ঢাকা ১২:১২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
গোপালগঞ্জে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে পিতার জানাজায় আওয়ামী লীগ নেতা  নগর গুলিস্তান স্টপওভার বাস-মিনিবাস টার্মিনাল শ্রমিক পরিচালনা কমিটির পরিচিতি সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত গাজায় ধসে পড়া ভবনের নিচ থেকে ১৯ মরদেহ উদ্ধার দাম বাড়ানোর পর দেশে আজ সোনার ভরি কত? কক্সবাজারের মাতারবাড়ী পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী বেরোবির শিক্ষার্থীদের ‘দরিচা’, বিহারি নারীদের দক্ষতায় খুলছে সম্ভাবনার নতুন জানালা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে সরকারকে ৩ মাসের আল্টিমেটাম চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় জাল টাকা তৈরির কারখানায় র‍্যাব-৫ এর অভিযান আটক ২  পঞ্চগড়ে ২৬৪-এর নবনির্বাচিত কমিটিকে সংবর্ধনা রোববার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে যাবেন প্রধানমন্ত্রী

নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল ও ইলিয়াস সিন্ডিকেটের দুর্নীতির শতকোটি টাকার ফাইল দুদকের জালে

রাজধানীর আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে গৃহীত ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা এখন ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, যা কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির নীল নকশাকে উন্মোচিত করে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর প্রকল্পের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম এবং বর্তমানে সিলেটে কর্মরত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট পিপিআর-২০০৮ এবং এর সংশোধিত বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পকেটস্থ করছে প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ। এই সিন্ডিকেটের দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সৎ ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তারা, যার ফলে আবাসন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘কালো ফান্ড’ তৈরি করা হয়েছে। এই ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম ধরা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ বর্তমানে সিলেটে বদলি হলেও ঢাকার আজিমপুর প্রকল্পের মূল ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখনো তার হাতেই। নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম কেবল তার আজ্ঞাবহ হিসেবে প্রতিটি ফাইলের কমিশন নিশ্চিত করছেন। এমনকি প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয় করে তা সিন্ডিকেটের পকেটে ভরা হয়েছে।

মাস্টাররোলে কর্মরত শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় গত এক মাসে দুজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ডেস্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

এই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আজিমপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সাথে সরাসরি কথা বললে তিনি এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পেশাগত প্রতিহিংসার ফসল। আমি নিয়মের বাইরে এক পয়সাও খরচ করিনি। ইলিয়াস সাহেবের সাথে আমার যোগাযোগ কেবল দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে, অন্য কিছু নয়। যারা কাজ না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই এই অপপ্রচার চালাচ্ছেন।” অন্যদিকে সিলেটে কর্মরত ইলিয়াস আহমেদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এই প্রকল্পের চলমান অরাজকতা নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি দুদককে হস্তান্তর করা হবে।

এই মহাদুর্নীতির আঁচ লেগেছে নীতিনির্ধারক মহলেও। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, “অনিয়ম নিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল আছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রকল্পের সকল ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট তলব করেছি। পিপিআর লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রমাণ মিললে সেই টেন্ডার বাতিল করা হবে।”

এদিকে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার আগেই যেন ফয়সাল ও ইলিয়াস সিন্ডিকেটের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, কারণ তাদের মাধ্যমে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে বিদেশে পাচারের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। আজিমপুর আবাসন প্রকল্পের এই ‘হরিলুট’ থামানো না গেলে তা কেবল একটি অবকাঠামোগত ব্যর্থতা হবে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের পথে একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে পিতার জানাজায় আওয়ামী লীগ নেতা 

নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল ও ইলিয়াস সিন্ডিকেটের দুর্নীতির শতকোটি টাকার ফাইল দুদকের জালে

আপডেট সময় ০৪:২৯:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

রাজধানীর আজিমপুরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন নিশ্চিত করতে গৃহীত ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা এখন ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনের পর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য, যা কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরির নীল নকশাকে উন্মোচিত করে।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের আজিমপুর প্রকল্পের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম এবং বর্তমানে সিলেটে কর্মরত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট পিপিআর-২০০৮ এবং এর সংশোধিত বিধিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পকেটস্থ করছে প্রকল্পের সিংহভাগ বরাদ্দ। এই সিন্ডিকেটের দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সৎ ঠিকাদার ও সাধারণ কর্মকর্তারা, যার ফলে আবাসন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই লিফট, জেনারেটর এবং ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম আমদানির নামে প্রায় ১২০ কোটি টাকার একটি বিশেষ ‘কালো ফান্ড’ তৈরি করা হয়েছে। এই ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের মালামাল ক্রয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে বাজারদরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম ধরা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদ বর্তমানে সিলেটে বদলি হলেও ঢাকার আজিমপুর প্রকল্পের মূল ‘রিমোট কন্ট্রোল’ এখনো তার হাতেই। নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম কেবল তার আজ্ঞাবহ হিসেবে প্রতিটি ফাইলের কমিশন নিশ্চিত করছেন। এমনকি প্রকল্পের ৮৩৬টি ফ্ল্যাটের ফিনিশিং কাজের জন্য নিম্নমানের টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রী ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা সাশ্রয় করে তা সিন্ডিকেটের পকেটে ভরা হয়েছে।

মাস্টাররোলে কর্মরত শ্রমিকদের ভুয়া তালিকা দেখিয়ে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলায় গত এক মাসে দুজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ডেস্ক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।

এই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে আজিমপুর প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিমের সাথে সরাসরি কথা বললে তিনি এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পেশাগত প্রতিহিংসার ফসল। আমি নিয়মের বাইরে এক পয়সাও খরচ করিনি। ইলিয়াস সাহেবের সাথে আমার যোগাযোগ কেবল দাপ্তরিক কাজের প্রয়োজনে, অন্য কিছু নয়। যারা কাজ না পেয়ে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই এই অপপ্রচার চালাচ্ছেন।” অন্যদিকে সিলেটে কর্মরত ইলিয়াস আহমেদের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এই প্রকল্পের চলমান অরাজকতা নিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি দুদককে হস্তান্তর করা হবে।

এই মহাদুর্নীতির আঁচ লেগেছে নীতিনির্ধারক মহলেও। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, “অনিয়ম নিয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল আছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রকল্পের সকল ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট তলব করেছি। পিপিআর লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রমাণ মিললে সেই টেন্ডার বাতিল করা হবে।”

এদিকে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার আগেই যেন ফয়সাল ও ইলিয়াস সিন্ডিকেটের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়, কারণ তাদের মাধ্যমে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে বিদেশে পাচারের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। আজিমপুর আবাসন প্রকল্পের এই ‘হরিলুট’ থামানো না গেলে তা কেবল একটি অবকাঠামোগত ব্যর্থতা হবে না, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের পথে একটি বড় কলঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।