ময়মনসিংহে বদলি ও সাময়িক বরখাস্তের পরও সাভারে প্রভাব বজায় রেখে লাইসেন্স নবায়ন, নিয়োগে অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ; একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম। নিজস্ব প্রতিবেদক: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা-২ (সাভার) এলাকার সাবেক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর রেজায়ে রাব্বিকে ঘিরে আবারও গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে ২০২৬ সালের ২ জুলাই অধিদপ্তরের ৩৯৯ স্মারকে তাকে তৃতীয়বারের মতো সাময়িক বরখাস্ত করে একই তারিখে প্রশাসনিক কারণে ৮৮৬১/ক(৪৩) স্মারকে ময়মনসিংহ-৮-এ বদলি করা হলেও তিনি এখনো ঢাকায় অবস্থান করে আগের মতোই বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহে নামমাত্র যোগদান করার পর রেজায়ে রাব্বি সম্পূর্ণ সুস্থ থেকেও মেডিকেল ছুটি নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। এরপর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদে ঢাকা-২ (সাভার) এলাকায় ফায়ার লাইসেন্স নবায়নের নামে শিল্প কল-কারখানা থেকে অবৈধ অর্থ আদায় এবং চলমান নিয়োগ কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজায়ে রাব্বিকে বরখাস্ত করা হলেও তার চাহিদা অনুযায়ী ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর হাসিবুর রহমান দিপু আকন্দকে লোক দেখানোভাবে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে অদ্যবধি সাভার জোনের ফায়ার লাইসেন্স কার্যক্রম এখনো রেজায়ে রাব্বির নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই কার্যক্রমে ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর দিপু আকন্দ, সাভার ফায়ার স্টেশনের লিডার ভোজন এবং কমিউনিটি ভলেন্টিয়ার সাদ্দাম হোসেন সহযোগিতা করছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিদিন সংগ্রহ করা অবৈধ এসব অর্থ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র রেজায়ে রাব্বির কথিত এক চাচাতো ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচালক শহীদ আতাহার হোসেন এবং সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহকারী পরিচালক, ঢাকা এই পদটি। যার অধীনে রাজধানী ঢাকা জেলাসহ জোনভুক্ত অঞ্চল তথা (ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদি জেলা) এর মত গুরুত্বপূর্ণ জেলার দায়িত্বে বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠ বিবেচনায় কাজী নাজমুজ্জামানকে এই পদে পদায়ন করা হয়। যিনি সাবেক মন্ত্রী আব্দুল সামাদ আজাদের নিকট আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। অভিযোগে বলা হয় বাহিনীতে তিনি শারীরিকভাবে আনফিট হওয়া সত্ত্বেও তাকে বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তৎকালীন সময়ে খুনি হাসিনা সরকার পদায়ন প্রদান করেন। সর্বশেষ তিনি গত ২৬ মার্চ প্যারেড গ্রাউন্ডের কমান্ডারের দায়িত্বে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক মনোনীত করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জনিত বিষয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় নিরাপত্তা বাহিনী ও ডিজিএফআই এর নিরাপত্তা পাশ প্রদান না করায় প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাকি দিয়ে এই কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিদিনই প্রধানমন্ত্রীসহ ভিআইপিদের অগ্নি নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনা ঘটার পূর্বেই দেশের সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়া একান্ত জরুরী বলে বাহিনীর সচেতন কর্মকর্তা/কর্মচারীগন মনে করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরায় এসব কার্যক্রম দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে বাহিনীর সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
রেজায়ে রাব্বির অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও অভিযোগে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, এর আগেও তিনি একাধিকবার শৃঙ্খলাভঙ্গ ও নারী সহকর্মীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন যার স্মারক নং ৯৯৫/১ তারিখ ০৯/১২/২০১৫। এছাড়া ২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের সময়ে জরুরী অবস্থা চলাকালীন সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে ছাত্র গণহত্যার সাথে জড়িত থাকার ও অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অধিদপ্তরের ৩৯৯ নং স্মারক তারিখ ০৫/০৯/২০২৪ তারিখে ৩০/২৪ নং আদেশে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, বর্তমান মহাপরিচালক (ডিজি) জাহেদ কামাল দায়িত্ব গ্রহণের পর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পদায়ন, বিতর্কিত-সুবিধাভোগী ও আওয়ামীদের বহালসহ পুনর্বাসন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকার সকল গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে অতীতের ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে, ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অপরদিকে বাহিনীতে শৃঙ্খলা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে রেজায়ে রাব্বি, মহাপরিচালক, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) শহীদ আতাহার হোসেন, ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর হাসিবুর রহমান দিপু আকন্দ, ঢাকার সরকারী পরিচালক, কাজী নজমুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















