লালমনিরহাট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির চিত্র নয়, বরং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিহীনতার নগ্ন প্রতিফলন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে কেন্দ্রটির তৎকালীন মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. নিশাত উন নাহার এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মনোয়ারা বেগম এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, লালমনিরহাটের উপপরিচালক মো. শাহজালালের স্বাক্ষরিত পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের নামে যে সব ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও এমএসআর সামগ্রী কেনার দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব কেন্দ্রটিতে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একাধিকবার সরেজমিন পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বরাদ্দকৃত অর্থে ক্রয়কৃত কোনো যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র কিংবা পর্যাপ্ত ওষুধ দেখতে পাননি। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষণযোগ্য স্টক রেজিস্টার ও বিতরণ রেজিস্টার প্রদর্শন করতেও ব্যর্থ হন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. নিশাত উন নাহার তার দায়িত্বকালীন সময়ে কেন্দ্রের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বজায় রাখতেন এবং মনোয়ারা বেগম বিল প্রস্তুত, ভাউচার সংরক্ষণ ও ব্যাংক সংক্রান্ত কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ সংগ্রহ ও এমএসআর খাতে মোট ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯০ টাকা উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে নামমাত্র কিছু ওষুধ, যা উত্তোলিত অর্থের তুলনায় নগণ্য। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পুরো অর্থই পরিকল্পিতভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র মূলত গর্ভবতী মা, নবজাতক ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। লালমনিরহাটের মতো সীমান্তবর্তী ও তুলনামূলক দরিদ্র জেলায় এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করে হাজারো নারী ও শিশু। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করেছেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জামের অভাবে অনেক সময় চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হয়েছে, অথচ কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে বিপুল অঙ্কের কেনাকাটা।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বিল-ভাউচারের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই ধরনের হাতের লেখা, সন্দেহজনক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যে প্রতিষ্ঠানের নামে বিল দেখানো হয়েছে, সেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অনিয়ম প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সুপরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধভাবে সরকারি অর্থ লোপাটের একটি প্রক্রিয়া।
ডা. নিশাত উন নাহারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি নতুন নয় বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। তাদের মতে, এর আগেও তার দায়িত্বকালীন সময়ে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের মৌখিক অভিযোগ শোনা গেলেও সেগুলো কখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে গড়ায়নি। একইভাবে মনোয়ারা বেগম দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকায় কেন্দ্রের আর্থিক নথিপত্র ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতেন, যা এই অনিয়ম বাস্তবায়নে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, এই প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরিচালক (প্রশাসন) পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিভাগীয় মামলা, সাময়িক বরখাস্ত কিংবা ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুপারিশ করা হতে পারে। তবে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।
স্থানীয় নাগরিক সমাজ ও স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর আঘাত হানে। গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ মানে তাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে ফেলা। তারা দাবি করছেন, শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দিলেই হবে না, বরং পুরো ব্যবস্থার সংস্কার ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ হলেও তা নজরে আসেনি? নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অডিট ও তদারকি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই তদারকি কতটা কার্যকর, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, যদি সময়মতো সঠিক অডিট হতো, তাহলে এত বড় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতো না।
ডা. নিশাত উন নাহার ও মনোয়ারা বেগমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রশাসনিক সূত্র বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।
এই অনিয়মের ঘটনায় শুধু লালমনিরহাট নয়, সারাদেশেই মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি হলে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সমাজের দুর্বল অংশের ওপর। তাই এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।
সব মিলিয়ে লালমনিরহাট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এই অভিযোগ একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। ডা. নিশাত উন নাহার ও মনোয়ারা বেগমকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা দৃঢ়তার সঙ্গে এই অভিযোগের নিষ্পত্তি করে এবং জনস্বার্থে কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।
আমাদের মার্তৃভূমি ডেস্ক : 






















