রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-কে ঘিরে আবারও টেন্ডার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আলেমুল বাসার। স্থানীয় একাধিক ঠিকাদার ও অভিযোগকারী সূত্রের দাবি, ধোলাই, স্টেশনারি ও খাদ্য সরবরাহ সংক্রান্ত ই-টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়মবহির্ভূতভাবে কার্যাদেশ প্রদান, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করা এবং প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, ই-জিপি প্রক্রিয়ায় তার কোনো হাত নেই। তবুও স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগকারী স্থানীয় ঠিকাদার মোঃ সুলতান মাহমুদ ডায়েল লিখিতভাবে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি প্রকাশিত ই-টেন্ডারে তিনি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে বিবেচিত হন। সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী সর্বনিম্ন গ্রহণযোগ্য দরদাতাকেই কার্যাদেশ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, টেকনিক্যাল মূল্যায়ন এবং আর্থিক প্রস্তাবের সব শর্ত পূরণ করার পরও অজ্ঞাত কারণে তাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়নি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ধোলাই কাজের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা বাঁধন ট্রেডার্সকে উপেক্ষা করে তৃতীয় অবস্থানে থাকা সানি লন্ডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে স্টেশনারি সরবরাহের ক্ষেত্রেও সর্বনিম্ন দরদাতা মেধা কনস্ট্রাকশনকে বাদ দিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় ছিল এবং সেই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ডাঃ আলেমুল বাসার।
স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ “ম্যানেজমেন্ট খরচ” হিসেবে দিতে হয়—এমন একটি অলিখিত ধারণা বহুদিন ধরেই প্রচলিত। তাদের অভিযোগ, যেসব প্রতিষ্ঠান এই অর্থ দিতে রাজি হয় না বা সমঝোতায় আসে না, তারা নানা অজুহাতে কাজ থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখনো প্রকাশ্য কোনো নথি বা প্রমাণ সামনে আসেনি, তবুও স্থানীয় ঠিকাদার মহলে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
ডাঃ আলেমুল বাসার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ই-জিপি সিস্টেম কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সেখানে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। তার দাবি, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ ও বিধি অনুযায়ীই কার্যাদেশ দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “ই-জিপি প্রক্রিয়ায় আমার কোনো ব্যক্তিগত ভূমিকা নেই। সব কিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে।” তবে অভিযোগকারীরা বলছেন, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার আড়ালে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব খাটানো হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত করা হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর স্থানীয়রা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রত্যাশা করছেন।
এটি এই প্রথম নয় বলে অভিযোগকারীরা উল্লেখ করেছেন। ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরেও টেন্ডার কার্যক্রম নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় রাজনৈতিক প্রভাবে মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয় মহলে আলোচনা ছিল। যদিও সে অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি। ফলে নতুন করে ওঠা অভিযোগ পুরোনো ক্ষতকেই যেন উসকে দিয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, ডাঃ আলেমুল বাসার দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এই সময়ে তার আর্থিক অবস্থার দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে এই দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট সম্পদ বিবরণী বা সরকারি কোনো অনুসন্ধান প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধি বলেন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার কথা। কিন্তু যদি সেখানে প্রভাব, পক্ষপাত বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করে না, বরং জনসেবার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বাস্থ্য খাতের মতো স্পর্শকাতর খাতে দুর্নীতির অভিযোগ আরও উদ্বেগজনক।
একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, ই-জিপি প্রক্রিয়ায় কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব, টেন্ডার কমিটির সুপারিশ—সব কিছু নথিভুক্ত থাকে। তাই যদি প্রকৃতপক্ষে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করা হয়ে থাকে, তাহলে কাগজপত্র পর্যালোচনা করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, অভিযোগকারীদের উচিত সংশ্লিষ্ট সব নথি সংরক্ষণ করে যথাযথ দপ্তরে জমা দেওয়া।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের একাংশের মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিরুৎসাহিত হয়। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারি সেবা গ্রহণকারী সাধারণ মানুষ। কারণ নিম্নমানের সরবরাহ বা সেবার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এদিকে, অভিযোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ দ্রুত দুদকের তদন্ত দাবি করেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়ানো ঠিক নয়। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়।
ডাঃ আলেমুল বাসার সম্পর্কে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন প্রশাসনের দায়িত্ব। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত দায় নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও ইঙ্গিত বহন করবে। আর যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সুনাম রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার কার্যক্রম ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে জনমনে আস্থাহীনতা আরও বাড়তে পারে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিয়মের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তই পারে এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে এবং স্বাস্থ্যখাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে।
মাটি মামুন 






















