ঢাকায় নিজের একটি বাড়ি নির্মাণ অনেকের কাছে আজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে রাজউকের নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরের অনুমতি নিতে চরম ভোগান্তি, দীর্ঘসূত্রতা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের মুখে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। নিয়ম মেনে আবেদন করলেও অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস ফাইল আটকে থাকে, আর অনিয়মের পথে হাঁটলেই দ্রুত মেলে কাঙ্ক্ষিত সেবা। এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে রাজউকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী বিপুল সম্পদের মালিকও হয়েছেন।
এদেরই একজন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক সাধারণ স্টেট পরিদর্শক ফারুক হোসেন মালুম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ক্ষমতা ও টাকার জোরে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী থেকে প্রমোশন পেয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর স্টেট পরিদর্শক হন। পদমর্যাদা ও বেতনকাঠামো অনুযায়ী তার বড়জোড় একটি মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে তার সম্পদের খতিয়ান রূপকথাকেও হার মানায়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির আলাদিনের চেরাগে ভর করে ফারুক হোসেন মালুম এবং তার পরিবারের সদস্যরা এখন রাজধানীর অভিজাত এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক দোকানের মালিক।
গুলশান ও উত্তরার মতো ভিআইপি এলাকায় একাধিক আলিশান বাড়ি ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে এই ফারুক হোসেন মালুমের। সরকারি সামান্য বেতনের চাকরিতে থেকে কীভাবে তিনি এতো সম্পদের মালিক হলেন তা নিয়ে খোদ রাজউকের ভেতরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশান-১ এলাকার ২১ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাড়ির ১/বি নম্বর বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি ফারুক হোসেনের মালিকানাধীন। শুধু গুলশানই নয়, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরে ছড়িয়ে আছে তার স্থাবর সম্পত্তি। উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িটি ফারুক হোসেনেরই নিজস্ব সম্পত্তি। একই এলাকার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ৫৫ নম্বর বাড়িতে রয়েছে তার ও তার পরিবারের মালিকানাধীন চারটি ফ্ল্যাট। এছাড়া উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাড়িটির একক মালিকও রাজউকের এই পরিদর্শক। পূর্বাচলে রয়েছে প্লট; যদিও ফারুক হোসেনের দাবি এটি ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে পেয়েছেন।
ফ্ল্যাট ও বাড়ির পাশাপাশি ফারুক হোসেন মালুম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও বড় বিনিয়োগ রয়েছে। খোদ রাজউক ট্রেড সেন্টারেই তার ও তার পরিবারের নামে রয়েছে একাধিক বাণিজ্যিক দোকান। এর মধ্যে মার্কেটটির ১৮ এবং ৩৮ নম্বর দোকান দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একজন সাধারণ পরিদর্শক পদের কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে রাজধানীর বুকে এমন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেন, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউকের আবাসন প্রকল্প, নকশা অনুমোদন এবং উচ্ছেদ সংক্রান্ত নানা কাজে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমেই এই অর্থ কামিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ফারুক হোসেন মালুম ২০০০ সালে রাজউকে নিম্নমান সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক পদে ওয়ার্কচার্জড হিসেব কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৬ সালে তার চাকরি নিয়মিতকরণ করা হয়। ২০১৩ সালের শেষের দিকে উচ্চমান সহকারী হিসেবে পদোন্নতি পান এবং সর্বশেষ ৫ আগস্ট এর পট পরিবর্তনের পর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখনই মাঠে নামা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে ফারুক হোসেন মালুম বলেন, উত্তরা ৫৫ নম্বর বাড়ির চারটি ফ্ল্যাট এবং পূর্বাচলের প্লট ছাড়া বাকি সম্পদ তার না।
স্টেট ও ভূমি ১ এর পরিচালক ডাঃ মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ফারুক হোসেন মালুমের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ থাকলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















