দ্রিক’ রাষ্ট্রপতি দলীয় নাকি বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত বিএনপির বৈঠকে : মির্জা ফখরুল বিগত সরকারের সীমাহীন অনিয়মে স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও ৬ মাসের বেতন পেলেন আ.লীগ নেত্রী

দীর্ঘদিন মাদরাসায় অনুপস্থিত থেকেও এক সহকারী অধ্যাপকের সহযোগিতায় ছয় মাসের বেতন পেয়েছেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পলাতক আওয়ামী যুব মহিলা লীগের নেত্রী শাহনাজ বিউটি। অভিযুক্ত শাহনাজ বিউটি উপজেলার ভাংনী আদমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির সভানেত্রী।

জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করা, নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, শিক্ষাগত সনদে অসংগতির অভিযোগ এবং অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বিস্তারিত জানতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তর, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট মাদরাসার বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে শাহনাজ বিউটির নিয়োগ, চাকরির অবস্থা, বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, শাহনাজ বিউটি ২০০৩ সালের ১ মার্চ ভাংনী আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তার নিয়োগের আগে ২০০২ সালের আগস্টে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং নির্ধারিত ফলাফলের শর্ত উল্লেখ ছিল। তবে তার স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফল তৃতীয় বিভাগ হওয়ায় তৎকালীন যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

আরও জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর শাহনাজ বিউটি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর থেকে তিনি নিয়মিত মাদরাসায় ক্লাস নিতেন না। বরং বেতন উত্তোলনের সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তার কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আসতেন। ফলে ইংরেজি বিভাগের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সময় তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ২০২৩ সালে নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর। ওই বছর শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে গভর্নিং বডি প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দুটি পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও শাহনাজ বিউটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদে অসংগতি, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ আটটি বিষয় উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গভর্নিং বডি তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহনাজ বিউটির বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্যও নথিতে পাওয়া গেছে। একটি মামলায় তাকে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এবং অন্যটিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামি করা হয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শাহনাজ বিউটি এক দিনের জন্য মাদরাসায় যান বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেদিন তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই চলে যাওয়ার সময় অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষক তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ জানান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তিনি অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাবেক অধ্যক্ষসহ কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শাহনাজ বিউটির নামে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের বেতন ছয় মাস বন্ধ থাকে। এ দিকে বেতনের জন্য সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করলে, জরুরি ভিত্তিতে বেতন-ভাতা প্রদানের আদেশ প্রদান করেন আদালত। এ সময় সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম আওয়ামী লীগ নেত্রী শাহনাজ বিউটির সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন শিটে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে নাম দাখিল করে তার ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন।

একদিকে দ্বৈত বেতন শিটের মাধ্যমে জালিয়াতি করে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়, অপরদিকে সেই সময়টিতে তাকে বিনা বেতনের ছুটিতে দেখানো হয়। তবে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্তাবলি-২০২৩ অনুযায়ী চিকিৎসা বা শিক্ষাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ‘বিনাবেতনের ছুটি’ অনুমোদনের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে শাহনাজ বিউটির ক্ষেত্রে সেই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বর্তমান অধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোহাম্মদ জাকারিয়া গণমাধ্যমকে জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি শাহনাজ বিউটিকে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তা না করে উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পরও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বেতন ও বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যার কারণে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা ও প্রশাসনিক— উভয় ক্ষেত্রেই সংকটে পড়েছে। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অন্যদিকে সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শাহনাজ বিউটির ছয় মাসের বেতন এবং পরবর্তী ছুটির বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা) জ্ঞাতসারেই সম্পন্ন হয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাসহ অন্যান্য কারণে তাকে ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েন হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ওই মাদরাসাটির সভাপতি রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম স্যার। মাদ্রাসার বেতন-ভাতাসহ সার্বিক বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি দেখভাল করে থাকেন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এডিসি (শিক্ষা) স্যারকে এ বিষয়ে কমপ্লেইন করলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অভিযোগ পেলে আমি নিজে পরিদর্শনে যাব।

এ বিষয়ে বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম জানান, শাহনাজ বিউটিকে ছয় মাসের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার দায়িত্বকালে হয়নি। তবে শাহনাজ বিউটির দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তার জানা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত কীভাবে তাকে ধারাবাহিকভাবে ‘বিনা বেতনের ছুটিতে’ দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তার ভাষ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর চিকিৎসাজনিত আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল; এর আগের সময়ের বিষয়ে তিনি অবগত নন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুমিল্লা লাকসামে ইয়াবা ও মাদকসামগ্রীসহ ৩ যুবক আটক

দীর্ঘদিন পালিয়ে থেকেও ৬ মাসের বেতন পেলেন আ.লীগ নেত্রী

আপডেট সময় ০৪:৩১:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন মাদরাসায় অনুপস্থিত থেকেও এক সহকারী অধ্যাপকের সহযোগিতায় ছয় মাসের বেতন পেয়েছেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পলাতক আওয়ামী যুব মহিলা লীগের নেত্রী শাহনাজ বিউটি। অভিযুক্ত শাহনাজ বিউটি উপজেলার ভাংনী আদমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির সভানেত্রী।

জানা গেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করা, নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন, শিক্ষাগত সনদে অসংগতির অভিযোগ এবং অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

বিস্তারিত জানতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তর, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট মাদরাসার বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব নথিতে শাহনাজ বিউটির নিয়োগ, চাকরির অবস্থা, বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত একাধিক তথ্য উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, শাহনাজ বিউটি ২০০৩ সালের ১ মার্চ ভাংনী আহমদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তার নিয়োগের আগে ২০০২ সালের আগস্টে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং নির্ধারিত ফলাফলের শর্ত উল্লেখ ছিল। তবে তার স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফল তৃতীয় বিভাগ হওয়ায় তৎকালীন যোগ্যতার শর্ত পূরণ করেছিলেন কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

আরও জানা গেছে, ২০০৮ সালের পর শাহনাজ বিউটি সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে যুব মহিলা লীগের রংপুর মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আসেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর থেকে তিনি নিয়মিত মাদরাসায় ক্লাস নিতেন না। বরং বেতন উত্তোলনের সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তার কাছে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে আসতেন। ফলে ইংরেজি বিভাগের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সময় তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ২০২৩ সালে নতুন অধ্যক্ষ দায়িত্ব গ্রহণের পর। ওই বছর শিক্ষার্থীরা লিখিতভাবে অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ায় তাদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে গভর্নিং বডি প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে দুটি পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও শাহনাজ বিউটির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এরপর বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত কমিটি নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদে অসংগতি, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ আটটি বিষয় উল্লেখ করে তাকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করে। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গভর্নিং বডি তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। পরদিন দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আর কর্মস্থলে ফিরে আসেননি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাহনাজ বিউটির বিরুদ্ধে দুটি মামলার তথ্যও নথিতে পাওয়া গেছে। একটি মামলায় তাকে হামলা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এবং অন্যটিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসামি করা হয়েছে। তবে এসব মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলছে।

এর মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শাহনাজ বিউটি এক দিনের জন্য মাদরাসায় যান বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেদিন তিনি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর না করেই চলে যাওয়ার সময় অধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষক তাকে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার অনুরোধ জানান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। পরে তিনি অধ্যক্ষসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় সাবেক অধ্যক্ষসহ কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়। পরবর্তীতে মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শাহনাজ বিউটির নামে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো কমিটি না থাকায় প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের বেতন ছয় মাস বন্ধ থাকে। এ দিকে বেতনের জন্য সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম হাইকোর্টে রিট করলে, জরুরি ভিত্তিতে বেতন-ভাতা প্রদানের আদেশ প্রদান করেন আদালত। এ সময় সহকারী অধ্যাপক আকরামুল ইসলাম আওয়ামী লীগ নেত্রী শাহনাজ বিউটির সাময়িক বরখাস্ত ও দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিতির তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন শিটে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে নাম দাখিল করে তার ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করে দেন।

একদিকে দ্বৈত বেতন শিটের মাধ্যমে জালিয়াতি করে ছয় মাসের বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করা হয়, অপরদিকে সেই সময়টিতে তাকে বিনা বেতনের ছুটিতে দেখানো হয়। তবে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরির শর্তাবলি-২০২৩ অনুযায়ী চিকিৎসা বা শিক্ষাসংক্রান্ত নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ‘বিনাবেতনের ছুটি’ অনুমোদনের বিধান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে শাহনাজ বিউটির ক্ষেত্রে সেই বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বর্তমান অধ্যক্ষ আবু ছালেহ মোহাম্মদ জাকারিয়া গণমাধ্যমকে জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি শাহনাজ বিউটিকে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু তা না করে উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার পরও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে বেতন ও বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যার কারণে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা ও প্রশাসনিক— উভয় ক্ষেত্রেই সংকটে পড়েছে। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অন্যদিকে সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আকরামুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শাহনাজ বিউটির ছয় মাসের বেতন এবং পরবর্তী ছুটির বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (শিক্ষা) জ্ঞাতসারেই সম্পন্ন হয়েছে। তার দাবি, বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাসহ অন্যান্য কারণে তাকে ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

রংপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েন হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, ওই মাদরাসাটির সভাপতি রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম স্যার। মাদ্রাসার বেতন-ভাতাসহ সার্বিক বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি দেখভাল করে থাকেন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এডিসি (শিক্ষা) স্যারকে এ বিষয়ে কমপ্লেইন করলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অভিযোগ পেলে আমি নিজে পরিদর্শনে যাব।

এ বিষয়ে বর্তমান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) শরিফুল ইসলাম জানান, শাহনাজ বিউটিকে ছয় মাসের বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত তার দায়িত্বকালে হয়নি। তবে শাহনাজ বিউটির দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তার জানা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত কীভাবে তাকে ধারাবাহিকভাবে ‘বিনা বেতনের ছুটিতে’ দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তার ভাষ্য, দায়িত্ব গ্রহণের পর চিকিৎসাজনিত আবেদনের ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য ছুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল; এর আগের সময়ের বিষয়ে তিনি অবগত নন।