বাগেরহাটের রামপালে সংঘটিত হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর–কনেসহ ১৪ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে অনুষ্ঠিত হয় নিহত আবদুর রাজ্জাক সরদারের পরিবারের ৯ সদস্যের জানাজা। বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠিত এ জানাজায় শোকাভিভূত হাজারো মানুষ অংশ নেন। স্বজন হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।
জানাজার নামাজে ইমামতি করেন মোংলা ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. রুহুল আমিন। এতে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট–৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, বাগেরহাট–২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মঞ্জুরুল হক (রাহাদ), বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাছান চৌধুরী, মোংলা সার্কেলের বর্তমান সহকারী পুলিশ সুপার রেফাতুল ইসলাম সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।
জানাজার আগে নিহত আবদুর রাজ্জাক সরদারের বড় ছেলে আশরাফুল আলম (জনি) উপস্থিত মানুষের উদ্দেশে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“আমার আর কিছুই রইল না। বাবা, ভাই, বোন, স্ত্রী ও সন্তান-সবাই চলে গেল একসাথে। এটিই হয়তো আল্লাহর ফয়সালা। আপনারা সবাই তাদের জন্য দোয়া করবেন।”
তার এই হৃদয়বিদারক আর্তনাদে উপস্থিত মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। মুহূর্তেই জানাজার মাঠজুড়ে নেমে আসে গভীর শোকের আবহ।
জানাজার আগে নিহত ৯ জনের মরদেহের খাটিয়া পাশাপাশি রাখা হয়। এরপর দাফনের জন্য মরদেহগুলো মোংলা সরকারি কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একই স্থানে পাশাপাশি কবরস্থ করা হয় তাদের।
মোংলা কবরস্থানের খাদেম মো. মুজিবুর ফকির বলেন,
“১৭ বছর ধরে এই কবরস্থানে দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু কখনো একই পরিবারের এতজন সদস্যের জন্য একসাথে কবর খুঁড়তে হয়নি। ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক।”
এদিকে একই দুর্ঘটনায় নিহত কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার বোন ও দাদির জানাজা খুলনার কয়রা উপজেলার নকশা গ্রামে সকালে অনুষ্ঠিত হয়। জুমার নামাজের পর কনের নানির জানাজা শেষে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। অন্যদিকে মাইক্রোবাসচালকের জানাজা বেলা ১১টায় রামপালে অনুষ্ঠিত হয়ে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক সরদারের ছোট ছেলে আহাদুর রহমানের (ছাব্বির) বিয়ে হয়।
বিয়ের আনন্দঘন পরিবেশ শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে নববধূসহ বরযাত্রীরা কয়রা থেকে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেন। বর–কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে যাত্রা করছিলেন।
মোংলার নিকটবর্তী বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার বেলাইবিজ এলাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। নিহতদের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে দুই শিশুর বয়স দুই বছরেরও কম। দুর্ঘটনায় আহত একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন,
“এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক একটি দুর্ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নিহত পরিবারের খোঁজ নিয়েছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।”
নতুন জীবনের সূচনার আনন্দময় মুহূর্তে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ হলো এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। একটি পরিবারের হাসি-আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিল গভীর শোকের নিস্তব্ধতায়, যার বেদনাবিধুর স্মৃতি দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াবে পুরো জনপদ।
শেখ সাগর আহমেদ রামপাল বাগেরহাট 





















