বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক জুনিয়র কর্মকর্তা মিজানুর রহমান শিশির শিক্ষার্থী ভিসার আড়ালে মানবপাচারের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তার স্ত্রীকে ব্যবহার করে লাইসেন্সবিহীন একটি অবৈধ ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তিনি বছরের পর বছর ধরে এই কাজ চালিয়ে আসছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, যাত্রীপ্রতি তিনি ১০ লাখ টাকা নেন, ভিসা, বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা করে ফ্লাইটে বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে তুলে দেন। এছাড়া ৫ আগস্টের পর তিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সহযোগীদের সেফ এক্সিটে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিশির ছিলেন বিমান শ্রমিক লীগের সভাপতি এবং সেই সময় বদলি বাণিজ্যসহ অন্য অপকর্মের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তার বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার মামলা রয়েছে। তবে এখনো তিনি পদে বহাল। একটি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে এই অভিযোগের বিষয়টি গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক বোশরা ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগ বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্রমতে, বিমান শ্রমিক লীগের নেতা মিজানুর রহমান শিশির (পি-৩৬৮৪৬) দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি শক্তিশালী অপকর্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের পাশাপাশি বদলি বাণিজ্য, ব্যাগেজ কাটিং, স্বর্ণ চোরাচালান, যাত্রী হয়রানি এবং আরও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ২৫ নভেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের বিমান-১ শাখা থেকে জারি করা পত্রে বিষয়টিকে ‘জরুরি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (এমডি ও সিইও) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে ফলাফল মন্ত্রণালয়কে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিক পাশ মিজানুর রহমান শিশির কম্পিউটার অপারেটর হিসাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে চাকরিতে যোগদান করেন। পরে বিভাগ পরিবর্তন করে তিনি বিমানের ট্রাফিক শাখায় যুক্ত হন। এ শাখায় যোগদানের পর থেকেই নিজের প্রভাব বাড়তে থাকে তার। দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৯ সালে তাকে ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে বদলি করা হলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও তোফায়েল আহমেদের তদবিরে অল্প সময়ের মধ্যেই সিলেট বিমানবন্দরে জায়গা করে নেন। সিলেটে যোগদানের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সিলেটে বদলির পর স্টাডি ভিসার পাশাপাশি তিনি ভিজিট ভিসার আড়ালে মানব পাচার, ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ ডিল, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের অনৈতিক সুবিধা প্রদান এবং বিমানবন্দরে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, জাল স্টাডি (শিক্ষার্থী) ভিসার আড়ালে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন শিশির। ৫ আগস্ট ২০২৪ ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পরও বিমানের কিছু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা ‘ম্যানেজ’ করে ঢাকা ও সিলেট বিমানবন্দর ব্যবহার করে তার মানব পাচারের কার্যক্রম চলতে থাকে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে যুক্তরাজ্যগামী এক জাল ভিসাধারী যাত্রীকে ইমিগ্রেশন সিকিউরিটি থেকে অফলোড (আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে নামিয়ে দেওয়া) ঘটনার পর। গত ২৬ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০১ ফ্লাইটে যাত্রী এনামুল খলিফা (পাসপোর্ট নম্বর-এ০৪৮৩২৮৯৫) জাল ভিসায় বিদেশযাত্রার চেষ্টা করেন। সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে ওই ফ্লাইট থেকে ‘অফলোড’ করা হয়। ওই যাত্রীকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে বোর্ডিং পাশ ও ইমিগ্রেশন পার করিয়ে দেওয়ার জন্য তার মাধ্যমে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ করা হয়। যাত্রীর কোনো স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ ছিল না, এমনকি ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগের ন্যূনতম সক্ষমতাও ছিল না। অথচ এনামুল স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাচ্ছিলেন।
জাল ভিসায় যুক্তরাজ্যগামী এনামুল খলিফার পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, সব কাগজপত্র ঠিক আছে। ভিসা নিয়েই তাকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হচ্ছে। বোর্ডিং পাশ থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, সবকিছু ‘ম্যানেজ’ করা আছে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। এজন্য বড় অঙ্কের টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরে এনামুলকে নামিয়ে দেওয়ার পর বুঝতে পারি, আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। টাকা খুইয়ে আমরা এখন সর্বস্ব হারানোর পথে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশিরের সঙ্গে মানবপাচার চক্রের অন্যতম সহযোগী হিসেবে তৎকালীন চেকিং স্টাফ কৃষ্ণ সুধার নাম উঠে এসেছে। শিশিরের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে তিনি যাত্রীদের বোর্ডিং পাস ইস্যু করতেন। প্রায় ছয় মাস আগে ২০ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে শিশির কৃষ্ণ সুধাকে ঢাকা বিমানবন্দরে পোস্টিং করান। এর আগে তারা একসঙ্গে সিলেট স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিদেশে পালিয়ে যেতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করে দেশ ছাড়তে সহায়তা করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে শিশিরের বিরুদ্ধে হামলা ও বিস্ফোরক আইনে গত বছরের ৬ নভেম্বর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করা হয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় তাকে দণ্ডবিধির ১৪৯/৩৩০/৩২৪/৩২৫/১০৯ ধারাসহ বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের ৩/৪ ধারায় আসামি করা হয়েছে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, ‘আমি এখানে অল্প কিছুদিন আগে যোগদান করেছি। এখনো সব বিষয়ে পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারিনি। যতটুকু জেনেছি মামলাটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত। ওই মামলায় অভিযুক্ত হিসাবে মিজানুর রহমান শিশিরকে একপর্যায়ে আটক করা হয়েছিল। তবে তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন কিনা, সে বিষয়ে এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’ অভিযোগের বিষয়ে জানতে শিশিরের সঙ্গে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক বোশরা ইসলাম বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পেয়েছি। এরই মধ্যে শিশিরের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি ঠিক কী কী অপরাধে জড়িত ছিলেন, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অভিযোগের পরিধি মোটেও ছোট নয়। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আমরা দেখেছি, তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অনলাইন ডেস্ক 




















