আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর বর্তমান নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদের বিরুদ্ধে একাই বিভিন্ন পদ দখল, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অসঙ্গতি এবং সিনিয়র বিজ্ঞানীদের অবমূল্যায়নের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বৈশ্বিক সুনামের অধিকারী এই আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রশাসনিক ও আর্থিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অথচ ড. তাহমিদ আহমেদ ২০২১ সালের ১ মার্চ আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির ৬০ বছরের ইতিহাসে প্রথম কোনো বাংলাদেশি নির্বাহী পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটিতে তার নিয়োগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়েছিল। কিন্তু ঘটেছে উল্টো। নানা অনিয়মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছেন ড. তাহমিদ আহমেদ। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সূত্র মতে, প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া চুক্তি সংস্থার (এসইএটিও) উদ্যোগে কলেরা মহামারির ওপর গবেষণা এবং তা মোকাবিলার জন্য এটি স্থাপন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের জুন মাসে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিডিডিআর,বি নামে তার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে।
আইসিডিডিআর,বি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং এটি পর্যায়ক্রমে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গৌরব হলো ডায়রিয়া চিকিৎসায় জীবনরক্ষাকারী খাবার স্যালাইন (ওআরএস)-এর সফল গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। অবশ্য ডায়রিয়া ছাড়াও পুষ্টিহীনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, সংক্রামক ব্যাধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বমানের গবেষণায় সুনাম রয়েছে।
ড. তাহমিদ আহমেদ ২০২১ সালের ১ মার্চ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক পদে বসেন। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরতরা এবং দেশের মানুষ উজ্জীবিত হয় আরো ভালো সেবা পাবেন এই ভেবে। কিন্তু আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক হওয়ার পর ড. তাহমিদ আহমেদের নেতৃত্ব নিয়ে প্রথম বড় প্রশ্ন ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে। উপনির্বাহী পরিচালকের পদ দীর্ঘদিন শূন্য রাখা হয়। অথচ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাঠামোয় এই পদ নির্বাহী পরিচালকের পাশে একটি পৃথক সিনিয়র নেতৃত্বের স্তর। প্রশাসন, অর্থ, মানবসম্পদ, গবেষণা প্রশাসন ও সরবরাহব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এর সঙ্গে যুক্ত। সেই পদ শূন্য থাকার মধ্যেই ড. তাহমিদ নির্বাহী পরিচালক হয়েও প্রায় ৩ বছর ৯ মাস নিউট্রিশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র পরিচালকের দায়িত্ব নিজের হাতে রাখেন। অর্থাৎ নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ, প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী স্তরটি ছিল অনুপস্থিত (তাহমিদ আহমেদ নিজেই এর দায়িত্বে)। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চারটি বৈজ্ঞানিক বিভাগের একটির নেতৃত্বও ছিল তাঁর নিজের কাছে। এক মাস বা ছয় মাস নয়, প্রায় চার বছর। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, এটি কি প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি কর্তৃত্ব ভাগ না করার প্রবণতা?
অবশ্য ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টি এখানেই শেষ নয়। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে প্রতিষ্ঠানটির হেলথ সিস্টেমস বিভাগে। ওই বিভাগের সিনিয়র পরিচালক নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রতিষ্ঠান ছাড়েন। প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অভিযোগ রয়েছে- ড. তাহমিদের নেতৃত্বের ধরন, ভিন্নমত গ্রহণে অনীহা এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে। যে কারণে অসন্তোষের সঙ্গে ওই কর্মকর্তার প্রস্থানের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরের সিদ্ধান্তটি ছিল স্পষ্ট। বিভাগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিনিয়র বিজ্ঞানী থাকা সত্ত্বেও ড. তাহমিদ নিজেই ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র পরিচালক হন। তাঁর মূল গবেষণা-পরিচয় পুষ্টিবিজ্ঞানকেন্দ্রিক হলেও তিনি হেলথ সিস্টেমস বিভাগের নেতৃত্বও নিজের হাতে নেন।
এদিকে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের অভিযোগের সঙ্গে এরপর যুক্ত হয় স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতের প্রশ্ন। সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র পরিচালকের আকস্মিক মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব দেওয়া হয় ড. তাহমিদের স্ত্রী ডা. সায়েরা বানুকে, যিনি নিজেও প্রতিষ্ঠানের একজন বিজ্ঞানী। এখানে অবশ্য ডা. সায়েরা বানুর বৈজ্ঞানিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন উঠেছে স্বার্থের সংঘাত নিয়ে। যদিও স্ত্রীকে সিনিয়র পরিচালকের পদে বসানোয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। পরে বাধ্য হয়ে এই পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
একই সময়ে লিগ্যাল, রিসার্চ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং কমিউনিকেশনস এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের তিনজন পছন্দের কর্মকর্তার জন্য পদোন্নতি নীতি পাশ কাটানোর অভিযোগও রয়েছে নির্বাহী পরিচালকের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের সুবিধা দিতে আগে নতুন উচ্চতর পদ তৈরি করা হয়, পরে তাঁদের সেই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর আগের পদগুলো বিলুপ্ত করা হয়। ফলে বিষয়টি সাধারণ পদোন্নতি ছিল না; বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য পদ তৈরি করে তাঁদের ওপরে তুলে দেওয়ার চেষ্টা, যা প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। কারণ আইসিডিডিআর,বিতে নন-সায়েন্টিফিক স্টাফদের পদোন্নতির জন্য কঠোর ও প্রতিযোগিতামূলক নীতি রয়েছে। সেই নীতি পাশ কাটিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের জন্য আলাদা পদ তৈরি করা, যা কেবল পক্ষপাত বা স্বজনপ্রীতি নয়; বরং প্রতিষ্ঠিত পদোন্নতি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুবিধা দেওয়ার স্পষ্ট উদাহরণ।
.
যদিও অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির বিতর্ক এখানেই শেষ নয়। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও পক্ষপাতের অভিযোগের মধ্যেই সামনে এসেছে তিনটি গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। প্রথমটি ড. তাহমিদের নিজের পরিবারের সুবিধা নিয়ে। তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর কন্যার যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার টিউশন ফি মেটাতে প্রতিষ্ঠান থেকে এমন একটি সুবিধা নেওয়া হয়েছে, যা মূলত বিদেশি নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত। অথচ আইসিডিডিআর,বিতে অন্য বাংলাদেশি নাগরিকও আন্তর্জাতিক পদে এবং সিনিয়র কর্মকর্তার কাজ করেছেন। কিন্তু তাঁরা একই সুবিধা পাননি। তাহলে ড. তাহমিদের ক্ষেত্রে কি নিয়ম বদলানো হয়েছিল? নাকি তাঁর জন্য বিশেষ ব্যতিক্রম তৈরি করা হয়েছিল?
দ্বিতীয় অভিযোগ তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একজন বিদেশি সহযোগীকে বিশেষ অনুরোধ করে একটি আমন্ত্রণপত্র সংগ্রহ করেন। সেই আমন্ত্রণপত্র দেখিয়ে আইসিডিডিআর,বির খরচে বিজনেস ক্লাসে যুক্তরাষ্ট্র যান। সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শিশু যক্ষ্মা’ বিষয়ে এক ঘণ্টার একটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক বা উপস্থাপনায় অংশ নেন। কিন্তু তিনি আররা কয়েক দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন, যেখানে তার কন্যা পড়াশোনা করেন। ফলে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী পরিচালক ব্যক্তিগত সফরকে প্রাতিষ্ঠানিক সফরের রূপ দিয়েছেন। অবশ্য এটি একবারের ঘটনা নয়; তার বিদেশ ভ্রমণে অন্য বিজ্ঞানীদের তুলনায় বেশি শিথিলতা দেখানো হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগটি আরো গুরুতর। করোনা মহামারির শুরুতে তৎকালীন উপনির্বাহী পরিচালক যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাজ করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তাঁর বেতন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হতো। তিনি বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ায় তার পে-রোল বিদেশি ব্যাংক হিসেবে নেওয়া গুরুতর আর্থিক অনিয়ম এবং অননুমোদিত অর্থ স্থানান্তর বা অর্থপাচারেরও অভিযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে ড. তাহমিদ আহমেদ তার ৪০ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনে আইসিডিডিআর’বিতে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করার জন্য নির্ভর করেছেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বর্তমান মানবসম্পদ উপদেষ্টা ড. মোশাররফ হোসেনের ওপর। ড. মোশাররফ দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সবসময় ড. তাহমিদের অনিয়মকে নিয়মে রূপান্তর করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। প্রয়োজনে নীতিমালা বা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতেও তিনি দ্বিধা করেননি।
অবশ্য এর ফলস্বরূপ ড. তাহমিদ তার প্রতি এতটাই কৃতজ্ঞ যে, চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ার পরও তিনি বিভিন্ন কৌশলে নীতি ও প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এনে ড. মোশাররফ হোসেনকে এখনো আইসিডিডিআর,বিতে মানবসম্পদ উপদেষ্টা হিসেবে ধরে রেখেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ড. তাহমিদ নির্বাহী পরিচালক হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে একক কর্তৃত্ব, অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আঁতুরঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তারা দ্রুত বোর্ড সদস্য, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং স্বাধীন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এসব অনিয়মের ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এসব অভিযোগের বিষয়ে বলেন, উপ-নির্বাহী পরিচালক পদ শূন্য ছিল সত্য, তবে এটি বোর্ডের সিদ্ধান্ত। বোর্ড এই পদে নিয়োগ দেয়, যা এখন প্রক্রিয়াধীন। নির্বাহী পরিচালক পদে থেকেও ৩ বছর ৯ মাস নিউট্রেশন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র পরিচালক পদে থাকাকে তিনি স্বার্থের দ্বন্দ্ব নয় বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বোর্ড এই পদে থাকতে বলেছে বলেই তিনি থেকেছেন। এছাড়া তার স্ত্রী ডা. ফাহমিদা চৌধুরীকে সংক্রামক রোগ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র পরিচালকের পদে বসানোর বিষয়ে ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এটা সত্য, কিছৃুদিন এই পদে তার স্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে সবকিছু আইসিডিডিআর,বির নীতি মেনেই করা হয়েছে, যা বেআইনি বা অনিয়ম করে করা হয়নি। এছাড়া সার্বিকভাবে অভিযোগগুলো অসত্য এবং ভ্রান্ত বলে উল্লেখ করেন ড. তাহমিদ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















