চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী ও চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় বৃদ্ধি, একাধিকবার মেয়াদ সম্প্রসারণ এবং ‘মূল্য সমন্বয়’ বাবদ অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের উদ্যোগ নিয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন মাহফুজুর রহমান এবং তার সিদ্ধান্তের কারণেই প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি ও একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সে সময় প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত যানবাহনের দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অনুমোদনের পর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং ম্যাক্স-র্যাঙ্কিন যৌথ কোম্পানির মধ্যে নির্মাণকাজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২০ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং বর্তমানে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য অনেকেই প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের দাবি, সময়মতো কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন তিনি। বরং সময় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন সংশোধনী ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমানে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এত বড় অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রণয়ন এবং তা অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া পরিচালনায় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মাহফুজুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সমালোচকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে ব্যয় বৃদ্ধির যে ধারা অনুসরণ করা হয়েছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিতর্কের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘মূল্য সমন্বয়’ বা প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্টের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আর্থিক কারণ দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-র্যাঙ্কিনকে অতিরিক্ত ১৯৩ কোটি টাকা প্রদানের একটি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থ প্রদানের উদ্যোগের পেছনেও প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণেই মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা যেত, তাহলে এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের প্রয়োজন হতো না। ফলে প্রকল্পের বিলম্ব এবং মূল্য সমন্বয়ের দাবিকে একই সূত্রে গাঁথা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক সূত্রের অভিযোগ, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির সিদ্ধান্তগুলো ছিল পরিকল্পিত এবং এর মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার পথ তৈরি করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি এবং সময় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার মধ্যে যথেষ্ট অসঙ্গতি রয়েছে।
সিডিএর অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্রের মতে, প্রকল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মাহফুজুর রহমান অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। নির্মাণকাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন, সময় বৃদ্ধি সংক্রান্ত সুপারিশ, ব্যয় সংশোধনের প্রস্তাব এবং মূল্য সমন্বয় সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলোতে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও কার্যকর তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়নি সংশ্লিষ্টদের। সমালোচকদের ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগাযোগের কারণে বিভিন্ন অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়নি। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো বিচারিক বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে এখন পর্যন্ত মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে দায় প্রমাণিত হয়নি।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শুরুতে ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল। পরে আরও কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। এ সময়ের মধ্যে ব্যয়ও বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যদি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তবিক প্রতিবন্ধকতাই মূল কারণ হয়ে থাকে, তাহলে শুরু থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা ও তদারকি কেন নিশ্চিত করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যে কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে যখন ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকা বৃদ্ধি পায় এবং প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক বছর বাড়ানো হয়, তখন সেই সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়ে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হিসেবে সিডিএর ওপর জনসাধারণের ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল। কারণ, চট্টগ্রাম নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার সমাধানে এই প্রকল্পকে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এখন প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, প্রকল্প পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ এবং আর্থিক প্রভাব সম্পর্কে জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। ফলে ব্যয় বৃদ্ধি ও মূল্য সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রকল্প পরিচালক হিসেবে মাহফুজুর রহমানের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, ব্যয় বৃদ্ধি, মেয়াদ সম্প্রসারণ এবং ১৯৩ কোটি টাকার মূল্য সমনয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পর্কিত সব নথি ও সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
তারা আরও দাবি করেন, প্রকল্পটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর একটি স্বাধীন নিরীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন। এতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ, সময় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা এবং মূল্য সমন্বয়ের দাবির ভিত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
অন্যদিকে, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছেন যে, বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নানা ধরনের বাস্তব সমস্যা দেখা দেয়। ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, নকশা পরিবর্তন, বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবের কারণে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এসব দাবি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি এসব কারণই প্রকল্প বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধির জন্য দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে কেন প্রকল্পের শুরুতেই ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি। তাদের মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো প্রকল্পটির সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জনগণের অর্থে পরিচালিত এমন একটি বৃহৎ প্রকল্পের প্রতিটি সিদ্ধান্তের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। ব্যয় বৃদ্ধি, মেয়াদ সম্প্রসারণ এবং মূল্য সমন্বয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেওয়া হলে অনেক প্রশ্নেরই অবসান ঘটতে পারে।
বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার পাশাপাশি ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির বিষয়ে ওঠা অভিযোগগুলোরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তাদের মতে, প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে এবং জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নেরও উত্তর মিলবে।
এ বিষয়ে জানার জন্য মাহফুজুর রহমানকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















